ঢাকা, সোমবার,২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

কর্মের শক্তি ও উন্নত জাতি গঠন

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

১৭ মার্চ ২০১৭,শুক্রবার, ১৮:১৬


প্রিন্ট

জীবন কর্মময়। কথা কম, কাজ বেশি। কর্মহীন জীবন অচল, অসাড়। জীবনসংগ্রাম এবং আত্মবিকাশের জন্য মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে নানা কর্ম সম্পাদন করতে হয়। মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মপ্রয়াসই জাতিকে জরা কাটিয়ে প্রগতির দিকে ধাবিত করে। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে কর্মের মূল্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিককালে শারীরিক কর্মের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম তথা মানসিক শ্রম সর্বক্ষেত্রে উন্নতির শ্রেয়তর অবলম্বন বলে স্বীকৃত।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে একটি জাতিকে বড় হতে হলে এবং একটি দেশকে উন্নত হতে হলে পরিশ্রমের প্রয়োজন। পরিশ্রমকে সৌভাগ্যের জননী বলে মনে করা হয়। কার্লাই বলেছেন, ‘শ্রম পবিত্র ও সম্মানজনক কাজ।’ ডেল কার্নেগির মতে, ‘কর্মহীন জীবন হতাশার কাফনে আবৃত্ত একটি লাশ বিশেষ।’ অর্থাৎ পরিশ্রমই মানুষকে তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। জীবনযাত্রার জন্য সমাজ ও জাতির জন্য পরিশ্রম এক অপরিহার্য উপাদান। কর্ম জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। পরিশ্রম করে ভিক্ষুক ধনী হতে পারে। আবার পরিশ্রমের অভাবে লাখপতিও পথের ভিখারি হতে পারে। কথায় আছেÑ ‘পরিশ্রম ধন আনে, কর্মে আনে সুখ, আলস্যে দারিদ্র্য আনে, পাপে আনে দুখ।’
প্রাতঃস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ৭১ বছর জীবিত অবস্থায় তার নিরলস পরিশ্রম ও কল্যাণপূত কর্মের মাধ্যমে আজো অমর হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়পটে। আমরা জানি, বিশ্বের সব মহামানবই শ্রমকে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়েছেন। আমাদের মহানবী সা:-এর পবিত্র জীবনের দিকে লক্ষ করলেও দেখব তিনি নিজে কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং কাউকে অমর্যাদাকর বলে মনে করেননি। ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার প্রাপ্য পরিশোধ করো’- তার এ মহান বাণী তো শ্রমের মর্যাদারই অকুণ্ঠ স্বীকৃত। তিনি আরো বলেছেন, কর্মঠ ব্যক্তিকে পাপ স্পর্শ করতে পারে না, তাপ ছুঁতে পারে না। সব সাধকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সাধক পরিশ্রমী ব্যক্তি। কর্মের সাধনা ব্যক্তিগত পর্যায় অতিক্রম করে জাতিকে কাক্সিক্ষত উন্নতির সোপানে পৌঁছে নেয়। পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরেছে মানুষের শারীরিক পরিশ্রমের জন্য। পরে বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে বুদ্ধিবৃত্তিকে শ্রমের সাহায্যে। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা মহান ব্যক্তি বলে স্বীকৃত তারা সবাই ছিলেন কর্মঠ। সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও সম্রাট আওরঙ্গজেব নিজ হাতে সব কাজ করেন। প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এমন কোনো কাজ নেই যে নিজে হাতে করেননি। নেলসন ম্যান্ডেলা পৃথিবীর অন্যতম পরিশ্রমী মানুষ।
পৃথিবীতে যেসব জাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছেন তাদের উন্নতির পেছনে বহু মানুষের নিরন্তর পরিশ্রমের অবদান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল গোটা জাপান। যে দেশে মূল্যবান কোনো প্রাকৃতিক সম্পদও ছিল না। কিন্তু মাত্র.....দশকের মধ্যে দেশটি যে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে তার পেছনে রহস্য বলতে একটিইÑ জনগণের কঠোর শ্রমশীলতা। এখনো জাপানিরা দিনে ৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে। কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন প্রভৃতি উদীয়মান দেশে কর্মের শক্তিই জাতীয় উন্নতির চাবিকাঠি বলে স্বীকৃত। তারা বিশ্বাস করে পরিশ্রম করলে ফল আসবেই।
অপর দিকে আমাদের দেশে গোঁফ খেজুরে মানুষের সংখ্যা বেশি। শারীরিক কর্ম এ দেশে ঘৃণার বিষয়। মানবিক শ্রমের সহজেই ঘটে ধৈর্যচ্যুতি। পরিণতিতে স্বাধীনতার পঁয়ত্রিশ বছর পরেও আমরা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি। আমাদের দেশে সবাই সংক্ষিপ্ত পথে পার হতে চায়; কিন্তু কর্ম ছাড়া সংক্ষিপ্ত কোনো পথ জীবনের উন্নতি হতে পারে না। বিদেশে ঘরে বাইরে পিয়ন, ভৃত্য, বেয়ারাসহ যেকোনো কাজে যান- অপমানের প্রশ্নকে কেউ বড়-ছোট করে দেখেন না। নিজ হাতে সবাই সব ধরনের কাজ করে। এতে লজ্জার কিছু নেই।
কথায় আছে পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, নিউটন,্ এডিসন প্রমুখ ব্যক্তিরা তাদের কর্মের জন্যই পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন। দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘বিশ্রাম ও আনন্দদায়ক পরিশ্রমের হাতে তার পরিবেশনের ভার।’ মূলত কর্মই জীবন আর জীবনই কর্ম। কর্ম শব্দের অর্থ কাজ। এ কাজ করে কুমিল্লার মো: ইয়াসিন তার কর্মের শক্তিতে বলীয়ান হয়েছে। জাপানি ম্যাক্সসাই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এই ইয়াসিন তার এলাকায় বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ দেখিয়েছেন। যেমন- তিনি নিজে সাবলীল হয়েছেন, অনেক রিকশাচালক খেটে খাওয়া মানুষের আর্থিক উন্নয়নের পথ দেখিয়েছেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম আজ প্রতিষ্ঠিত শুধু তাদের নিরলস পরিশ্রমের জন্য। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কোরিয়ার মতো দেশগুলোর প্রতিষ্ঠায় এসেছে এ জন্য যে তারা পরিশ্রমী জাতি এবং হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত মানুষ। শত শত শতাব্দীর পর বিশ শতকের পৃথিবীতে কর্মজীবী মানুষের সামনে এক নবযুগ আসে। পরিশ্রমকে অশ্রদ্ধার চোখে দেখে তারাই, যারা হীনম্মন্য এবং মূর্খ। আমাদের দেশে এখনো সবাই কোনো দাফতরিক কাজের আশায় দীর্ঘ দিন বেকারত্বের গ্লানি ভোগ করে জীবনকে বিষিয়ে তোলে। অথচ তাদের সামনেই পড়ে থাকে শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত হয়ে জীবন ধারণের প্রচুর সুযোগ। ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। বাড়ছে নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা। ফলে আমাদের কাক্সিক্ষত জাতীয় উন্নতি থেকে যাচ্ছে অধরা। তাই আমাদের সবাইকে শারীরিক ও বুদ্ধিগত উভয় ধরনের কাজকেই শ্রদ্ধার সাথে নিতে হবে। আজকে উপলব্ধির সময় এসেছে, কর্মে কোনো হীনতা নেই এবং কর্মশীল মানুষের হাতেই রয়েছে আগামী দিনের নেতৃত্ব।

লেখক : সাবেক উপ-মহাপরিচালক ও কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি অ্যাকাডেমি, গাজীপুর

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫