ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

বাংলায় কুরআনের প্রথম অনুবাদক

শাহ্জাহান আলী খাঁন

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৩:৫২


প্রিন্ট

বর্তমানে আমাদের দেশে বাংলায় কুরআন শরিফ সহজে সবখানেই পাওয়া যায়। এক সময় এমন ছিল না। যারা কুরআন পড়তে জানতেন, তারা তিলাওয়াত করেই ক্ষান্ত দিতেন। আর যারা কুরআন নিয়ে গবেষণা ব্যাখ্যা, তরজমা বা আলোচনা করতেন তারা সবাই উর্দু-ফারসিতে পারদর্শি ছিলেন। তাই তারা সে ভাষাতেই পড়তেন, পড়াতেন ও গবেষণা করতেন। প্রাচীন আমল থেকে আমরা যদি বিভিন্ন মিউজিয়াম, জাদুঘর, মসজিদ খানকাসহ যেখানে যেখানে শিলাপিলি পাওয়া গেছে সে সব অনুসন্ধান করে দেখি তো সেখানে দেখতে পাই, কুরআনের আয়াত রয়েছে বটে, কিন্তু কোনো বাংলায় অনুবাদ ছিল না। সবাই জানে কুরআন বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেছে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন। গিরিশচন্দ্র সেন ১৮৮০-৮৬ সালে বাংলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ কুরআন অনুবাদ সম্পন্ন করেন। তখনকার সময়ে আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা একজন অমুসলমানের পক্ষে সত্যিই কঠিন কাজ ছিল। যেখানে বড় বড় আলেমগণ সাহস পাননি, প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি সেখানে একজন হিন্দু লোক এমন একটি কাজ করতে পারেন তা সত্যিই অবাক করার মতো। গিরিশচন্দ্র এই অনুবাদের জন্য আরবি ভাষা শিখেছেন, অনুবাদ করতে গিয়ে ফার্সি-উর্দু ভাষা শিখেছেন। গিরিশ চন্দ্রের এই অবাক করা কাজটিকে মাসিক মোহাম্মাদির সম্পাদক মাওলানা আকরাম খাঁ জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে আরো একটি তথ্য যোগ করা প্রয়োজন বলে মনে করছি যে ভাই গিরিশচন্দ্র ১৮৮৫-৮৭ সালে মহানবী হজরত মোহাম্মদ সা:-এর জীবনিও বাংলায় প্রথম রচনা বা সঙ্কলন করেন। সেই বইয়ের নাম ছিল ‘মহাপুরুষ চরিত’। এটিও কম আশ্চর্যের কথা নয়। কেননা ওই সময়ের পূর্বে অন্য কেউ নবিজীর জীবনি লিখেছেন বলে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভাই গিরিশচন্দ্র সেন থেকে প্রায় দুই শত বছর পূর্বে ১৮০৮ খিষ্টাব্দে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলা চিলখাল মটুকপুর গ্রাম নিবাসী মৌলভী আমির উদ্দীন বসুনিয়া আমপারার কাব্যানুবাদ করেছিলেন। বাংলা ভাষায় কুরআন অনুবাদের তিনিই পথিকৃৎ, যদিও তা আংশিক ছিল। জানা যায়, এই আমপারাটি সেকালের লিথো প্রেসে মুদ্রিত হয়েছিল। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১৬৮। মুদ্রণের সঠিক তারিখ জানা না গেলেও মূদ্রণ রীতির বৈশিষ্ট্যে ভাষার শব্দগত ব্যবহারে গ্রন্থখানি প্রাচীনত্বের দাবি করতে পারে। এর একটি কপি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাগারে অদ্যাবধি রক্ষিত আছে। আমির উদ্দিন বসুনিয়াকৃত কাব্যানুবাদের প্রকাশকাল আনুমানিক ১৮০৮ অথবা ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ ধরা হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের প্রখাত লেখক ও প্রাচীন পুঁথি সংগ্রাহক অতি পরিচিত আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) তার সংকলিত ‘বাংলা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ গ্রন্থেও এক স্থানে আমীর উদ্দিন বসুনিয়ার বাংলা আমপারার কথা লিখেছেন বেশ গুরুত্ব সহকারে। আবার অনেকে মনে করে থাকেন আমির উদ্দিন বসুনিয়ার এই সরল বাংলা কাব্যানুবাদ খানি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে।
রংপুরের কুণ্ডি পরগণার সেই সময়ের বিখ্যাত জমীদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর অর্থানুকূল্যে সর্বপ্রথম গোপালপুরের নিকট শ্যামপুর রেলস্টেশনের কাছে যে মূদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে পূর্ববঙ্গের সর্বপ্রথম পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ প্রকাশ করেছিলেন সে সময়টা ছিল ১৮৪৭ সাল। খুব সম্ভব এই প্রেসেই ছাপা হয়েছিল বসুনিয়ার এই কুরআনের বঙ্গানুবাদ গ্রন্থটি। কবি আমির উদ্দীন বসুনিয়ার পবিত্র কুরআনের আমপারার বঙ্গানুবাদ ১৮৬৬ সালে ছাপার অক্ষরে ছাপা হয় বলে অনেকেই মনে করেন। সেই হিসাবে ভাই গিরিশচন্দ্রের প্রায় বিশ বছর আগে রংপুরের আমির উদ্দীন বসুনিয়াই কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদকারী। যদিও তা আংশিক ছিল, তা সত্ত্বেও তিনিই কুরআনের প্রথম অনুবাদকারী হিসাবে বাংলার মুসলমান সমাজে অমর হয়ে আছেন।
এরপরে উল্লেখ করা যেতে পারে টাঙ্গাইলের করটিয়ার মৌলভী মুহম্মদ নইমুদ্দীন (১৮৩২-১৯১৬) সাহেবের কথা। তিনি আথবার ইসলামিয়া পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনিও পূর্ণাঙ্গ কুরআন অনুবাদে সফল হননি। এদের ছাড়াও কুরআন তরজমায় আরো কিছু কিছু ব্যক্তি হাত দেন, তবে এদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরিফের অনুবাদে কৃতিত্ব অর্জন করেন পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার চণ্ডিপুর গ্রামের অধিবাসী মৌলভি আব্বাস আলী (১৮৪৬-২২)। মৌলভি আব্বাস আলী পূর্ণাঙ্গ কুরআন অনুবাদ করেন এবং প্রকাশ করেন ১৯০৭ সালে। তাই বলা চলে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ কুরআনের বঙ্গানুবাদের গৌরবের দাবিদার মৌলভি আব্বাস আলী (১৮৪৬-২২)। এরপর পূর্ণাঙ্গ কুরআন যিনি অনুবাদ করেন, তিনি হলেন- রংপুরের খান বাহাদুর তসলিম উদ্দীন আহম্মদ (১৮৫২-১৯২৭)।
তিনি রংপুর জেলার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট (১৮৭৭) কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। খান বাহাদুর তসলিম উদ্দীন কৃত এই মহাগ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তরজমা ১৮৯১ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২২ বছরব্যাপী তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। এরপর যার নাম করা যেতে পারে, তিনি হলেন- টাঙ্গাইল জেলার মৌলভি আবুল ফজল আবদুল করিম। তিনিও সম্পূর্ণ কুরআনের অনুবাদ করেছিলেন। তার অনুবাদের বৈশিষ্ট্য হলো- সেই অনুবাদের সাথে আরবিও রয়েছে। তিনি প্রথম জীবনে একটি হাইস্কুলের হেড মৌলভি ছিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ফার্সি ছাপার প্রুফ রিডার হিসেবে চাকরি নিয়ে চলে যান। এর পর থেকে নাম না জানা অনেক অনুবাদকই আংশিক কুরআনের অনুবাদ করেছিলেন। এ ছাড়াও কুরআনের উৎকৃষ্ট অথবা বিশেষ বিশেষ আয়াতগুলোর তরজমা এবং কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাছাড়া কুরআন নিয়ে কাব্যানুবাদও করেছেন, বাংলা সঙ্কলন বের করেছেন। তাদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া যায় এবং তারা হলেন- আবদুল মজিদ, মোহম্মদ আবদুুল হাকিম, আলী হাসান, কিরোন গোপাল সিংহ, মাওলানা রুহুল আমীন, মুহম্মদ আকরম খাঁ, এয়ার আহম্মদ, কুদরত-এ খোদা, কাজী নজরুল ইসলাম, মীর ফজলে আলী, মুহম্মদ আযহার উদ্দীন, ফজলুর রহীম, আবুল ফজল, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ তৈমূর ও খন্দকার সাইদুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫