ঢাকা, সোমবার,২৪ জুলাই ২০১৭

মতামত

স্বামী অসীমানন্দরা খালাস পেয়েই যায়

মাসুম মুরাদাবাদী

১৮ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ১৮:২৬ | আপডেট: ১৮ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ১৮:৫৩


প্রিন্ট

উগ্রবাদী সন্ত্রাসী আরএসএস নেতা স্বামী অসীমানন্দকে জয়পুরের বিশেষ আদালত আজমিরের খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী রহ:-এর দরগায় বোমাবিস্ফোরণ মামলার সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। এ মামলায় অপর ছয়জন আসামিকেও ক্লিনচিট দেয়া হয়েছে। এভাবে উগ্রবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের ভয়ঙ্কর নাশকতার সাথে জড়িত অপরাধীদের খালাসের জন্য এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি) যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল, তাতে অসীমানন্দ আগেই সফলতা লাভ করেছেন। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ, মালেগাঁওয়ের জামে মসজিদ এবং সমঝোতা এক্সপ্রেসের মতো মুসলমান হত্যাকারী বোমা বিস্ফোরণে জড়িত সব উগ্রবাদী সন্ত্রাসী খালাস পেয়ে যাবে এবং সঙ্ঘ পরিবারের কপাল থেকে সন্ত্রাসবাদের দাগ মুছে ফেলার স্বপ্ন লজ্জায় পরিণত হবে। আজমির বোমা বিস্ফোরণ মামলায় যেভাবে তিরিশের অধিক সাক্ষী তাদের স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তা এক মহাদুশ্চিন্তার বিষয়। কেননা ওই সাক্ষীরা ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাদের স্বীকারোক্তি নথিভুক্ত করেছিলেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অন্যান্য মামলাতেও সাক্ষীদের উল্টে যাওয়ার ধারা এভাবে অব্যাহত থাকবে। কেননা এসব মামলায় এনআইএ সঙ্ঘ পরিবারের ইশারায় কাজ করছে। আপনাদের স্মরণে আছে, গত বছর মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণ মামলার সরকারি উকিল রোহিণী শৈলান এ তথ্য ফাঁস করে দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন যে, এনআইএ-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বোমা বিস্ফোরণ মামলার অপরাধীদের সাথে কোমল ব্যবহারের জন্য অব্যাহত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। পরে রোহিণী শৈলান সরকারি ওকালতি থেকে ইস্তফা দেন।
২০০৭ সালের ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় রমজানের ইফতারের সময় বিশ্বখ্যাত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী রহ:-এর দরগায় শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ঘটনায় তিনজন জিয়ারতকারী নিহত হন। পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো ওই বোমা হামলার দায় মুখস্থ-সাজানোমাফিক ঢালাওভাবে মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। তবে পরে তদন্তে এটা প্রমাণিত হয় যে, ওই বোমা হামলাও মালেগাঁও, মক্কা মসজিদ ও সমঝোতা এক্সপ্রেস বোমা হামলার মতো মুসলমানদের প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য করা হয়েছিল। এর পেছনে উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের এমন এক নেটওয়ার্ক কাজ করেছে, যারা মুসলমানদের হত্যা করে কিছু মন্দিরে সংঘটিত বোমা হামলার প্রতিশোধ নিতে চায়। স্বামী অসীমানন্দকে উত্তরাখণ্ড থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওখানে তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করে অবস্থান করছিলেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, স্বামী অসীমানন্দ আজমিরও অন্যান্য স্থানে বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নেপথ্যনায়ক। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, জয়পুরের বিশেষ আদালত স্বামী অসীমানন্দকে আজমির বোমা বিস্ফোরণের মামলায় বেকসুর খালাস করতে গিয়ে ওই মামলার প্রেক্ষাপটের প্রতি কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ করেননি। ওই পরিস্থিতিরও কোনো পর্যালোচনা করা হয়নি, যার প্রেক্ষাপটে স্বামী অসীমানন্দকে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল। জয়পুরের বিশেষ আদালত আরএসএসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইন্দ্রেশ কুমারকেও মুক্তি দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ওই বোমা হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণের অভিযোগ ছিল। ইন্দ্রেশ কুমার রাষ্ট্রীয় মুসলিম মঞ্চ নামে আরএসএসের একটি অঙ্গসংগঠন পরিচালনা করেন, যেখানে নামসর্বস্ব কিছু মুসলমানের অংশগ্রহণের দাবি করা হয়। এ সংগঠন সম্পূর্ণরূপে আরএসএসের ইশারায় কাজ করে। ওই দলের সাথে যুক্ত নামসর্বস্ব মুসলমানদের ‘দেশপ্রেমিক’ অভিহিত করা হয়ে থাকে। আজমির বোমা বিস্ফোরণ মামলায় স্বামী অসীমানন্দ ও অপর ছয়জন অপরাধীর মুক্তির রায়ে কেউ বিস্মিত হয়নি। কেননা এনআইএ উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের বাঁচানোর জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, তার ফলাফল এটাই দাঁড়ায়। স্বামী অসীমানন্দরা খালাস পেয়েই যান। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। তা না হলে যাকে আজমির দরগা, হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ, মালেগাঁওয়ের জামে মসজিদ ও সমঝোতা এক্সপ্রেসের মতো মুসলমান হত্যাকারী বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী অভিহিত করা হয়েছিল এবং যিনি দুইবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে লিখিতভাবে নিজের স্বীকারোক্তি পেশ করেছিলেন, তাকে হঠাৎ বেকসুর অভিহিত করা হতো না। স্বামী অসীমানন্দ আগে ১৮ ডিসেম্বর, ২০১০ সালে দিল্লির তিস হাজারি আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট দীপকের কাছে এবং পরে হরিয়ানার পাঁচকুল্লার আদালতে ১৫ জানুয়ারি, ২০১১ সালে তার স্বীকারোক্তিমূলক বয়ানে নিজের ও সঙ্ঘ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের অপরাধের সব তথ্য ফাঁস করেছিলেন। তবে পরে তিনি তার স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান অস্বীকার করেন। এ মামলায় যেসব সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করা হয়েছিল তারাও পরে অস্বীকার করেছে। এভাবে বিশেষ আদালতের বিচারক দীনেশ গুপ্ত স্বামী অসীমানন্দকে আজমির বোমা বিস্ফোরণ মামলায় ‘যথেষ্ট প্রমাণ না থাকার ভিত্তিতে মুক্তির রায় শুনিয়ে দেন। আমাদের জানা নেই, এনআইএ জয়পুরের বিশেষ আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করবে কি না। এনআইএ (জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) যাদের মৌলিক কাজ সন্ত্রাসের সব মামলার অনুসন্ধান করা এবং ওই মামলায় জড়িত সন্ত্রাসীদের কৃতকর্মের সাজা পর্যন্ত পৌঁছানো- তারা স্বামী অসীমানন্দের মতো অপরাধীদের মুক্তির তৎপরতায় লিপ্ত। এ কথা কারো কাছে গোপন নয়, যে দিন থেকে কেন্দ্রে বিজেপির সরকার এসেছে, সে দিন থেকে ক্রমাগত এ ধরনের সংবাদ আসছে, এ সংস্থা উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের মামলায় শিথিলতা প্রদর্শন করে তাদের মুক্তির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর এটা এ জন্য করা হচ্ছে, যাতে বিজেপি এবং আরএসএসের কপাল থেকে সন্ত্রাসবাদের দাগ মিটানো যায়।
উল্লেখ্য, আজমির বোমা বিস্ফোরণ মামলার সরকারি উকিল অশ্বিনী শর্মা স্বামী অসীমানন্দের খালাসে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অশ্বিনী শর্মা দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাথে আলাপকালে বলেন, স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান দেয়া সত্ত্বেও অসীমানন্দকে কেন মুক্তি দেয়া হলো, তা আমাদের জানা নেই। তিনি বলেন, স্বামী অসীমানন্দ ও অন্যান্য অপরাধীর বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। অশ্বিনী শর্মাÑ যিনি এ মামলার সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত আছেন, তিনি বলেন, এ মামলায় যে ১৪৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেছিল, তাদের মধ্যে ৩৯ জন মূল সাক্ষী তাদের বয়ান প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, এর আগে যখন সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরকে সুনীল যোশী হত্যা মামলায় মুক্তি দেয়া হয়েছিল, তখনো মানুষ এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল এবং এ কথাও বলেছিল, এনআইএ সাধ্বী প্রজ্ঞাকে মালেগাঁও বোমাবিস্ফোরণ মামলা থেকে মুক্তির প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করছে। উল্লেখ্য, সন্ত্রাসের মামলায় জড়িত সঙ্ঘ পরিবারের উকিলদের বক্তব্য, ‘এসব দেশপ্রেমিককে অনর্থক ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে। কেননা এরা একেবারেই নির্দোষ। তাদের কর্মকাণ্ড এতটাই ভালো যে, তারা সন্ত্রাসের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করতে পারেন না।’ এনআইএ-এর আচরণ থেকে অনুমান করা যায়, আজমির বোমা বিস্ফোরণের মতো হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ, মালেগাঁওয়ের জামে মসজিদ ও সমঝোতা এক্সপ্রেসের মতো মুসলিম হত্যাকারী বোমা বিস্ফোরণের অপরাধীরা অচিরেই ক্লিনচিট পেয়ে যাবে এবং এ মামলার কাজে তদন্ত করার সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হেমন্ত কারকারের নিরপেক্ষ ও দুঃসাহসিক তদন্তগুলো বিফলে চলে যাবে। মহারাষ্ট্র এটিএস (অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড)-এর সাবেক প্রধান হেমন্ত কারকারে প্রচুর পরিশ্রম করে এবং জীবন বাজি রেখে ভারতে তৎপর উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের চূড়ান্তভাবে সংগঠিত নেটওয়ার্কের মুখোশ উন্মোচন করে দেশবাসীর সামনে সন্ত্রাসবাদের এমন এক রূপ তুলে ধরেছিলেন, যা সবার দৃষ্টির আড়ালে ছিল। তার সূচনা হয়েছিল মালেগাঁও বোমাবিস্ফোরণ মামলায় সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরের গ্রেফতারি দিয়ে। এরপর একের পর এক কর্নেল পুরোহিত, দয়ানন্দ পাণ্ডে এবং তাদের সবার হোতা স্বামী অসীমানন্দকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হেমন্ত কারকারের এ দুঃসাহসিকতায় সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যরা তার জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়া হয়। এ বিষয় আজও আড়ালে থেকে গেল, ২৬ নভেম্বর মুম্বাই হামলায় হেমন্ত কারকারের মৃত্যুর জন্য দায়ী কে এবং কে তাকে অসম্পূর্ণ জ্যাকেট দিয়ে এমন এক স্থানে পাঠিয়েছিল যেখানে তিনি অজ্ঞাত লোকদের গুলির নিশানায় পরিণত হন? 

মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দু টাইমস

১২ মার্চ, ২০১৭ থেকে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫