ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

সাদা পাতায় লেখা

মুস্তাফা জামান আব্বাসী

১৮ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ১৯:১১


মুস্তাফা জামান আব্বাসী

মুস্তাফা জামান আব্বাসী

প্রিন্ট

সাদা পাতাতেই তো লিখতে হয় কালো কালির অক্ষরে। সাদা পাতার বড় অভাব, অভাব কালির। সব কথা লেখা যায় না। খুঁজে খুঁজে একটি দু’টি পাওয়া যায়, খানিকটা জায়গা। যেখানে কলমের আঁচড় পড়ে। সাবধানে কথা বলা। দেয়ালেরও কান আছে। দেয়াল সব কথা তার অদৃশ্য কাগজে লিখে ফেলে। তাই ‘রক্ত করবী’র নন্দিনী দেয়ালের এ পাশ থেকে ‘রঞ্জন’ ‘রঞ্জন’ বলে চিৎকার করতে থাকে। নানা সংলাপের মধ্যে বলে যায় তার ভালোবাসার কথা। সে কথা পৌঁছায় না দেয়ালের ওধারে। কোতোওয়াল কোথা থেকে এসে আবির্ভূত। সে নন্দিনীর সব সংলাপ স্তব্ধ করে দেয় রাজার ফরমান দিয়ে।
কিন্তু কবিকে স্তব্ধ করে এমন রাজার জন্ম হয়নি পৃথিবীতে। সে তার কথা বলে যাবেই, যেমন করেই হোক, যে ছলেই হোক, যে কৌশলেই হোক। মানুষকে কথা বলতে দিন। তা না হলে সে কথা বলা ভুলে যাবে। এর পরে তার মুখে এমন কথা আসবে, যা শ্রাব্য নয়, যা সুমধুর নয়। কথা বললে কী এমন ক্ষতি হবে? কথার এমন ক্ষমতা যে, ‘রাজা হলো খান খান’ বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য ছুটে চলে খান খান হওয়ার পথে। এই ছোট্ট কথাটি সবার মনের মধ্যে ঢুকে গেছে। তারা এমনভাবে কথা বলে যাতে রাজার চররা কিছুই বুঝতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।
তরার ঘাটে বসে থাকতেন বৃদ্ধ বেজারউদ্দিন ফকির। তার ফোকলা দাঁতে কথা জড়িয়ে যেত। তাই যে কথাগুলো বললে যেতে হবে দেয়ালের ওপারে, সেগুলো বলতেন সন্তর্পণে। ‘চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী’। তাই চোরাদেরকে ধর্মের কাহিনী শোনাতেন নিজস্ব কৌশলে। সে নদী আছে, তরার ঘাট নেই, নেই নৌকায় চড়ে ওপারে যাওয়া। সেখানে বীরদর্পে এগিয়ে যায় গাড়ি, ট্রাক, বাস। মুহূর্তে নদী পার। কিন্তু বেজার ফকিরের গানগুলো এ নদীর পারের কথা বলেনি, বলেছে ভব নদীর পারের কথা। সেখানে কারিগরি চলবে না। যারা ভুল করবে তাদের খেসারত দিতে হবে। তা না হলে কোনো দিন ওপারে যাওয়া যাবে না। মারেফাতের আসল তত্ত্ব সেই গানগুলোতে। বেজার ফকির গেয়েছিলেন :
মনে কি পড়ে না তোমার মহাজনের আছে ঋণ
(মন রে) ফাঁকি দিয়া থাকবে কত দিন
গানটি বহুবার রেডিওতে গেয়েছি। এর অর্থ কী, তা নিয়ে কেউ ভাবেনি। অর্থাৎ মহাজনকে যে কথা দিয়ে এসেছি তা রাখিনি। পরজনমের মহাজনের কথা বাদই দিলাম। সেখানে তো অনেক কথা দিয়ে এসেছি। সেগুলো তো কেউ শুনবে না। কিন্তু এই পৃথিবীতে কিছু মহাজন ছিল, যাদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশটাকে স্বাধীন করেছি। তাদের ঋণ কি শোধ করতে পারা যাবে না? তারা কি এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেননি, যেখানে গরিবের স্বপ্ন সফল হবে? যখন গ্রামে যাই টিনের বাড়ির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে দেখতে পাই। যারা সেই বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলো, তারা কি এই দেশের নয়? তারা কি খেয়ে বেঁচে আছে, না মরে বেঁচে আছে, সে খবর কি কেউ রাখে? যারা ওদের চালাচ্ছে অথবা যাদের অন্নে ওদের কয়েকজন বেশ সচ্ছল হয়েছে, তাদের দিকে তাকাই। ওরাও মধ্যস্বত্বলোভী। কৃষকেরা তাদের ধানের মূল্য পায়নি, পণ্যের মূল্য পায়নি, ফসলের দাম পানির দরে বিক্রি করে বাড়ি ফিরেছে। কেন? কেউ কি তা ভেবে দেখেছে? সবাই মিলে বড়লোক হওয়া যায় না। কাউকে-না-কাউকে গরিবই থেকে যেতে হয়। বেশ, গরিব না হয় থাকল, কিন্তু তারা যে বঞ্চিত হলো তাদের অধিকার থেকে। সেটা কি কেউ ভাববে না? যারা স্বাধীনতা এনেছে তাদের ঋণশোধের কথা কে বলবে? বলবে না। কারণ যারা লাইসেন্স পেয়েছে তারা শুধু রেডিও, টেলিভিশন লাইসেন্স পায়নি, তারা পেয়েছে ওদের ওপর শোষণ করার পূর্ণ অধিকার। বেজার ফকিরের গানে আবার চলে যাই। সে ছাড়া আমার আর কে আছে?
নিয়ে এলি ষোল আনা
ব্যাপারে তোর হলো দেনা
(তোমার) সে কথা মনে পড়ে না
কি হবে হাশরের দিন,
ফাঁকি দিয়া থাকবি কত দিন?
আজ যখন গাইলাম গানটি নিজের ঘরে বসে, সব পরিষ্কার হয়ে গেল। ১৬ ডিসেম্বর ষোল আনা স্বাধীনতা পেলাম। কিন্তু কোথাও দেনা ফেলে এসেছি। সে ঋণের বোঝায় সব হয়ে গেল ফাঁকি। আবার অন্য অর্থে চলে যাই। হাশরের দিনে ফাঁকির বিচার হবে। প্রত্যেকটি ফাঁকির। যে যেখানে এই জাতির যেকোনো মানুষকে ফাঁকি দিয়ে গেল, তার চুলচেরা বিচার সে দিন হবে। ধর্মের কথা বললেই মুখ বেজার। ওরা যে মুসলমানের ছেলে তা ভুলে যেতে চায়। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমান যে দেশে, সে দেশে একজনই বীনকার হবে। বেজার ফকির বলছেন :
আসার কালে যা বলিলে
ভবে এইসে ভুলে রইলে
দিন গেল তো গোলেমালে
(হায়রে) রাসূল কি হবে না বীন?
ফাঁকি দিয়া থাকবে কত দিন?
চলছে রাসূল সা: হীনতার জয়জয়কার। কোনো ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে কি? বিদেশ থেকে ‘তন্ত্র, আনা হচ্ছে। সে তন্ত্রের আমরা কী বুঝি? এমনকি যে ধর্ম নিয়ে আমাদের এত অশ্রুপাত, তার মধ্যে এসে ঢুকেছে গোপন অস্ত্রের ঝঙ্কার। আমরা কি গোপন অস্ত্রের কারবারি? আমরা কি আরেকজনকে মেরে ফেলব বলে এ দেশে এসেছিলাম? না। আমরা এসেছিলাম ভালোবাসার জয়গান নিয়ে। ভালোবাসা দিয়ে আমরা জয় করেছিলাম। অস্ত্র দিয়ে নয়। তরার ঘাট থেকে বাসায় ফিরতে বেশি সময় লাগে না। আগে ছিল বিশ মিনিট। এখন তা হয়েছে দুই ঘণ্টা। তবুও যখন বেজার ফকিরের কাছে গিয়েছিলাম, তখন তার গান দিয়েই বাড়ি ফিরব। গানটির শেষ অন্তরা :
হিসাব তোমার দিতেই হবে
কেন মজে রইলে বিষয় বিষে
তসির কয় সব পইরে রবে
কিছুই তো রবে না চিন,
ফাঁকি দিয়া থাকবে কত দিন ॥ 

লেখক : সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫