ঢাকা, শনিবার,২৯ এপ্রিল ২০১৭

অবকাশ

মা মাটিকে ভালোবেসে যুদ্ধ করেছি

রায়হান রাশেদ

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে রাত ১২টা নাগাদ দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ও শুনে বেরিয়ে পড়লাম কালো কংক্রিটের নির্জন পথে। সাথে বন্ধু ইসমাঈল রাজা, মেহদী হাসান ও আ: রহিম। সারা দিনের ব্যস্ত রাস্তাটি অবসাদ ঝেরে বেঘোরে ঘুুমুচ্ছে। মফস্বলের পথে রাত নামলে গাড়ি একেবারে চলে না বলা যায়।
আমরা হাঁটছি আর বিজয়ের গৌরবমাখা গল্প করছি। মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার মানুষের সংগ্রাম, রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছি। হৃদয়গহিন থেকে নির্ভেজাল ভালোবাসা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উৎসর্গ করছি। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। অনিমেখ চেয়ে আছি আমাদের দিকে শান্ত নিঃশব্দ ছন্দময় পদে এগিয়ে আসা ছায়ামূর্তির দিকে। ধীরে ধীরে নিবিড় সূক্ষ্ম গতিতে পা ফেলছে। কাছে আসতেই তার চেহারা দেখে আমরা সবাই হতবাক। এই আমরা কাকে দেখছি।
 কপালে চোখ তুলে বললামÑ ‘আঙ্কেল আপনি? তিনি কোনো কথা বলেননি। নগ্নপদে নিঃশব্দের ওপর ভর করে ছায়ার মতো হেঁটে চলেছেন। বন্ধু ইসমাঈল রাজা বললÑ ‘বড় আব্বাকে রাতে ৮টার পর ঘরের বাইর হতে দেখিনি। আর আজ তিনি এত রাতে রাস্তায়! মুক্তিযোদ্ধা বলে হয়তো!’
ভাবছি, আজ বিজয় দিবসের এই দিনে দেশ ও দেশের স্বাধীনতা নিয়ে আমাদেরই কি তীব্র জাগ্রত উচ্ছল অনুভূতি! আর যে লোক সশরীরে নিজের শ্বেতরক্ত এক করে দেশকে মুক্ত আর স্বাধীন করেছেন। তার অনুভূতি ভাবনা হৃদয়ের উষ্ণতা কেমন হবে তা পৃথিবীর কোনো ভাষা, শব্দ, কলম বর্ণনা করতে অক্ষম। যে লোকটি রাত ৮টার পর বেরই হন না, তিনি আজ বিজয়কে স্মরণে এনে সেই ১৯৭১ সালে ফিরে গিয়ে রাস্তায় হাঁটছেন। হয়তো হৃদয় ক্যানভাসে আঁকছেন ৪৭ বছর আগের নির্মম দিনগুলোর স্মৃতি। তার হৃদয়পাড়ায় জাগ্রত দেশপ্রেম ও ভালোবাসাকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তাদের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ। ভেতরের সব শ্রদ্ধা আপনার তরে হে দেশ রক্ষার সৈনিক।
বলছিলাম মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী আঙ্কেলের কথা, যিনি রায়পুরা উপজেলার মানিকনগর গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৭১ সালে তিনি ৩০ বছরের তাগড়া যুবক। যার বাহুতে এক পৃথিবী বল, আর বুক ভরা ভালাবাসা। জয় করার দুর্দম বাসনা। ১৯৭১ সালে রক্তে স্বাধীনতার আগুন লেগেছিল। দেশ রক্ষার চেতনা অস্তিত্বের মর্মমূলে আঘাত করেছিল। অসহায় অবলা মা-বোনের চিৎকারে দেশের মাটিকে ভালোবেসে চলে গেছে স্বাধীনতর সংগ্রামে। যোগ দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার শিবিরে। সায়দাবাদের নুরুজ্জামানের অধীনে ৩ নম্বর সেক্টর থেকে করেন মুক্তির সংগ্রাম।
রায়পুরা, নারায়ণপুর, ভৈরব, চাঁনপুর এলাকায় চষে বেড়িয়েছেন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করেছেন কৌশলে। হত্যা করেছেন অনেক পাক হানাদারকে। কৌশলে রশিতে বেঁধেছেন ৩০-৪০ জন করে পাকসেনা। মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী ৪৬ বছর আগের সজীব তরতাজা অতীত থেকে বলেনÑ ‘অনেক রাত গেছে, আমরা খবর পেয়েছি পাঁচজন হানাদার বাহিনীর এক গ্রুপ আজ অমুক এলাকায় আছে, আমরা শুনে ১০-১২ জনের দল রাইফেল-টেঁটা নিয়ে চলে যেতাম রাতের আঁধারে। ভোরে ঘুমন্ত অবস্থায় আক্রমণ করতাম পাকবাহিনীর ওপর। তাদের পিস্তল-রাইফেল কব্জা করে তাদের রশি দিয়ে পিছিয়ে বাঁধতাম। পরে হত্যা করতাম।
রজব আলীদের কোনো স্থায়ী ক্যাম্প ছিল না। তারা থাকতেন একেক সময় একেক জায়গায়। ছিন্নমূল হয়ে। ‘যেখানে রাত সেখানে কাত’ কথার মতো। তিনি চিন্তা করেননি নিজের কথা। মা-বাবার কথা। স্ত্রী-পুত্রের কথা। তারা ভেবেছেন দেশের কথা। স্বাধীনতার কথা। মা ও মাটি রক্ষার কথা। এক বিকেলে তার সাথে দেখা করে স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক কিছু জানলাম। তিনি কথা বলেন খুব নরম স্বরে। ধীরে ধীরে। কথাকে ভালোবেসে। ’৭১-এর কথা বলেই লোকটি কেঁদে গাল ভেজান। তিনি কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে দ্ব্যর্থহীন দরাজ কণ্ঠে উচ্চস্বরে বলেনÑ ‘মা ও মাটিকে ভালোবেসে যুদ্ধ করেছি’। তখন তার চোখের কোণে জলের বিন্দু ফোঁটা পড়ছে। তিনি আরো বলেনÑ ‘স্বাধীনতার পর বেঁচে থাকার এ জীবনে যতবার বিজয় দিবস স্বাধীনতা দিবস আসে, আমি ’৭১ সালেই ফিরে যাই। আমার হৃদয় সজীব হয়ে যায়। এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাকে ঘর থেকে বের করে আনে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫