ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

অবকাশ

হাজার রাতের গাথা

আহাদ আদনান

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
হাজার রাত পার হয়ে গেছে। আমার বাবা আর কোনো দিন রাতে ঘুমাতে পারলেন না। হয়তো কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ খেয়ে সন্ধ্যায় বিছানায় পড়ে গেছেন। কিন্তু যেই রাত দেড়টা বাজে, ধড়মড় করে উঠে পড়েন বাবা। মায়ের সাথে সারাটা জীবন খিটিমিটি লেগেই ছিল এ নিয়ে। কিন্তু রাতের ঘুম কি আর সবার হয়?
আমার বাবার তখন দশ বছর বয়স। আমার দাদু ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাংলা পড়াতেন। আর একমাত্র সন্তান বাবা সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতেন। সেবার মার্চ মাসটা আসতেই একটা গুমোট ভাব চেপে বসে ঘরে, শহরে, দেশে, সারা বাংলায়। রেডিওতে শুনতে শুনতে বাবার মুখস্থ হয়ে যায়, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ‘স্বাধীনতা কী’? বাবা জিজ্ঞেস করতেন তার বাবাকে। 
তারপর একদিন এলো সেই বিভীষিকা। ২৫ তারিখের রাত নতুন একটা দিন আসে। সারা শহরে শুরু হয় গোলাগুলি, আগুন, হত্যা। পাক সেনারা ঢুকে পড়ে দাদুদের কোয়ার্টারে। ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন বাবা। ‘কিছু হবে না, বোকা ছেলে’, দাদু সান্ত্বনা দেন। ঘরের সব বাতি বন্ধ। চার দিক নিস্তব্ধ। প্রত্যেকের শ্বাসের শব্দ সবাই শুনছে। দাদু বুকে চেপে রেখেছেন বাবাকে। হঠাৎ দরজায় আঘাত। বুট দিয়ে রীতিমতো লাথি মেরে দরজা ভেঙে ফেলতে চাচ্ছে হানাদারের দল। বাবাকে জোর করে টয়লেটে ঢুকিয়ে দিলেন দাদু। ‘চুপ করে থাকবি। আমাদের যা হয় হোক। একটাও শব্দ করবি না।’ একসময় ঘরে ঢুকে যায় হায়েনার দল। দাদুর গলা চেপে ধরে দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলে যায় ওরা। তারপর ভাঙচুর। একসময় গুলির পর গুলি। মার্চের ২৬ তারিখের রাত দেড়টায় একটা দশ বছরের বালক অন্ধকার টয়লেটের ফাঁক দিয়ে নির্বাক তাকিয়ে দেখে তার বাবা, মা তারই চোখের সামনে রক্তাক্ত লাশ হয়ে নিথর পড়ে আছে। তার মস্তিষ্কে, কোষের জিনে আগুন জ্বলে যায়। ছেচল্লিশ বছরের হাজার হাজার রাত ঠিক দেড়টা বাজলেই মস্তিষ্কে দাবানল ছড়িয়ে দেয়। জেগে ওঠেন বাবা আমার।
দিন তবু চলতে থাকে। নতুন প্রজন্মের আমরা এই সংগ্রামের, আত্মত্যাগের চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠি মুক্ত স্বদেশে। আনন্দ, গর্বের পাশাপাশি দুঃখ, ক্ষোভ জমতে থাকে। একদিন আবার এক মার্চের সন্ধ্যায় বাবার সাথে বসে থাকি। বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘কিরে, তোর ইন্টারভিউ কেমন হলো’? হতাশার সাথে বলি, ‘হবে না এবারো। আমার বন্ধু সোহান চেনো তো? ওর বাবার একাত্তরে বয়স ছিল নয় বছর। তবু কেমন করে যেন মুক্তিযোদ্ধার সনদ জোগাড় করে ফেলেছিল। পত্রিকায় লেখালেখি হলো কত। কিন্তু কিসের কী, সোহানের চাকরি হয়ে গেছে ওই সনদে।’
বাবা নিশ্চুপ। আর তখনই বাবাকে একাত্তরের চেয়ে বড় একটা আঘাত করে ফেলি আমিÑ“তুমি কেন একটা মুক্তিযোদ্ধার সনদ ‘ম্যানেজ’ করলে না? তাহলে কি আর এভাবে বেকার ঘুরতে হতো!”
বাবার চোখ রাগে লালা হয়ে ওঠে। হাত-পা কাঁপতে থাকে। একটিবার শুধু বলেন, ‘আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ।’
ঢাকার একটা আইসিইউর ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। বাবার শরীর থেকে তারগুলো লেগে আছে একটা নিস্তরঙ্গ মনিটরে। মৃত ঘোষণার আগে একবার হঠাৎ ইসিজিটা লাফিয়ে ওঠে। চিকিৎসক চমকে ওঠেন। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি দেড়টা বাজে। হাজার রাত পার হয়ে যায়। স্বজনহারা বাঙালির শোকগাথা মরেও শেষ হয় না।  
মাতুয়াইল, ঢাকা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫