ঢাকা, সোমবার,১১ ডিসেম্বর ২০১৭

রংপুর

প্রেমের সংসার : আসামের কিশোরী রোজিনা এখন উভয় সঙ্কটে

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর অফিস

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:০৭


প্রিন্ট

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লেখা ‘প্রেম কখনও মধুর, কখনও সে বেদনা বিধুর, কখনও কাঁদায়,কখনও হাসায়’ বিখ্যাত এই গানটির মতো দ্বি-মাত্রিক সমীকরণের হিসেব-নিকেশের ফ্রেমে এখন বন্দি ভারতের আসাম রাজ্যের গোটলং বিহিতরসুতি গ্রামের উচ্ছ্বল কিশোরী রোজিনা আহমেদ। স্থানীয় লাইন কালিয়া ভোমরা মডেল হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তিনি। স্কুল যাওয়া আসার পথেই পরিচয়-সম্পর্ক হয় সেখানে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী বাংলাদেশের সাগর শেখের সাথে। এরপর পারিবারিকভাবে বিয়ে, সংসার, অন্তঃসত্ত্বা হওয়া। একসময় স্বামীর সাথে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দিনাজপুরের পাবর্তীপুরের রুস্তমনগরের শ্বশুরবাড়িতে আসা। তারপর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া। নির্যাতনে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত ঠিক তখনই শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। সেখান থেকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি। এরপর হুমকি, অপহরণের চেষ্টা এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। এখন স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন চাইছে সে হাসপাতাল থেকে সংসারে ফিরুক। আর তার বাবা ভারতীয় প্রশাসনের কাছে ধর্না দিচ্ছেন আন ম্যাচিউরড (অপ্রাপ্তবয়স্ক) হিসেবে তাকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিতে। তবে কি এখন তার অবস্থান শ্বশুরবাড়ি, পিতার বাড়ি, নাকি কারাগারে হবে- এ নিয়ে উৎকণ্ঠিত রোজিনার সময় কাটছে পাবর্তীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

পাবর্তীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেকর্ড অনুযায়ী গত ৭ মার্চ রাত ৮টা ৩০ মিনিটে ভর্তি হন আসামের নাগরিক রোজিনা আহমেদ (১৮)। তার ভর্তি ক্রমিক নং-১৯৫ এবং ভর্তি রেজিস্ট্রি নং ১৩৯০। অবস্থান দোতলার মহিলা ওয়ার্ডের ১৩ নম্বর বেডে। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা গেলো ছিমছাম গোছানো হাসপাতালটির বিছানায় বসে আনমনে কি যেন ভাবছেন রোজিনা। তার চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। আশেপাশের রোগি ও তার স্বজনদের পরপর জিজ্ঞাসা- কী হচ্ছে তার জীবনে। আদৌ বাবা-মায়ের কাছে যেতে পারবে, নাকি ফিরবে স্বামীর ঘরে। নাকি তার জীবন কাটবে এখন জেলকাখানায়। এনিয়ে রাজ্যের দুশ্চিন্তা মেয়েটির চেহারায়।

এ প্রতিবেদককে রোজিনা জানালেন, ভারতের আসাম রাজ্যের সুনীতপুর জেলার তেজপুর থানার কালিয়া ভোমরা এলাকার গোটলং বিহিতর সুতী গ্রামে বাড়ি তার। পিতা আব্দুর রশিদ একজন সাধারণ ড্রাইভার। মা মাজিদা বেগম গৃহিণী। ২ বোন ২ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। রোজিনা জানালেন, স্থানীয় নাইন কালিয়া ভোমরা মডেল হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তিনি। স্কুলে যাওয়া আসার পথে পরিচয় থেকে সম্পর্ক হয় সাগর শেখের (২৪) সাথে। ভাঙ্গারি ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। সাগররা পাশেই ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। পরিচয় ও সম্পর্কের সময় সাগর রোজিনাকে জানান তাদের পৈত্রিকবাড়ি কোলকাতায়। কিশোর বয়সের উম্মাতাল প্রেম। প্রথম দিকে পারিবারিকভাবে সম্পর্কটি মেনে না নিলেও এক পর্যায়ে সাগর শেখের পিতা সুজন শেখ এবং রোজিনার পিতা আব্দুর রশিদ বিষয়টি মেনে নেন। পারিবারিকভাবে আসামেই পিত্রালয়ে গত ৮ মাস আগে তাদের বিয়ে হয়। এরপর ওই গ্রামেই একটি ভাড়া বাসা নিয়ে সংসার পাতেন রোজিনা ও সাগর শেখ।

আড়াই মাস আগে সাগর বলে এখানে ব্যবসা মন্দা চলো কোলকাতায় যাই। সংসারের সুখের জন্য রোজিনা স্বামীর কথায় সায় দেয়। রোজিনা জানায়, একরাতে স্বামীর সাথে রওয়ানা দেন তিনি। কিন্তু সীমান্তের কাছে এসে ভুল ভাঙে রোজিনার। রোজিনা দেখতে পান তাকে সীমান্ত পার করানো হচ্ছে। এতে বাধা দেন তিনি। কিন্তু তখন সাগর রোজিনাকে বলেন, ‘বিএসএফ আছে। টের পেলে মেরে ফেলবে। দ্রুত চলো।’ অগত্যা স্বামীর সাথে বিপদশঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে রওয়ানা। সীমান্ত পার হয়ে আসা হয় বাংলাদেশের জামালপুর জেলায়। এরপর সেখান থেকে নিয়ে সাগরের পিতার বাড়ি দিনাজপুরের পাবর্তীপুরের রুস্তমনগর এলাকায়।

রোজিনা জানান, ‘শ্বশুরবাড়িতে উঠে আমি জানতে পারি সাগরের মা মারা গেছেন। তারপর শ্বশুর আরেকজনকে বিয়ে করেন। আসামেও আমার শ্বশুরের একজন বউ ও তিনটি সন্তান আছে। শ্বশুর-শাশুড়িসহ অন্যদের সাথে আমি মিলিয়ে চলার চেষ্টা করি। এরই মধ্যে আমি বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করার জন্য উতলা হয়ে উঠি। কিন্তু বাধ সাধে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি। মোবাইলে কথা বলতে চাইলেই, বাড়িতে যেতে চাইলেই স্বামী আমার উপর শারীরিক নির্যাতন চালাতে থাকে। আমি বাড়ি যাওয়ার বায়না ধরলে গত ৭ মার্চ আমার স্বামী আমাকে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক মোরধর করে। আমি অসুস্থ হলেও তারা আমাকে হাসপাতালে নেয়নি। রাতে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে হলদীবাড়ি নামের জায়গায় আসি। সেখানে কিছু লোক আমাকে পার্বতীপুর হাসপাতালে ভর্তি করে। ওই রাতেই আমার স্বামী গুন্ডাপান্ডা নিয়ে আমাকে হাসপাতাল থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বাধায় তারা সেটা পারেনি।’

রোজিনা জানায়, ‘এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ আমার খোঁজ খবর নিতে থাকে। হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে আমি এখন সুস্থ্য। আমি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমি চাই আসামে আমার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে। আমি আমার স্বামীকে নিয়ে সেখানে যেতে চাই। ভারত সরকারের কাছে আমি এই দাবি জানাই।’

রোজিনা জানায়, ‘ওসি স্যার আমার কাছে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, আমার নাকি ছয় বছরের জেল হবে। আমি জেলে যেতে চাই না। কারণ, আমার তো কোনো দোষ নেই। আমাকে বলা হয়েছিল কোলকাতায় নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাকে মিথ্যা বলে, বিএসএফ’র ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে স্বামীসহ ফিরতে চাই। সন্তানকে লালনপালনের পাশাপাশি পড়ালেখাও চালিয়ে যেতে চাই।’

পার্বতীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. সিগমা জানান, ‘৭ মার্চ আসামের নাগরিক ওই মেয়েটি ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট (শারীরিকভাবে নির্যাতিত) অবস্থায় হাসাপাতালে ভর্তি হয়। আমরা ট্রিটমেন্ট দিয়ে তাকে সুস্থ্য করে তুলেছি। শুনেছি মেয়েটির পিতা আসবেন, তাকে নেয়ার জন্য। কিন্তু এখনও পৌঁছাননি। মেয়েটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ্য আছে।’

তিনি বলেন, ‘ভর্তি হওয়ার পরপরই কিছু লোক তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিষয়টি আমরা সাথে সাথেই পুলিশকে জানানোর পাশাপাশি হাসপাতালের লোকজন দিয়ে ওইসব লোকদের বের করে দেই।’

রোজিনার শ্বশুর সুজন শেখ জানান, ‘মেয়েটি বাংলাদেশে আসার পর তাকে আমরা মেয়ের মতো স্নেহ করতে থাকি। কিন্তু সে বার বার বাড়ি যাওয়ার কথা বলছিল। আমি গরীব মানুষ। টাকা-পয়সার সমস্যা ছিল। সেকারণে তাকে বলেছিলাম, টাকা ম্যানেজ করি। পরে নিয়ে যাবো। ওর বাবার সাথেও এ বিষয়ে আমার কথা হয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। সাগর ওকে টুলি দিয়ে মাথায় পিটালে মাথা ফুলে যায়। কিন্তু গুরুতর না হওয়ায় আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাইনি। কিন্তু সে পালিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।’

একই কথা জানান শাশুড়ি মাহমুদা বেগম। তারা দুজনই বলেন, ‘আমরা চাই সে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসুক। সংসার করুক।’

এদিকে সুজন শেখের ভাই জানান, ‘এরকম অনেক মেয়েই আছে পার্বতীপুরে। আসলে ভারত সরকার মুসলমানদের নিয়ে সেরকম ভাবে না। হিন্দু হলে এতোদিনে তোলপাড় হয়ে যেতো। সেকারণে রোজিনাকে আসামে পৌঁছে দেয়ার জন্য ভারত সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।’

এদিকে ঘটনার পরপরই রোজিনার স্বামী সাগর শেখ গা-ঢাকা দিয়েছেন। তিনি জানান, ‘রেজিনা আমার বাংলাদেশী পরিচয় জেনেই আমার সাথে সম্পর্ক করে এবং আমরা বিয়ে করি। বাড়ি যাওয়া নিয়ে রাগের বশে আমি তাকে টুল দিয়ে মেরেছি। আমরা চাই সে হাসপাতালে থেকে ফিরে আসুক আমরা সংসার করি।’

পার্বতীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এএইচএম বোরহান উল ইসলাম জানান, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেজিনার বাবা-মা ভারত থেকে না আসা পর্যন্ত তাকে এখানে নিরাপত্তা হেফাজত হিসেবে রাখা হয়েছে।

পার্বতীপুর থানার ওসি মোস্তাক আহমেদ জানান, বিষয়টি আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা যেভাবে আমাকে বলবেন, আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

পাবর্তীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, রোজিনার নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওসি বলেছেন এসপি সাহেবকে। আমি ডিসি স্যারকে জানিয়েছি। আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে হাইকমিশনার পর্যায়ে বিষয়টির সমাধান করা হবে। তবে কবে কীভাবে হবে সেটি পরিষ্কার করেননি তিনি।

ভারতীয় হাইকমিশন অফিস ঢাকার ফাস্ট সেক্রেটারী (মিডিয়া) রঞ্জন মল্লিক জানান, বিষয়টি আমরা অবহিত হয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এটাই আমাদের কাজ।

আসামের বেসরকারী স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রতিদিন টাইমস টিভির বাংলাদেশ সংবাদদাতা মাসুম বিল্লাহ জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মেয়েটিকে গ্রেফতার করতে হবে। পাসপোর্ট আইনে মামলা করে বিচার কার্যক্রম শুরু করে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হতে পারে। তিনি বলেন, তবে যেহেতু মেয়েটি আন ম্যাচিউরড, সেক্ষেত্রে যদি তার স্বজনরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করেন, তাহলে তাকে জেলে পাঠানো নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ষটি আসাম রাজ্য সরকারকে জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকার বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। ঢাকার সাথে আলাচেনা করে তারা বিষয়টির সমাধান করবেন।

মাসুম বিল্লাহ জানান, মেয়েটির পিতা আব্দুর রশিদ তাকে জানিয়েছেন, সীমান্তে তার মেয়ের আন ম্যাচিউরিটি সংক্রান্ত কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, তার মেয়েকে ফুসলিয়ে বাংলাদেশে দিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫