ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

বাঙালির চিত্ত চাঞ্চল্য ও অস্থিরতার ইতিকথা

গোলাম মাওলা রনি

১৭ মার্চ ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:০৪


গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি

প্রিন্ট

আপনি যদি তাবৎ দুনিয়ার বাংলাভাষাভাষী মানুষজনের কারো সাথে দু’দণ্ড নীরবে-নিভৃতে কথা বলতে চান তাহলে প্রথমেই আপনাকে ধরে নিতে হবে যে- আলোচনার সময় আপনি কাক্সিক্ষত লোকটিকে নীরবে পাবেন না। তিনি অকারণে তাড়াহুড়ো করবেন। খুব বেশি ব্যতিক্রম না হলে নিজের ব্যস্ততা ও গুরুত্ব প্রদানের জন্য ইয়া বড় বড় সব উদাহরণ আপনার কাছে পেশ করবেন। কথা বলার সময় অকারণ নড়াচড়া, ঘাড় বাঁকানো, হাইতোলা, নিজের দাড়ি মোচ এবং সেগুলো না থাকলে হাত দিয়ে একটি বারের জন্য হলেও নিজ অঙ্গের কোথাও না কোথাও একটু চুলকিয়ে নিজের অস্থিরতার জানান দেবেন। কথা বলার সময় বার বার অমনোযোগী হয়ে উঠবেন এবং উদাস দৃষ্টিতে আশপাশে তাকিয়ে কী যেনো খুঁজতে থাকবেন। তার ভাবসাব এবং আকার-ইঙ্গিত দেখে আপনার একটিবারের জন্যও মনে হবে না যে, তিনি মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনেছেন অথবা আপনি আপনার বক্তব্য তাকে বোঝাতে পেরেছেন।
অবুঝ বাঙালির উদাসীনতা তার শৈশব থেকে কিভাবে শুরু হয় তার একটি চমৎকার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন কবি আল মাহমুদ তার ‘পাখির মতো’ কবিতায়। কবি লিখেছেন- আম্মা বলেন পড়রে সোনা, আব্বা বলেন, মন দে; পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠাল চাপার গন্ধে। আমার কেবল ইচ্ছে জাগে, নদীর কাছে থাকতে, বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে, পাখির মতো ডাকতে। বাঙালি শিশুদের অস্থির চিত্ত নিয়ে রবীন্দ্রনাথও বহু কবিতা লিখেছেন। তার মূর্খ কবিতায় কবি বলেন- নেই বা হলেম সে কোন তোমার অম্বিকা গোসাঁই আমিতো মা চাইনে হতে পণ্ডিত মশাই। নাই যদি হই ভালো ছেলে- কেবল যদি বেড়াই খেলে, তুঁতের ডালে খুঁজে বেড়াই গুঁটি পোকার গুঁটি। মূর্খ হয়ে রইবো তবে, আমার তাতে কিইবা হবে- মুর্খ যারা তাদের ইতো সমস্ত খুঁনসুটি!
কবি-সাহিত্যিক এবং পণ্ডিত বিদগ্ধজনের কথাবার্তায় এবং লেখালেখিতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আমাদের আবহমান বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশ আমাদেরকে অস্থির করে তোলে। আমাদের শরীর মন এবং মানসিকতা প্রকৃতির দোলাচলে ক্ষণে ক্ষণে বদলিয়ে যায়। প্রকৃতি ছাড়াও আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং জেনেটিক গঠনের কারণে পরিপূর্ণ বিশ্বাস, আস্থা, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা বা দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে কোনো কিছুর পেছনে বছরের পর বছর লেগে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের মধ্যে কোনো কালে একজন টমাস আলভা এডিসন, নিউটন, ইবনে সিনা, আলরাজি, ফারাবী, জাবির ইবনে হাইয়ান যেমন সৃষ্টি হয়নি তেমনি খালিদ বিন ওয়ালিদ, আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ, হজরত ওমর (রা:) আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট প্রমুখ বীরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। ভাবের জগতেও আমরা বড়ই কাঙাল। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি, শেখ শাদী, ইমাম বুখারী, তিরমিজী, ইমাম গাজ্জালী প্রমুখ মরমি লেখক এবং সাধক যেমন আমাদের নেই তেমনি নীরবে ধ্যান করে একজন বায়েজীদ বোস্তামী, একজন আব্দুল কাদের জিলানী অথবা হাসান বসরীর মতো ওলি আল্লাহর জন্মে বাংলার মাটি ধন্য হয়নি।
বাঙালির চরিত্র কেনো দুর্বল হয় কিংবা তাদের সাহস শক্তিতে কেনো সরলতার পরিবর্তে বহু বাঁক থাকে কিংবা তাদের মন কেনো ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হয়ে বহুজনে সমর্পিত হয় সে নিয়ে যুগে যুগে কম গবেষণা হয়নি। কথা দিয়ে কথা না রাখা, কোনো কিছুতে স্থিরভাবে নিবিষ্ট হয়ে থাকতে না পারা এবং বার বার স্থান পরিবর্তনের পেছনে আমাদের প্রকৃতি এবং নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য কিভাবে আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে তা নিয়ে সংক্ষেপে আমার মতামত উপস্থাপনের চেষ্টা করব আজকের নিবন্ধের মাধ্যমে। আলোচনার শুরুতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কিছু বলব এবং শেষাংশে বাঙালি জাতি এবং ভাষার আদি ইতিহাসের আলোকে শিরোনামের যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করব।
প্রকৃতি ও পরিবেশ বাঙালিকে সরব রাখে সব সময়। বছরের ছয়টি ঋতু এ দেশের মানুষের শরীরকে বছরে ছয়ভাবে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত করে। ঋতুগুলোর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ফুল, ফল, শব্দ-গতি এবং ছন্দ যা মানুষের শরীর মন নানা রং এবং বর্ণে রাঙিয়ে তোলে। প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষ নিজের খাদ্য, ঘুম, পোশাক-আশাক এবং আচার-আচরণ পরিবর্তন করে প্রতিনিয়ত। বর্ষাকালে ব্যাঙের কোলাহল, বসন্তের কোকিলের ডাক যেমন মানুষকে প্রভাবিত করে তেমনি আশ্বিন মাসের কামাসক্ত সারমেয়দের হই হুল্লা এবং ক্ষ্যাপাটে আচরণের প্রভাব কোনো অংশে কম নয়। বাঙালি জীবনে বর্ষা, কাল বৈশাখী এবং চৈত্রের দাবদাহ যেমন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে তেমনি শরতের সাদা মেঘের ভেলা, হেমন্তের নবান্ন এবং শীতের হাড় কাঁপুনে তাণ্ডবের হিমেল হাওয়া এবং কুয়াশা বাঙালির চিত্তকে অশান্ত করে তুলে।
বাঙালি কবি বলেন- এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! বাস্তবিক অর্থে এ দেশের কোনো কিছুর সঙ্গেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের তেমন একটা মিল-তাল নেই। এ দেশের নির্বিষ সাপদের দুরন্ত বেগে ছুটে চলার গতির সঙ্গে যেমন অন্য দেশের সাপের মিল নেই তেমনি কিছু নির্বিষ সাপের ভয়ঙ্কর ফোঁস ফাঁস এবং ফনা তোলার ভাবসাব দেখে হার্টফেল করে মানুষজনের মরে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে মেলানো যায় এমন দৃশ্য অন্য কোনো জনপদে দেখা যায় না। এ দেশের ভাওয়া ব্যাঙ যত জোরে এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লাফ দিতে পারে তা আফ্রিকা অঞ্চলের সিংহ কিংবা বাঘেরাও পারে না। অন্য দিকে কোলা ব্যাঙের ডাকাডাকি এবং কুনো ব্যাঙের ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে শুনতে শ্রোতারা যদি একটু বাচাল প্রকৃতির হয়ে পড়ে তবে আপনি কাকে দায়ী করবেন।
আমাদের দেশের পুরুষ এবং মহাপুরুষদের সাহস-শক্তি পরীক্ষার জন্য খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। বীরদের বড় কোনো সমাবেশে গোটা দশেক ভাওয়া ব্যাঙ, কিছু বল্লা এবং কয়েকটা ধোড়া সাপ ছেড়ে দিলেই কেল্লাফতে! ওরে মা- ওরে বাবা শব্দ সমষ্টির সঙ্গে কেউ কেউ মর্জিনার মায়ের নাম জপতে জপতে মস্ত বড় লাফ দিয়ে কে কার ঘাড়ের ওপর জায়গা করে নেবে তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। বাঙালি অমাবশ্যার অন্ধকারকে যেমন ভয় পায় তেমনি ভরা পূর্ণিমার চাঁদনী রাতে একাকী নির্জন পথে নিজের ছায়া দেখে চমকে ওঠে। আর চলতি পথে বড় কোনো বটগাছ কিংবা তালগাছ হলে তো কথাই নেই- নিজের দাঁতগুলো একপাটির সঙ্গে অন্য পাটির কিছুক্ষণ ঠকঠকানির পর অবস্থা কতটা সঙ্গিন হয়ে পড়ে তা একমাত্র ভুক্তভোগীই বলতে পারে।
এ দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ভাবসাব এবং আচার-আচরণও বড়ই অদ্ভুত। ছোট্ট একটি চিনা জোঁক নিজের পশ্চাৎ দেশের ওপর ভর করে মাথাটা উঁচু করে যেভাবে খবরদারি চালায় এবং তা দেখে শিশু-কিশোর তো বটেই খোদ বয়স্করা যেরূপ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে তা অন্য কোনো দেশে দেখা যায় কি না সন্দেহ। এ দেশের মুরগি পাঁচ টাকা দামের একটি ডিম পেড়ে ঘণ্টাখানেক ককর ককর করে নিজের কৃতিত্ব জাহির করে। কাকদের বোকামি, সারমেয়দের অকারণ ডাকাডাকির চেয়েও বেশি অদ্ভুত লাগে এ দেশীয় ছাগলগুলোর আচরণ। পত্রিকায় একবার খবর বেরুলো- ‘একটি ছাগল তার মালিকের পঞ্চাশ হাজার টাকার একটি বান্ডেল চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে।’ একবার এক লোক নতুন একটি লুঙ্গি পরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে জেলেদের মাছ ধরা লক্ষ্য করছিলেন। হঠাৎ অনুভব করলেন- তার লুঙ্গির ভেতর দখিনা বাতাসের হিমেল পরশ। পেছনে ফিরে দেখেন একটি ছাগল তার পশ্চাৎদিকের লুঙ্গির নিম্নাংশ নীরবে খেয়ে সাবাড় করে যাচ্ছে এবং সৃষ্টি হওয়া গহ্বর দিয়ে অবাধে দখিনা হাওয়া ঢুকে পড়ছে।
আমাদের গ্রামবাংলার বেশির ভাগ ঝগড়া-ঝাটি এবং বিচার-সালিস সাধারণত ছাগল সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে হয়ে থাকে। আমাদের প্রকৃতির দুটি অদ্ভুত সৃষ্টির নাম মশা এবং মাছি। এগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে যেমন বহু কল্পকাহিনী, কবিতা, গান এবং সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে তেমনি এগুলোর প্রভাবে জাতীয় জীবনে ঘটে গেছে বহু অঘটনের লঙ্কাকাণ্ড। মাছি মারা কেরানি বা মশা মারতে কামান দাগার মতো সুপরিচিত এবং বহুল ব্যবহৃত জনপ্রিয় প্রবাদ এ দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে পাওয়া যাবে না। এগুলো বাংলা ভাষায় এমনই মৌলিক প্রবাদ, যা জনপ্রিয় বিদেশী ভাষা ইংরেজি, আরবি, ফারসি কিংবা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ পর্যন্ত করা যায় না। দিবা নিদ্রার আরামে যাতে মাছি ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে সে জন্য এ দেশীয় রাজা মানুষের পরিবর্তে তার বিশ্বস্ত বানরকে খেদমতগার প্রহরী নিয়োগ করেছিল বলে বঙ্গদেশীয় গল্পে উল্লেখ আছে। তারপর সেই বানর কর্তৃক মাছি তাড়ানোর জন্য ধারাল তলোয়ার ব্যবহার এবং রাজার নাসিকা কর্তনের ঘটনা তো রীতিমতো কিংবদন্তীর কাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
আমাদের দেশের অবিরত বৃষ্টির রিনির ঝিনির শব্দ, বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ, সাগরের গর্জন, গভীর রাতে বাঁদুরের পাখা ঝাঁপটানো কিংবা পেঁচার নির্লিপ্ত চাহনির যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা এ দেশের অধিবাসীদেরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। আঁকা বাঁকা নদীর এলোমেলো গতিপথ, বর্ষাকালে কিছু নদীর রাক্ষুসে করাল গ্রাস এবং বন-বাদাড়ে কাঁটাযুক্ত বিষাক্ত বৃক্ষ লতার আধিক্যের জন্য বাঙালি অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সরল বিশ্বাস এবং আস্থা ধরে রাখার মতো মানসিকতা গড়তে পারেনি। মসলাযুক্ত খাবার, শত প্রকারের মরিচ, দুধ-কলা এবং চিনির জটিল গুরুপাকের খাদ্য গ্রহণ, অধিক নিদ্রা, তেল, ঘি, মাখন প্রভৃতি স্নেহজাতীয় পদার্থের সঙ্গে চর্বিজাতীয় খাবারের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে বাঙালির পেট, রেচনতন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্র প্রায়ই অসুস্থ অবস্থায় ফুঁলে ফেঁপে একাকার হয়ে শত শত টন মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করে হররোজ। এ দেশের গৃহপালিত প্রাণীদের পাকস্থলীর অবস্থাও মানুষের মতোই গুরুতর সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় থাকে। গ্রামবাংলার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রায়ই গরু-ছাগলের পেটের ওপর কান লাগিয়ে পশুগুলোর পেটের গুড় গুড়ানী শব্দ শুনে ভারী তৃপ্তিময় বিনোদন লাভ করে।
আমাদের দেশের প্রাণ এবং প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সরব তর্জন গর্জন এবং অকারণ অস্থিরতা। প্রকৃতিতে যদি কখনো কোনো নীরবতা নেমে আসে তবে এ দেশের বিজ্ঞানীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন কোনো প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায়। ভূমিকম্প, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, অচেনা-অজানা কীটপতঙ্গের দল কর্তৃক ফসলহানি কিংবা মারাত্মক কোনো মহামারী রোগের আক্রমণের আগে বাংলার প্রকৃতি ঐতিহাসিকভাবে কিছু দিনের জন্য নীরব হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে মানুষের কোলাহল, হই হুল্লোড়, চিৎকার, চেঁচামেচি, লম্ফ ঝম্ফ, আনন্দ-বিনোদন, খানাপিনা, অতি কথন, দ্বন্দ্ব, ফ্যাসাদ, ধর্ম-কর্ম-আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির হাজার বছরের ঐতিহ্যের বিপরীতে যখন জনতা চুপ হয়ে যায় তখন ধরে নেয়া হয় যে- একটি জনবিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে। বাঙালি জীবনের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেশের মানুষজন ও প্রকৃতির নীরবতা ও সরবতার নেপথ্য কারণ এবং কার্যকারণগুলোর শত শত উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে।
এবার বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমাদের জাতিটিকে বলা হয় ইন্দো-আরিয়ান নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। অন্য দিকে ভাষাটি কিন্তু ইন্দো-আরিয়ান নয়। এটিকে বলা হয় ইন্দো-আরিয়ান এবং ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষার মিশ্রণ। এখানে ইন্দো বলতে ভারত বর্ষ এবং আরিয়ান বলতে আর্য-জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণকে বাঙালি জাতিসত্তার আদিরূপ ধরে নিয়ে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে বের হওয়ার আগে এ কথা বলে নেয়া দরকার যে, ভাষার দিক থেকে বাংলাভাষাভাষী জনগণ বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে সপ্তম স্থানে রয়েছে। অন্য দিকে বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিদের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীনের হান সম্প্রদায় এবং আরব জনগোষ্ঠী।
বাঙালি জাতিসত্তার আদি এবং অকৃত্রিম ধারাটি মধ্য এশিয়ার বর্তমান উজবেকিস্তান, কিরঘিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান থেকে ভারতবর্ষের সিন্ধু উপত্যকায় এসে বসতি স্থাপন করে। উল্লেখ্য যে, আর্য জনগোষ্ঠীর দুর্বলতম অংশটি স্বার্থ সঙ্ঘাতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে নিজেদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। ভারতে যখন মহেঞ্জুদারো এবং হরপ্পা সভ্যতার স্বর্ণযুগ চলছিল। বাঙালিদের আদি পিতা মাতা আর্যরা ভারতে প্রবেশ করেই হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এবং সুসভ্য মহেঞ্জুদারো ও হরপ্পা সভ্যতা ভেঙেচুরে তছনছ করে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে দেয়। এরপর নিজেদের মধ্যে শুরু হয় অন্তর্দ্বন্দ্ব। বহুদিন নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করার পর পরাজিত অংশটি ভারতের বর্তমান রাজস্থান অঞ্চলে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। কিন্তু এখানেও তারা স্থানীয় অধিবাসীদের বিপুল বাধার মুখে পড়ে টিকতে না পেরে ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে বর্তমানের বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বারাক উপত্যকা এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজস্থান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর বহু শত বছর বিভিন্ন বনজঙ্গলে যাযাবরের মতো কাটিয়ে খ্রিষ্টের জন্মের মাত্র এক হাজার বছর আগে তারা স্থায়ী বসতি গড়ে তুলে। মধ্য এশিয়া থেকে সিন্ধু উপত্যকা, তারপর রাজস্থান থেকে বঙ্গভূমিতে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার আগে কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যে সীমাহীন দুঃখ, কষ্ট, বেদনা এবং পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে পলায়নপর জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছিল যার কারণে তাদের শারীরিক এবং মানসিক প্রবৃদ্ধি অন্যসব জাতিসত্তার মতো হয়নি। ভয়, অবিশ্বাস, সন্দেহ, নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে অস্থিরতার বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের রক্ত-মাংসের সঙ্গে মিশে যায়। এত কিছুর পরও আর্য রক্তের ধারক-বাহক হওয়ার কারণে বাঙালি একটু সুযোগ পেলেই সর্বোত্তম কর্মটি করতে একটুও কার্পণ্য করে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫