রিকশাওয়ালার গল্প

তানিশা চৌধুরী
সেদিন বাড়ি থেকে ফেরার পথে যে রিকশায় চড়লাম তার সাথে আর ভাড়া মিটিয়ে উঠিনি। একরকম হালকাভাবে হেঁটে এসে উঠে বসলাম। এই রিকশা যাবে?
কোথায়, কোন দিকে যেতে হবে তা জিজ্ঞেস না করেই রিকশাওয়ালা আমাকে নিয়ে চলতে শুরু করলেন।
সাধারণত রিকশা ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি থেকে শুরু করে অশোভন আচরণ, এমনকি মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। এমন অভিজ্ঞতা সবারই কমবেশি আছে। এই রিকশাওয়ালাকে সে রকম কিছুই মনে হলো না। তার অপ্রকাশিত আচরণ আমাকে মুগ্ধ ও কৌতূহলী করে তুলল। বাসায় ফেরার যে তাড়া ছিল তা উবে গেল কয়েক সেকেন্ডে। আমি রিকশাওয়ালাকে নমনীয় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলামÑ চাচা আপনার নাম কী?
রিকশাওয়ালা মুখে মৃদু হাসি মাখিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন, লতিফ। সঙ্গে সঙ্গেই ফের প্রশ্ন করলাম, আপনার বাড়ি কোথায়? এবার তিনি আর পেছনে ফিরে আমার দিকে তাকালেন না, বললেনÑ মৌলভীবাজার রোড, পাঁচ নম্বর পুল। অনেকটা রাস্তা আসার পর রিকশা গেল থেমে। কারণ কোনো একজন মন্ত্রী যাবেন এ রাস্তা দিয়ে। অন্য দিন এ রকম হলে আমি রিকশা থেকে নেমে হেঁটে বাসায় ফিরি। আজ আর নামতে ইচ্ছে হলো না। লতিফ সম্পর্কে জানার একটা অদম্য আগ্রহ আমাকে পেয়ে বসল। লতিফ তার ড্রাইভিং সিটে আরাম করে বসে আমার সঙ্গে কথায় মনোযোগ দিলেন। তিনি তার জীবনের গল্প খণ্ড ক্ষুদ্র ভাগে এক-আধটু ছিঁড়ে ছিঁড়ে বলতে লাগলেন। লতিফ দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। মা অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে রিকশা চালাতে শুরু করেন।
এখন থেকে বিশ বছর আগে। তখন তার বয়স ছিল সতেরো বছর এবং আরো অনেক ঘটনার অংশবিশেষ আমাকে শুনালেন। আরো কিছু ঘটনা যা একান্তই তার ব্যক্তিগত, সেসব ব্যর্থতা ও দুঃখের কথা আমাকে জানাতে চাইলেন না। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে অন্য প্রসঙ্গে ফিরে এলেন। হাড় জিরজিরে লম্বা পাতলা রিকশাওয়ালার মার্জিত ভাষায় পুরো শিক্ষিত লোকের মতোই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এবারকার কলেজ ম্যাগাজিন বের হইনি? আগের বছরের ম্যাগাজিনের গেটাপ একদম বাজে ছিল। এত বড় একটা কলেজ! একজন রিকশাওয়ালার মুখে কলেজ ম্যাগাজিনের গেটাপ সম্পর্কিত বাক্য শুনে চমকে উঠেছিলাম। সেদিনই জেনেছিলাম লতিফ দিনমজুর হলেও রুচিতে কেতাদুরস্ত।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.