ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

আলোচনা

কাজী ইমদাদুল হক

রবিউল ইসলাম

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১৬


প্রিন্ট

বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে যে সকল বাঙালি মুসলমান মননশীল গদ্য লেখক বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন, কাজী ইমদাদুল হক তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ১৮৮২ সালের ৪ নভেম্বর খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী আতাউল হক যিনি সর্বপ্রথম আসামে জরীপ বিভাগে চাকরি নিয়েছিলেন।
পরে তিনি ওকালতি পাস করে খুলনা আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। কাজী ইমাদুল হক ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। তৎকালীন মুসলমান সমাজে তিনি এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভা তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের স্কুল ও পারিবারিক পরিবেশে। গ্রামে থাকাকালীন কাজী আতাউল হক বই পড়ার আগ্রহে কপোতাক্ষ নদের ওপারে রাড়–লী গ্রামের রায় পরিবারের সাথে পরিচিত হন ও বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগ লাভ করেন। জাতীয় নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের শিক্ষক ও রায় পরিবারের সদস্য বিজ্ঞানী স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় তিনি পুত্রকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার মন স্থির করেন। কাজী ইমদাদুল হককে ১৮৯০ সালে খুলনা জেলাস্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করেন এবং ১৮৯৬ সালে খুলনা জেলাস্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস করেন। ১৮৮৯ সালে কলকাতা মাদরাসা থেকে এফ এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন তিনি পদার্থ বিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স নিয়ে ডিগ্রি ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু পরীক্ষার আগে অসুস্থ্যতার কারণে অনার্স পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি।
এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে এমএ ও বিএ পড়েছিলেন। পরীক্ষার আগেই বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস নির্বাচিত হয়ে ১৯০৩ সালে কলকাতায় মাদরাসায় অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হওয়ায় ১৯০৬ সালে আসামের শিলং শিক্ষা বিভাগে ডাইরেক্টর অফিসে উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি গ্রহণ করেন। আত্মীয়স্বজন ছেড়ে সুদূর প্রবাসে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে স্বাস্থ্যহীনতার কারণে দেশে ফিরে আসেন।
১৯৭০ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশে শিক্ষা বিভাগের শিক্ষাব্যবস্থা আমূল সংস্কার সাধনে নিজ শিক্ষাপ্রণালি প্রবর্তণের উদ্যোগী হন। শিক্ষার্থীদের কাছে ভূগোল শিক্ষা কিভাবে আকর্ষণীয় করা যায় সে বিষয়ে কাজী ইমদাদুল হক বিশেষ চিন্তাভাবনা করেন। তার ভূগোল শিক্ষার একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রণালি শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত সেখানে ভূগোল বিষয়ে শিক্ষাদানকে বিশেষ দক্ষতা দেখান এবং ভূগোল বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। কিছুকাল পরে এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ১৯১১ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভুগোলের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। ১৯১৪ সালে তিনি প্রাদেশিক এডুকেশন সার্ভিস এ উন্নতি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী স্কুল পরিদর্শক পদে ময়মনসিংহ কার্যালয়ে নিযুক্ত হন। ১৯২১ সালে ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম কর্মাধক্ষ পদে নিযুক্ত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বহাল থাকেন।
সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হকের পূর্ব পুরুষ শেখ মো: গায়েসউল্লাহ সপরিবারে ইরাকের বাগদাদ থেকে দিল্লিতে এসে বসবাস করেন। সুলতানি আমলে তিনি প্রথম বিচারপতি নিযুক্ত হন। বিচার কাজে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তৎকালীন সম্রাট তাকে কাজী উল কুজ্জাত উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯১৮ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এ সমিতির মুখপাত্র বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ছিলেন।
মোজাম্মেল হক ও আফজালুল হক মোসলেম ভারত প্রত্রিকায় প্রকাশ করেন। এই পত্রিকা তার আবদুুল্লাহ উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। প্রায় দেড় বছর কাল মোসলেম ভারতের আবদুুল্লাহ প্রকাশিত হয়। প্রত্রিকাটি আকষ্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ইমদাদুল হকের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লে বইটি শেষ করে যেতে পারেননি।
শেষ অংশের খসড়া ইমদাদুল হক রেখে গিয়েছিলেন। এর অবলম্বনে উপন্যাসটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পান কাজী আনারুল কাদির। কাদিরের দ্বিতীয় অংশের পরিমার্জনা করেন কাজী শাহাদাৎ হোসেন। ১৯৩৩ সালে আবদুল্লাহ উপন্যাস প্রথম গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে আবদুুল কাদিরের সম্পাদনায় কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলি প্রকাশিত হয়।
কাজী ইমদাদুল হক আবদুল্লাহ উপন্যাসের যে বিষয়বস্তু উপস্থাপনা করেছেন, সে সম্পর্কে আবদুল কাদির মন্তব্য করেছেন- বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে অবস্থা ছিল তার একটি নিখুঁত চিত্র আবদুল্লাহ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। সে দিনের সমাজ জীবন ও ব্যক্তি মানুষের সমস্যা যে বৃহৎ বাধার সৃষ্টি করেছিল আবদুল্লাহ তার এক মনোরম আলেখ্য। কাজী ইমদাদুল হক বৈচিত্রপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির অধিকারী হলেও তার প্রধান কৃতিত্ব হলো আবদুল্লাহ উপন্যাস।
তার অপরাপর রচনার গুরুত্ব কাজের আবর্তন নিঃশেষ হয়ে গেলেও আবদুুল্লাহ উপন্যাসটি তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

কাজী ইমদাদুল হকের বই কবিতা আঁখি জল (১৯৯০), লতিকা (১৯০৩), উপন্যাস- আবদুল্লাহ (১৯৩৩), প্রবন্ধ- মোসলেম জগতের বিজ্ঞান চর্চা (১৯০৪), প্রবন্ধমালা প্রথম খণ্ড (১৯১৬), প্রবন্ধমালা দ্বিতীয় খণ্ড (১৯১৮), শিশু সাহিত্য নবীর কাহিনী (১৯১৯), পাঠ্যপুুস্তকে ভূগোল শিক্ষা প্রণালি (১৯১০)। কাজী ইমদাদুল হকের কর্ম জীবন কেটেছে সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন কাজে অসাধারণ দক্ষতা গভীর দায়িত্ববোধ ও উদ্ধাবনী শক্তির স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৯১৯ সালে খান সাহেব উপাধীতে ভূষিত করেন।
১৯২৬ সালে তাকে সম্মানিত করা হয়। আবদুুল্লাহ উপন্যাসটি তার সমাধিক খ্যাতি এনে দেয়। বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর আবদুুল্লাহ উপন্যাস পাঠ করে মন্তব্যে লিখিছেন- আমি খুশি হয়েছি বিশেষ কারণে এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল। এ দেশের সামাজিক আবহাওয়া ঘটিত এই কথা এই বই আমাকে ভাবিয়েছে। ২০ মার্চ কাজী ইমদাদুল হকের ৯১তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাকে আমরা আজীবন স্মরণ করব বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫