ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

মুজিবের স্মৃতিকথা ও বর্তমান বাংলাদেশ

মীযানুল করীম

১৮ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ১৮:৫৭ | আপডেট: ১৮ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ১৯:০৩


মীযানুল করীম

মীযানুল করীম

প্রিন্ট

রোববার ১৯ মার্চ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ১৯৪৮ সালের এই দিনটির স্মৃতিচারণ প্রণিধানযোগ্য। তখন পাকিস্তান নবজাত রাষ্ট্র এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একাধারে ‘কায়েদে আজম’ (মহান নেতা) ও ‘জাতির পিতা।’ আর তরুণ মুজিব তার দল মুসলিম লীগের একজন জানবাজ কর্মী ও সংগঠক। মুজিব তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ’৪৮ সালের ১১ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের প্রথম গণবিস্ফোরণের কথা তুলে ধরেছেন। সে দিন নিজেও ঢাকায় গ্রেফতার হয়েছিলেন পিকেটিংকালে। ক্ষমতাসীন নেতারা গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ সাহেবকে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিভ্রান্ত করেছিলেন। এ ব্যাপারে শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘সরকারদলীয় মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুর জন্য জানমাল কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু জনসমর্থন না পেয়ে একটু ঘাবড়িয়ে পড়েছিলেন। তারা শেষ ‘তাবিজ’ নিক্ষেপ করলেন। জিন্নাহকে ভুল বোঝালেন। এরা মনে করলেন, জিন্নাহকে দিয়ে উর্দুর পক্ষে বলাতে পারলেই আর কেউ এর বিরুদ্ধাচরণ করতে সাহস পাবে না। জিন্নাহকে দলমত নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধা করতেন। তার যেকোনো ন্যায়সঙ্গত কথা মানতে সবাই বাধ্য ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের জনমত কোন পথে, তাকে কেউই তা বলেননি বা বলতে সাহস পাননি।
এরপর ১৯ মার্চ দিনটির কথা মুজিবের ভাষায়, ‘১৯ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা আসলে হাজার হাজার লোক তাকে অভিনন্দন জানাতে তেজগাঁ হাওয়াই জাহাজের আড্ডায় হাজির হয়েছিল। আমরা সকলেই ভিজে গিয়েছিলাম, তবুও ভিজে কাপড় নিয়ে তাকে অভ্যর্থনা করার জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেছিলাম।’
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে জিন্নাহর বহুলালোচিত বিতর্কিত উক্তি এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা শেখ মুজিব বলেছেন এরপরই : ‘‘জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড়দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ আমরা প্রায় চার-পাঁচশত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিলো, ‘মানি না।’ তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে বক্তৃতা করতে উঠে তিনি যখন আবার বললেন, ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে’Ñ তখন ছাত্ররা তার সামনেই বসে চিৎকার করে বললো, ‘না, না, না।’ জিন্নাহ প্রায় পাঁচ মিনিট চুপ করে ছিলেন, তারপর বক্তৃতা করেছিলেন। আমার মনে হয়, এই প্রথম তার মুখের ওপর তার কথার প্রতিবাদ করল বাংলার ছাত্ররা। এরপর জিন্নাহ যত দিন বেঁচেছিলেন আর কোনো দিন বলেন নাই, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’’ (৯৯ পৃষ্ঠা)
এরপর মুজিব বলেছেন, জিন্নাহর সাথে ছাত্রলীগ নেতাদের বৈঠকের কথা। তখন ছাত্রলীগের দু’টি অংশ। মুসলিম লীগের ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের সমর্থক ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান’ মুসলিম ছাত্রলীগ এবং একই দলের সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম গ্রুপ সমর্থক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। শেষোক্ত সংগঠনটি সে বছর ৪ জানুয়ারি গঠিত হয় শেখ মুজিবসহ কয়েকজনের উদ্যোগে। জিন্নাহ সাহেবের সাথে ছাত্রনেতাদের বৈঠকের প্রসঙ্গে মুজিবের উক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আত্মজীবনীর ৯৯ পৃষ্ঠায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘ঢাকায় জিন্নাহ দুই দলের ছাত্র নেতাদের ডাকলেন। বোধ হয়, বাংলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদেরও ডেকেছিলেন। তবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের দুইজন করে প্রতিনিধির সাথে দেখা করলেন। কারণ তিনি পছন্দ করেন নাই, দুইটা প্রতিষ্ঠান কেন হবে এই মুহূর্তে। আমাদের পক্ষ থেকে মিষ্টার তোয়াহা আর শামসুল হক সাহেব ছিলেন, তবে আমি ছিলাম না। জিন্নাহ আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামটা পছন্দ করেছিলেন। নিখিল পূর্ব পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের নাম যখন আমাদের প্রতিনিধি পেশ করেন, তখন তারা দেখিয়েছিলেন যে, এদের অধিকাংশ এখন চাকরি করে, অথবা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। তখন জিন্নাহ সাহেব তাদের ওপর রাগই করেছিলেন।’
এখানে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর জবানিতেই দেখা যায়, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুজিব-তোয়াহা-সৈয়দ নজরুলদের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের নাম পছন্দ করেছিলেন। এর বিপরীতে, শাহ আজিজদের সরকারপন্থী ছাত্রলীগের ওপর নাখোশ হলেন তাদের অছাত্র নেতৃত্বের কারণে।
স্কুলজীবনেই শেখ মুজিব রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন রাজনীতির ছিল মহৎ আদর্শ-দেশের স্বাধীনতা ও জাতির মুক্তির লক্ষ্যে একনিষ্ঠ সংগ্রাম। কলেজজীবনে তিনি তদানীন্তন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম তরুণ সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। ওই সময়ের কথা লিখছেন, ‘পরীক্ষা নিকটবর্তী। লেখাপড়া তো মোটেও করি না। দিনরাত রিলিফের কাজ করে কূল পাইনা। আব্বা আমাকে এসময়ে একটা কথা বলেছিলেন, বাবা রাজনীতি করো, আপত্তি করবো না; পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছো, এতো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখো, ঝরহপবৎরঃু ড়ভ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ধহফ যড়হবংঃু ড়ভ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না। এ কথা কোনো দিন আমি ভুলি নাই।’ (পৃষ্ঠা-২১)
আজ মুজিবের প্রাণপ্রিয় ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা তার প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধায় সোচ্চার থাকলেও তার এই কথাগুলো কতটা মেনে চলেন, তা একটা বড় প্রশ্ন। লেখাপড়াই ছাত্রত্বের প্রথম প্রমাণ। সেটা দলীয় রাজনীতির দাপটে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
আমরা বাঙালিত্বের জন্য গর্ব করি। কারণ বাঙালির গৌরবময় অর্জন অনেক। শেখ মুজিব তার জীবনের চূড়ান্তপর্যায়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই রাজনীতি করেছেন, আন্দোলনে দিয়েছেন নেতৃত্ব। বাস্তবতার আলো ও অন্ধকার, দুই দিক সম্পর্কেই অবগত ছিলেন। তা অকপটে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। তাই লিখেছেন, ‘পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয়, দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতরতা।’ পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে ‘পরশ্রীকাতর’ বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সব ভাষায়ই পাবেন, সব জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে; কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। তাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এ জন্যই বাঙালি জাতির সব রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যত দিন চিনবে না এবং বুঝবে না, তত দিন এদের মুক্তি আসবে না।’
বাঙালির শক্তি ও দুর্বলতা এবং উন্নতির অন্তরায় কী, তা এ কথা থেকে অনেকটা জানা যায়। আজ এত বছর পরও সমাজ ও দেশের যে চিত্র, তাতে বলা যায়, তারা নিজেকে আজও চিনেনি।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে উপমহাদেশের মুক্তি এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েক দিন পরই শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে এলেন। তখনকার পরিস্থিতিতে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আপাতত রাজনীতি থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে মন দিয়ে লেখাপড়া করবেন। কারণ আইন শাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনীতি তাকে ছাড়েনি এবং আইনে পড়াশোনাও আর করা হয়নি। বরং বামপন্থীদের সাথে একটা বিরোধ সৃষ্টি হলো। তখন মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন দলের একটা সভা ডেকেছিলেন প্রখ্যাত যুবনেতা শামসুল হক (টাঙ্গাইল)। যুব প্রতিষ্ঠান গঠন করা ছিল তার উদ্দেশ্য। তবে মুজিব আপত্তি জানিয়ে বললেন, ‘যুব প্রতিষ্ঠান একটা করা যায়, তবে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত হবে কি না চিন্তা করে দেখেন। আমরা এখনও মুসলিম লীগের সভ্য আছি।’ শামসুল হক জানান, তিনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ছেন না। মুজিবের আত্মজীবনীতে রয়েছে, ‘আমাকেও কমিটিতে রাখা হলো। আলোচনার মাধ্যমে বুঝতে পারলাম, কিছু কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন কর্মীও যোগদান করেছে। তারা তাদের মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেছে। প্রথমে ঠিক হলো, একটা যুব প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে, যেকোনো দলের লোক এতে যোগদান করতে পারবে। তবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে যতখানি দূরে রাখা যায়, তার চেষ্টা করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানের নাম হবে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ।’ আমি বললাম, এর একমাত্র কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা, যাতে কোনো দাঙ্গা হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশত্যাগ না করেÑ যাকে ইংরেজিতে বলে ‘কমিউনাল হারমোনি’, তার জন্য চেষ্টা করা। অনেকেই এই মত সমর্থন করল, কিন্তু কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন দলটা বললো, আরো প্রোগ্রাম নেয়া উচিত। যেমন, অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম। আমরা বললাম, তা হলে তো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে যাবে। মুজিব লিখেছেন, কয়েক দিন পরে কার্যকরী কমিটির এক সভায় ড্রাফট কার্যসূচি পেশ করা হলো, যাকে পরিপূর্ণ একটা পার্টির ম্যানিফেস্টো বলা যেতে পারে। আমি ভীষণভাবে বাধা দিলাম এবং বললাম, ‘কোনো ব্যাপক কার্যসূচি এখন গ্রহণ করা হবে না। একমাত্র ‘কমিউনাল হারমোনির জন্য কর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজই আমাদের নাই। দু’মাস হলো, দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন কোনো দাবি করা উচিত হবে না। মিছামিছি আমরা জনগণ থেকে দূরে সরে যাবো।’ কমিউনিস্ট নেতারা তখন ভারতবর্ষে সেøাগান দিয়েছে, ‘স্বাধীনতা আসে নাই, সংগ্রাম করে স্বাধীনতা আনতে হবে।’ আমাদের দেশের কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন সহকর্মীরা সেই আদর্শই কর্মসূচির মধ্যে গ্রহণ করতে চায়। এই সকল কর্মসূচি নিয়ে এখনই জনগণের কাছে গেলে আমাদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে।’ (পৃষ্ঠা ৮৫)
বঙ্গবন্ধু মুজিবের এই দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য থেকে আমাদের দেশে বামপন্থী আন্দোলনের অদূরদর্শিতা তথা বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থতার দিকই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যাদের কর্মসূচি গ্রহণ করলে জনগণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আশঙ্কা মুজিব একদিন করেছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি জীবনের শেষ দিকে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
যা হোক, গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনের কিছু দিন পরে শেখ মুজিব ও সমমনাদের সাথে কমিউনিস্টদের মতবিরোধ চরমে ওঠে এবং যুবলীগের কার্যত বিলুপ্তি ঘটে যায় এর জের ধরে। এর কার্যকরী কমিটির একটা সভা তাকে না জানিয়ে আহ্বান করা হয়েছিল ময়মনসিংহে। সেখানকার ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবেÑ ‘আমরা সভায় উপস্থিত হলাম এবং বৈধতার প্রশ্ন তুললাম। আমাকে ও অনেককে নোটিশ দেয়া হলো না কেন?’ সভায় মুজিব বললেন, ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারি না। কারণ মুসলিম লীগের এখনও কাউন্সিল সদস্য আমরা। অনেক তর্কবিতর্ক হলো, তারপর যখন দেখলাম যে, কিছুতেই শুনছে না, সকলেই প্রায় কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন বা তাদের সমর্থকরা উপস্থিত হয়েছে, তখন বাধ্য হয়ে আমরা সভা ত্যাগ করলাম। আর বলে এলাম, ‘মুসলিম লীগের কোনো কর্মী আপনাদের এই ষড়যন্ত্রে থাকবে না। যুবলীগও আজ থেকে শেষ। আপনাদের ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা আমাদের জানা আছে। আমাদের নাম কোথাও রাখবেন না।’ (পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮)
আত্মজীবনীর ১৩৪ পৃষ্ঠায় মুজিব লিখেছেন তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মানসিকতা প্রসঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী যে বিশেষ কোনো দলের নন এবং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল যে এক নয়, তা বলেছেন জোর দিয়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের নীতির সমালোচনা এবং প্রধানমন্ত্রীর নিজ দলে তার বিরুদ্ধাচরণের অধিকার থাকে বলেও তিনি মনে করতেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়Ñ ‘তিনি যদিও বলতেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, কিন্তু কোনো বিরুদ্ধ দল সৃষ্টি হোক তা তিনি চাইতেন না। তার সরকারের নীতির কোনো সমালোচনা কেউ করে, তা-ও তিনি পছন্দ করতেন না। নিজের দলের মধ্যে কেউ বিরুদ্ধাচরণ করলে তাকেও বিপদে ফেলতে চেষ্টা করেছেন।’ তিনি আরো লিখেছেন পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী সম্পর্কে, ‘তিনি জনগণের প্রধানমন্ত্রী হতে চান নাই, একটা দলের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল যে এক হতে পারে না, এ কথাও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনেকগুলি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে এবং আইনে এটা থাকাই স্বাভাবিক।’ এর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করার তীব্র সমালোচনা করেছেন শেখ মুজিব।
রাজবন্দীদের ইংরেজ আমলে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো, পাকিস্তান হওয়ার পর তার অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মুজিব নিজের অভিজ্ঞতায় যে অবস্থা তুলে ধরেছেন, তার সাথে তার স্বপ্নের বাংলাদেশের বর্তমান দশার তুলনা করা যেতে পারে। তখন তো সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ‘রাজবন্দী’ হিসেবে স্বীকার করা হতো। এখন তো সেই স্বীকৃতিটুকুও নেই। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১৭১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক বন্দীদের খাওয়া দাওয়া, কাপড় চোপড়, ওষুধ, খবরের কাগজ, খেলাধুলার সামগ্রী, এমনকি এদের ফ্যামিলি এলাউন্সও দেয়া হতো ইংরেজ আমলে। ..... রাজনৈতিক বন্দীরা দেশের জন্য ও আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করছে, এ কথা স্বীকার করতেও তারা (সরকার) আপত্তি করছেন। এমন কি, মুসলিম লীগ নেতারা বলতে শুরু করেছে, ‘বিদেশী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জেল খাটলে সেটা হতো দেশদরদির কাজ। এখন দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে জেল খাটছে যারা, তারা হলো রাষ্ট্রদ্রোহী। এদের সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে না।’
১৯৪৯-৫০ সালের জেলজীবনের স্মৃতিচারণ করে শেখ মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, ‘আমি তখন নামাজ পড়তাম এবং কুরআন তিলাওয়াত করতাম রোজ। কুরআন শরীফের বাংলা তরজমাও কয়েক খণ্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মাওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি। (পৃষ্ঠা ১৮০) মুজিব কারাজীবন নিয়ে এর আগে লিখেছেন, ‘মওলানা (ভাসানী) সাহেবের সাথে আমরা তিনজনই নামাজ পড়তাম। মওলানা সাহেব মাগরিবের নামাজের পর কুরআন মজিদের অর্থ করে আমাদের বোঝাতেন। রোজই এটা আমাদের জন্য বাঁধা নিয়ম ছিল। (পৃষ্ঠা ১৬৯) এখানে উল্লিখিত ‘তিনজন’-এর মধ্যে অপর ব্যক্তি হলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক।
১৯৫৪ সালের একটি ঘটনা তুলে ধরে মুজিব বলছেন, ‘আমাকে আবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হলো। নিরাপত্তা আইনে বন্দীদের বিনাবিচারে কারাগারে আটক থাকতে হয়। সরকার ভাবলো, যে মামলায় আমাকে গ্রেফতার করেছে, তাতে জামিন হলেও হয়ে যেতে পারে। তাই নিরাপত্তা আইনে তাদের পক্ষে সুবিধা হবে আমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা। কি মামলায় আসামি করেছে, আমার তা মনে নাই। আমি নাকি কাউকে হত্যা করতে চেষ্টা করেছি বা লুটপাট করতে উসকানি দিয়েছি। খবর নিয়ে জানলাম, জেলগেটে একটা গোলমাল হয়েছিল,- আমি মন্ত্রী হওয়ার সামান্য কিছুদিন পূর্বে, সেই ঘটনার সাথে আমাকে জড়িয়ে এই মামলা দিয়েছে।’
সচেতন নাগরিকেরা এই উদ্ধৃতি পড়ে আপন মনে একটি বিখ্যাত শিরোনাম হয়তো আওড়াবেন- ‘সেই ট্র্যাডিশন এখনও সমানে চলিতেছে।’ স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সাল থেকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অজস্র অপব্যবহার এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক বন্দীদের অবর্ণনীয় বঞ্চনা ও দুর্গতি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়।
আওয়ামী লীগের মতো বিরাট রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের দাবি করে থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাচ্চা অনুসারী হিসেবে। আর এটাও তো অনস্বীকার্য, মুজিবের ছবি ও অবদানই তাদের রাজনীতির মূল পুঁজি। কিন্তু তাদের ক’জন নেতার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েছেন? বেশ কিছু দিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকা জরিপ চালিয়ে দেখেছে, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের নবীন প্রজন্মের নেতাকর্মীরা এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি পড়েন খুবই কম। এর প্রধান কারণ হতে পারে এটা যে, বইটিতে বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের পাকিস্তান আন্দোলন এবং ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ কালপর্ব উপস্থাপিত হয়েছে। দলটির বর্তমান রাজনীতিতে ইতিহাসের ওই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। অথচ আমাদের এই জাতির বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তখনকার ঘটনাক্রম জানা ছাড়া উপলব্ধি করা অসম্ভব। আর খণ্ডিত ইতিহাস তুলে ধরা প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের একধরনের বিকৃতি।

পাদটীকা : মাত্র কয়েক দিন আগে ৭ মার্চ মহাসমারোহে পালিত হলো ক্ষমতাসীন দলের উদ্যোগে। ৪৬ বছর আগে এ দিনের বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেবো।’ আজকের বাংলাদেশে সরকার কি গণতন্ত্রের এই নীতির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে? ‘কোয়ালিটি’কে গুরুত্ব না দিয়ে যেনতেনভাবে ‘কোয়ানটিটি’ অর্জন করা লক্ষ্য হলে তা গণতন্ত্র হয় না। বরং তাতে কায়েম হবে ‘ব্রুট মেজরিটি’র অপশাসন। সেখানে দল ও দেশ, রাষ্ট্র ও সরকার একাকার হয়ে যায়। এ কারণেই বাংলাদেশে ইনক্লুসিভ ইলেকশন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য আজ এত দাবি, আহ্বান ও আকুতি। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫