ঢাকা, মঙ্গলবার,২৫ এপ্রিল ২০১৭

মতামত

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে ওআইসির কার্যকর উদ্যোগ চাই

তারিক এ আল মায়িনা

১৭ মার্চ ২০১৭,শুক্রবার, ১৮:৫৯


প্রিন্ট

জাতিসঙ্ঘ থেকে ন্যাটো, আরব লীগ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইত্যাদি মাত্র কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে এবং এরপর আমাদের আছে ওআইসিÑ ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা।
১৯৬৯ সালে মুসলিম দেশগুলোর একটি শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে ওআইসি গঠিত হয়েছিল। এটা হচ্ছে সদস্য দেশগুলোর সরকার কর্তৃক আর্থিক সহায়তায় গড়ে ওঠা সংস্থা বা সংগঠন। ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত জাতিসঙ্ঘের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তঃসরকারি সংস্থা এটা। গোটা মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে ওই সংগঠন গড়ে তোলার জন্য আগেই চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সৌহার্দ্য এগিয়ে নেয়ার চেতনা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের তথা বিশ্ব মুসলিমের স্বার্থকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ করাই হচ্ছে এর মিশন।
সহজ-সরল মুসলিম জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিরসনে সোচ্চার হতে ব্যর্থ হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ওআইসি বিভিন্ন মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। দশকের পর দশক ধরে আইন লঙ্ঘন করে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল এবং অতি সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সরকারি বাহিনী কর্তৃক সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে দেশটি থেকে তাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার যে ঘৃণ্য অপতৎপরতা চলছে, সে ব্যাপারে ওআইসির ভূমিকায় বিভিন্ন মহল হতাশ ও ক্ষুব্ধ। বিশ্বব্যাপী জ্বলন্ত সমস্যা তথা ব্যাপকভাবে আলোচিত সঙ্কটের ব্যাপারে ওআইসি কী করছে? সাম্প্রতিক মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অতিরিক্ত অধিবেশনে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই অধিবেশনে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসুফ আল ওতাইমিন ঘোষণা করেন, যথেষ্ট হয়েছে। তিনি গণহত্যা ও বর্বরতা চালিয়ে জাতিগতভাবে ঘৃণা ও উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটাতে হবে। কারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বর্বরতা চালানোর কোনো অধিকার তাদের নেই। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্যাতন ও বর্বরতা হ্রাসে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নীরবতায় হতাশা ব্যক্ত করে ওআইসির মহাসচিব বলেন, গত নির্বাচনে তার বিজয়ে মিয়ানমার একটি সর্বব্যাপী বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারে প্রবেশের মাধ্যমে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে বলে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বলেন, মিয়ানমার তার জনগণের বিরুদ্ধে কোনো জাতিগোষ্ঠীগত এবং ধর্মীয় বৈষম্য সৃষ্টি করবে না বলে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। আল ওতাইমিন বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি ও নতুন নেতৃত্ব আসা সত্ত্বেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তাদের ওপর সহিংসতা চালানোর জন্য সংগঠিতভাবে প্রচারণা ও অভিযান চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত বছর জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল হোসাইনের রিপোর্টে এটা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাসচিব বলেন, ওই রিপোর্টে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু বিশেষভাবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর নির্যাতন ও সরকারের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দলিলাদি উপস্থাপন করা হয়েছে। আল ওতাইমিন জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, জাতিসঙ্ঘ মিয়ানমারের যে মারাত্মক ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন চিহ্নিত করেছে, সেটাকে কিছুতেই দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। পরিশেষে বলেন, আমি আশা করি, ওআইসির সব সদস্য রাষ্ট্র বিশেষভাবে আসিয়ান দেশগুলো (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট নেশনস) রাখাইন অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুমতি প্রদান এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতার ব্যাপারে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন তদন্ত করতে দেয়ার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের আহ্বান ও প্রয়াস অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
নিষ্ঠুর বর্বরতা
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওআইসি মহাসচিবের এই বক্তব্যে মিয়ানমারে যারা সরকার পরিচালনা করছেন, তাদের কি কোনো বোধোদয় হয়েছে? ওআইসি মহাসচিবের এই আহ্বানের পর থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের চলমান গণহত্যা ও বর্বরতা হ্রাস পাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতা ক্রমেই বেড়েই চলছে। আগের কর্মকাণ্ড তথা নিষ্ক্রিয়তার জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত ওআইসি কি এবার কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে? ২০১১ সালে একটি তুর্কি গ্রুপ ওআইসির কোনো প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে সংগঠনটির ব্যাপারে বিতর্কের সূচনা করেছিল। এই গ্রুপটির জিজ্ঞাসা, ‘মুসলিম বিশ্বে হয় দখলদারিত্ব অথবা বিদেশী হস্তক্ষেপ তথা আগ্রাসনের কারণে মানুষ যখন নির্বিচারে মারা যাচ্ছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর রাজধানীতে তাদের সংগঠন ও সংস্থাগুলো যখন মুসলমানদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তখন ওআইসি সব মুসলিম রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করে পশ্চিমাদের বর্বরতার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নীরবতা পালন করছে কেন?’
অন্যদের অভিযোগ, বিশ্বব্যাপী একশত কোটিরও বেশি মুসলিম যখন নানামুখী ষড়যন্ত্র ও সঙ্কটে নিপতিত তখন ওআইসি কেবল কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। অথচ ইসলামি তথা মুসলিম দেশগুলো সম্মিলিত সভা বা সম্মেলন আহ্বান করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়ে সঙ্কট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিলে এখনো বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। অথচ ওআইসি ওই ধরনের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি ও প্রস্তাব দিয়ে তাদের প্রথাগত কাজের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করছে।
ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর ব্যাপারে ওআইসি কেন কোনো ফ্যাক্টর হচ্ছে না? অথচ মালয়েশিয়া থেকে মৌরিতানিয়া এবং তুরস্ক থেকে বসনিয়া পর্যন্ত বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশের মালিক হচ্ছে মুসলিম বিশ্ব। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেÑ তেল ও গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদের বিরাট উৎস মুসলিম বিশ্বের কাছে রয়েছে। এ ছাড়াও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছে শত শত কোটি ডলার রিজার্ভ আছে। এসব সম্পদের অংশীদার হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ওআইসি কী অর্থ সম্পদ হারিয়ে এখন অকার্যকর আমলতান্ত্রিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে?
ওআইসি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মুসলিম বিশ্বের সমস্যা ও সংকটে মাঝে মাঝে দু’একটি প্রস্তাব নিয়ে ও বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলেই চলবে না। নির্যাতিত মুসলিমদের পুনর্বাসন ও তাদের সহযোগিতায় ওআইসিকে হাত বাড়িয়ে দিতে হবে এবং তহবিলের অর্থ তাদের জন্য ব্যয় করতে হবে।

লেখক : সৌদি সামাজিক রাজনৈতিক ভাষ্যকার।
তিনি জেদ্দায় বাস করেন
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫