ঢাকা, শনিবার,২৯ এপ্রিল ২০১৭

আলোচনা

মাহমুদ দারবিশ : বিশ্ব কাব্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ

ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১৮


প্রিন্ট

সমসাময়িক বিশ্ব কাব্যসাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ ফিলিস্তিনি কবি মাহমূদ দারবিশ মাত্র ২০ বছর বয়সে যিনি ফিলিস্তিনিদের কাছে জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছিলেন। আধুনিক আরবি সাহিত্যের ‘আশ-শি’র আল জাদীদ’ নামক কাব্য আন্দোলনটির অন্যতম মূখপাত্রও ছিলেন তিনি। তাঁর যাবতীয় রচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল স্বদেশ আর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।
দারবিশের বয়স যখন সাত বছর তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র। ১৯৪৮ সালের এক রাত্রে ইসরাইলি সৈন্যরা হানা দেয় আল-বিরওয়া গ্রামে। দারবিশের পরিবার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কোনোক্রমে পালিয়ে আশ্রয় নেন পাশের দামুন গ্রামে, পরবর্তীতে লেবাননে। বছরখানিক পর তাঁরা ফিরে দেখেন, ইসরাইলি বাহিনী তাদের প্রিয় জনপদ ‘আল-বিরওয়া’ ধবংস করে সেখানে গড়ে তুলেছে নতুন ইহুদি বসতি। ইয়েমেন এবং মরক্কো থেকে নিয়ে আসা ইহুদিদের পুনর্বাসিত করে সেখানে নতুন গ্রামের জন্ম দেয়া হয়েছে। এবার তাঁরা নিজ দেশেই শরণার্থী হলেন। কেননা তাঁরা যখন জীবন বাঁচাতে লেবাননে আশ্রয় নেন তখন ইসরাইল আদমশুমারি করে। ফলে দারবিশের পরিবারসহ অসংখ্য ফিলিস্তিনি পরিবারকে ইসরাইলে চিহ্নিত করা হয় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে।
স্কুল জীবন থেকেই তাঁর সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যায়। কবিতার প্রতি তাঁর ঝোঁক অল্প বয়স থেকেই। ১৯৫৩ সালের একটি ঘটনা। ১২ বছর বয়সী দারবিশ ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল এক ইহুদি বালকের প্রতি এক আরব বালকের করুণ আবেদন। ‘ওয়া ইয়া লিমুরারাতিল মুফারিকা’ নামক সেই কবিতায় দারবিশ বলেন:
হে বন্ধু!
তুমি তোমার খেয়াল খুশিমতো দিনের বেলায় খেলতে পার
তুমি তোমার খেলনা বানাতে পার।
কিন্তু আমি পারি না,
তোমার যা কিছু আছে, আমার তার কিছুই নেই
তোমার বাড়ি আছে, আমার নেই।
আমি উদ্বাস্তু...।
আমরা কেন একসাথে খেলতেও পারবনা?
দারবিশ সেই কিশোর বয়স থেকেই একের পর এক রচনা করে গেছেন অসাধারণ সব-সাহিত্য, দ্রোহাত্মক প্রতিবাদী কবিতা। বেশির ভাগ আরব কবির বেলায় যেটা দেখা যায় ষাট বছর বয়সের মধ্যেই তাদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর রচনা শেষ হয়ে যায়। এরপর বলতে গেলে নতুনত্ব আর তেমন থাকে না। দারবিশ ছিলেন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাঁর আগের চেয়ে পরের রচনা আছে আরো চমৎকারিত্ব। প্রতিটিতেই ছিলো নতুনত্ব। মূলত কবিতা লিখলেও অসাধারণ সুন্দর গদ্যও রচনা করেছেন। আরবিতেই লিখতেন তিনি। তবে ইংরেজি, ফরাসি এবং হিব্র“ ভাষাতেও ভালো দখল ছিল তাঁর। প্রায় ২৫টি ভাষায় তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে প্রায় কুড়িটির মতো গ্রন্থ। ফ্রান্সে বরাবরই বেস্ট সেলারের তালিকায় থাকত তাঁর গ্রন্থ। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৩০টি কাব্য এবং আটটির মতো গদ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ষাটের দশক থেকে কাব্যচর্চায় নিয়মিত এই কবি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন ফিলিস্তিনি জনগণের কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতা ধারণ করেছে রাষ্ট্রবিহীন ভূখণ্ডের অজস্্র মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা আর বেদনাকে। তাদের ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। কবিতার মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের চেতনা বপন করে গেছেন। আধুনিক আরবি কবিতায় প্রতিরোধ প্রতিবাদের এক নতুন কাব্যধারা ও শৈলীর জন্মদাতা তিনি। তাঁর কবিতা পাঠের আসরগুলোতে সবশ্রেণীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অবাক করার মতো ছিল। ফিলিস্তিনের জাতীয় আবেগ, আশা-আকাক্সক্ষা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সব অনুভূতি মূর্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর লিরিকধর্মী কবিতায়। আমৃত্যু মাতৃভূমির জন্য সংগ্রামরত এই কবি সর্বত্র নিজেকে নির্বাসিত মনে করতেন। আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভুগতেন। সেই যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়ের কথা নানাভাবে উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। দারবিশ তাই অজস্র নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতা আশাবাদ আর ভ্রাতৃপ্রেমে উজ্জীবিত অথচ প্রতিবাদমূলক। কিন্তু সেটা ক্রোধোন্মত্ত নয়। এটি গতিশীল এবং প্রগাঢ়ভাবে স্বদেশপ্রেমী। তাঁর সে স্বদেশ প্রীতিতে উৎকটতা নেই, নেই কোনো বাহুল্যও। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী সুরের সঙ্গে আশাবাদ একই লয়ে বাধা। এ বিদ্রোহ চেতনা আসলে আশাবাদের যৌক্তিক বিস্তার।

কবিখ্যাতি ছিল তাঁর কিংবদন্তির মতো। দারবিশ বলেছেন:
মানুষকে আমি ঘৃণা করি না
কিন্তু ক্ষুধার্ত হলে
জবর দখলকারীর মাংসই হবে আমার খাবার
সাবধান!
সাবধান!
আমার ক্ষুধা থেকে
আমার রাগ থেকে
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন বারবার আর রচনা করে গেছেন একের পর এক চমৎকার দ্রোহাত্মক প্রতিবাদী-প্রতিরোধী কবিতা। তীব্র নারী প্রেমও তাঁর কবিতায় তাই রূপান্তরিত হয়ে গেছে স্বদেশপ্রেমে। দারবিশের কবিতার শব্দমালার বিপরীতে হায়েনার রক্ত চক্ষু ব্যর্থ, পরাস্ত হয়েছে।
‘প্রতিরোধের কবি’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেলেও তাঁর কবিতার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রেম ও মৃত্যুচিন্তা। ১৯৯৯ সালে ছারিরুল গারবিয়্যাহ নামক প্রেমের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে সবাইকে চমকিয়ে দিয়েছিলেন। বিদ্রোহের কবিতার পাশাপাশি দারবিশের প্রেম এবং মৃত্যু বিষয়ক কবিতাগুলোও অসাধারণ। মা এবং প্রেমিকা ‘রীতা’কে কেন্দ্র করে তাঁর বেশ কিছু মিথাশ্রয়ী কবিতা রয়েছে।
দারবিশের ‘মা’ শীর্ষক একটি কবিতা গান হিসেবে আরব বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়। জেলে বন্দী অবস্থায় সিগারেটের প্যাকেটে এ কবিতাটি রচনা করেন তিনি। বন্দী পুত্রের মায়ের হাতে বানানো রুটি আর কফির কথা ভেবে নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অতি বাস্তব এবং সূক্ষ্ম চিত্র ফুটে উঠেছে এ কবিতাটিতে। কবির ভাষায়:
আমি আমার মায়ের বানানো রুটির জন্য ব্যাকুল
আমি ব্যাকুল মায়ের বানানো কফির জন্য
আমি ব্যকুল আমার মায়ের স্পর্শের জন্য
দুুধের দিনগুলো থেকে শুরু করে সব দিন।
দারবিশের মতো খুব কম সংখ্যক কবিই পেরেছেন নিজ জাতির কণ্ঠস্বর হতে। তিনি সব সময় মানবতার জয়গানই গেয়েছেন।
মাহমুদ দারবিশকে মনে করা হয় সমকালীন আরব বিশ্বের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কবি। আরবি কবিতার সৌন্দর্যকে নতুন ভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন মাহমুদ দারবীশ।
মধ্যপ্রাচ্যের জটিলতায় ঘুরপাক খাওয়া ফিলিস্তিনিদের দুঃখ দুর্দশার চিত্র আঁকতে গিয়ে কবিতায় তিনি নিয়ে এসেছেন সমগ্র বিশ্বের সংগ্রামী মানুষের ছবি। কবিতার মাধ্যমে মানবতার মুক্তির জন্য তাঁর আর্জি দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছিল সার্বজনীন ও বিশ্বজনীন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫