ঢাকা, বুধবার,২৬ এপ্রিল ২০১৭

মতামত

স্বাধীনতার চার দশক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৫৫ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:০২


প্রিন্ট

বিশ্বের ইতিহাসে আমাদের মতো অধিক মূল্য দিয়ে কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছে বলে খুব একটা জানা যায় না। আমাদের স্বাধীনতা যেমন ছিল রক্তপিচ্ছিল, ঠিক তেমনিভাবে গৌরবেরও।
১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারত বিভাজিত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। আসলে ভারত কখনোই বিভাজিত হতো না যদি ভারতীয় রাজনীতিকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেন। বিশেষ করে মহন দাস করম চাঁদ গান্ধীর সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির কারণেই মুসলমানদের পক্ষে অখণ্ড ভারত মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর স্বাধীন ভারতে কোনো বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ভারত স্বাধীনের পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গোহত্যা নিবারণ করা হবে’। তার এই সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির পর মুসলমানদের পক্ষে কোনোভাবেই অখণ্ড ভারতে যোগ দেয়া মোটেই সম্ভব ছিল না।
অনিবার্য কারণেই ভারত বিভাজিত হয়েছে। ঠিক সঙ্গতকারণেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এক ও অখণ্ড থাকতে পারেনি। সাম্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে মুক্তির জন্যই এ দেশের আপামর জনসাধারণ ৯ মাসের মরণপণ মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিল। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা পিণ্ডির গোলামির শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, সে প্রত্যাশা আমাদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। মূলত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতেই ভারত বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামের পৃথক দু’টি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল। শেখ মুজিবুর রহমানও পাকিস্তান আন্দোলনের একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। তিনিও স্লোগান দিতেন ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, কায়েম করেঙ্গে আল কুরআন’। আসলে পাকিস্তান প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্থান ছিল না।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও মহান বিজয়ের পর ধর্মনিরপেক্ষতা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ধর্ম বিশেষ করে ইসলামকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলেনি। মূলত পাকিস্তানি শাসনচক্রের ক্ষমতালিপ্সা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবেই পাকিস্তান ভেঙেছে। এমনকি তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘কুরআন-সুন্নাহ’ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না বলেও জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু পিণ্ডির গোলামি থেকে মুক্তির পর সব কিছুই পাল্টে গেছে। যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে তার কোনো প্রতিফলন দেখা গেল না।
যেখানে স্বাধীন দেশের সংবিধানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন থাকা উচিত ছিল সেখানে বিশেষ মহলকে খুশি করতেই ভারতের সংবিধান অনুসরণ করেই ১৯৭২ সালে আমাদের জাতীয় সংবিধান প্রণীত হলো। ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলো। উপেক্ষিত হলো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি ও বোধ-বিশ্বাসের বিষয়টি। তাই পরবর্তীতে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনা হয়। কিন্তু এক বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় সংবিধানকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করার জন্যই সংবিধানের পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে।
অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে গণমানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বাস্তবরূপ লাভ করেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এই জনপদের মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা দীর্ঘ দিনের লালিত বিষয়। স্বাধীনতার লক্ষ্যে তারা যুদ্ধ করেছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি নবাব সিরাজউদ্দৌলা, শহীদ তিতুমীর, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেক মহান নেতাকে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের তুর্যবাদক।
একটি গণতান্ত্রিক, সুখী, সমৃদ্ধ, শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, অপরাজনীতি ও অহমিকার কারণে আমাদের স্বাধীনতার চার দশক অতিক্রান্ত হলেও সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বরং অর্জন যৎসামান্যই বলতে হবে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করা উচিত ছিল, তখন ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত বা চিরস্থায়ী করার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করেছে।
দেশ স্বাধীনের পর সে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণœ রাখেনি স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বের দাবিদার রাজনৈতিক দল। তারা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করেছিল। ১৯৭৫ সালে মাত্র চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকা রেখে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তদানীন্তন সরকার অ্যাক্ট পাসের আগেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে আসছিল। ১৯৭৩ সালের ২৯ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে দৈনিক গণকণ্ঠ সম্পাদক আল মাহমুদ অভিযোগ করেছিলেন, “গণকণ্ঠ অত্যন্ত বেআইনিভাবে বন্ধ করিয়া দেয়ার ফলে তথাকার পৌনে তিন শ’ সাংবাদিক ও কর্মচারী বেকার হইয়া পড়িয়াছেন। সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মুহূর্ত মাত্র সময় না দিয়া অফিস হইতে কাজ অসমাপ্ত রাখা অবস্থায় বাহির করিয়া দেয়া হইয়াছে।” ( ইত্তেফাক-৩০ মার্চ, ১৯৭৩)
জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতার কারণেই আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই শিশু রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে দেশের নির্বাচনপদ্ধতির বিষয়ে একটি সমঝোতায় এলেও ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতালিপ্সার কারণই সে অর্জন নস্যাৎ হয়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সহনশীলতার অভাবে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ব্যর্থতার কারণে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন, জীবনমান, সুশাসন ও নিরাপত্তা লাভে সমর্থ হইনি।
ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট আজ দেশ-বিদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন খাদের কিনারে। এ জন্য দেশের মানুষ ক্ষমতাসীনদেরই দায়ী করছে। পরমত সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল উপাদান। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের কিছু অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক তিন ধরনের অধিকার ভোগ করবে, যেমন-
১. জীবন ধারণের অধিকার. ২. ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, ৩. মতপ্রকাশের অধিকার, ৪ সভা-সমিতি করার অধিকার, ৫. সম্পত্তি ভোগের অধিকার, ৬. ধর্মীয় অধিকার, ৭. আইনের অধিকার, ৮. চুক্তির অধিকার, ৯. ভাষার অধিকার, ১০. পরিবার গঠনের অধিকার ও ১১. শিক্ষা লাভের অধিকার।
রাজনৈতিক অধিকারগুলো হচ্ছে
১. ভোটাধিকার, ২. প্রার্থী হওয়ার অধিকার, ৩. অভিযোগ পেশ করার অধিকার, ৪. সমালোচনা করার অধিকার, ৫. চাকরি লাভের অধিকার ও ৬. বসবাসের অধিকার।
অর্থনৈতিক অধিকারের মধ্যে রয়েছে : ১. কাজের অধিকার, ২ উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, ৩. অবকাশ যাপনের অধিকার, ৪. সঙ্ঘ গঠনের অধিকার ও ৫. রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিপালনের অধিকার ইত্যাদি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকের যেসব অধিকারের স্বীকৃত রাষ্ট্র তার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারেনি, বরং নাগরিকেরা তাদের অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ এসব অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই সাংবিধানিক দায়িত্ব। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র জনগণের শাসন, শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকার মোটেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণতান্ত্রিক সব রীতিনীতি উপেক্ষা করছে; যা আমাদের জন্য রীতিমতো অশনি সঙ্কেত। মূলত শাসনকার্যে জনগণের সম্পৃক্ততা উপেক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নেয়া মোটেই সম্ভব নয়।
বিভেদের রাজনীতির কারণে আমরা অনেক পিছিয়েছি। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র যখন উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হচ্ছে, তখন আমরা নিজেরাই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছি। আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে পিণ্ডির গোলামি থেকে মুক্তি লাভের জন্য মরণপণ যুদ্ধ ও বিজয় অর্জন করেছিলাম, প্রতিহিংসা ও অপরাজনীতির কারণে এর সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। দেশে আজো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় কোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজ চলতে পারে না। যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার লাল সূর্যটা ছিনিয়ে এনেছিলাম, কিন্তু প্রাপ্তিটা এখনো অনেকটাই অধরা; যা আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।
smmjoy@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫