ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

দেশ মহাদেশ

মানবিক বিপর্যয়ে সোমালিয়া

মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসতে হবে

সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসতে হবে

আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় একবিংশ শতাব্দীতেও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের থাবা থেকে মানুষ বাঁচতে পারছে না। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই এখন এই দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও ক্রমাগত হিমশীতল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জাতিসঙ্ঘ মনে করে। মাত্র দুই দিনেই দেশটিতে দুর্ভিক্ষ তথা তীব্র ুধা ও ব্যাপক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ডায়রিয়া তথা কলেরায় অন্তত ১১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে তীব্র খরার কারণে সোমালিয়ায় জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ কারমাজো। মৃতদের বেশির ভাগই হচ্ছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম উপসাগরের তীরবর্তী গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। তীব্র খরার কারণে ুধা ও পানিশূন্যতায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষ।
দীর্ঘ দিন ধরে সোমালিয়া আফ্রিকার একটি পশ্চাৎপদ দেশ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দেশটির এ অবস্থা কেন? ১৯৬০ সালে সাবেক ব্রিটিশ ও ইতালিয়ান কলোনি থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্ট সাইদ বারীর সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে দেশটিতে ব্যাপক নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। সেখানে দল, উপদল ওয়ারলর্ডস এবং বিভিন্ন চরমপন্থী গ্রুপের অভ্যুদয় ঘটে। তারা দেশকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে শাসন করা শুরু করে। এতে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সঙ্ঘাত ও সংঘর্ষ ঘটে। বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে সংঘটিত গৃহযুদ্ধে গত ২৬ বছরে ১০ লাখেরও বেশি লোক কেনিয়ার দাদাব উদ্বাস্তুশিবিরে স্থানান্তরিত হয়। এ ছাড়াও আরো প্রায় পাঁচ লাখ সোমালি উদ্বাস্তু বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে বাধ্য হয়। আরো হাজার হাজার লোক হয় স্থানীয়ভাবে ঘরবাড়ি হারা হয়ে পড়েছে অথবা খরা ও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছে। অপর দিকে, হাজার হাজার তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শান্তি ও জীবিকার সন্ধানে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গত ২৬ বছরে সোমালিদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের চেষ্টার পরও তা ব্যর্থ হয়েছে।
১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভের পর সোমালিয়াকে আফ্রিকার অত্যন্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখা হতো। ইউভার্সিটি অব মিনেসোটার প্রফেসর আবদি সামাতার লিখিত নতুন প্রকাশিত এক বইয়ে সোমালিয়ার তৎকালীন নেতৃত্বকে ফাস্ট ডেমোক্রেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কারণ সোমালিয়াই ছিল আফ্রিকার প্রথম দেশÑ যেখানে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের পরাজয় মেনে নিয়ে ১৯৬৭ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। পরবর্তী দুই দশকে সোমালিয়া আফ্রিকার মধ্যে অন্যতম একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলে। এ ছাড়াও দেশটি বিশেষভাবে শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার হারকে উন্নত করে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি সাধন করে। কিন্তু ইথিওপিয়ার সাথে ভূখণ্ডগত কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে সোমালিয়া সব কিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলে।
সামরিক বাহিনী বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হলে ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের পতন ঘটে এবং প্রেসিডেন্ট দেশ থেকে পালিয়ে যান। এরপর দেশটি বিভিন্ন উপদলীয় মিলিশিয়াদের মধ্যকার দীর্ঘ মেয়াদি গৃহযুদ্ধে জাড়িয়ে পড়ে। পরে সোমালিয়ায় বৃহত্তর মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে জাতিসঙ্ঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হস্তক্ষেপ করে। এতে জেনারেল আইদিদ এবং আমেরিকান রেঞ্জানদের মধ্যে সর্বতোভাবে অখ্যাত ব্ল্যাকহক ডাউন ব্যাটল অব মোগাদিসু সংগঠিত হয়। ফলে মার্কিন এবং জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহার করা হয়।
২০০০ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ জিবুতিতে সোমালিদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম আঞ্চলিক উদ্যোগ নেয়া হয়। কয়েক মাস ধরে ম্যারাথন সম্মেলন করে সাবেক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আবদি কাশেম সালাদ হাসানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করা হয়।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ইথিওপীয় বাহিনী মোগাদিসু থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরপর আইসিইউর সাবেক চেয়ারম্যান শেখ শরিফ শেখ আহমদকে ২০০৯ সালে জিবুতিতে সমঝোতার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে নতুন করে গড়ে ওঠা আলকায়েদা সমর্থিত আলশাবাব আন্দোলন শেখ শরিফকে প্রত্যাখ্যান করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আল শাবাবের সন্ত্রাসী হামলার কারণে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয় এবং সুদানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষ দেশটিতে গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক।
২০১২ সালে নতুনভাবে হাসান শেখ মাহমুদকে সোমালি ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়। এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রথম সোমালিয়ার ভূখণ্ডে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আবদুল্লাহি কারমাজো দায়িত্ব নিয়েছেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সোমালিয়ার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নৈরাজ্যের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘের মতে সোমালিয়ার ৫০ লাখ মানুষের জন্য সাহায্যের প্রয়োজন। সেখানে তিন লাখ ৬৩ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বলে জানিয়েছে ইউএস এজেন্সিস ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট। সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্ভিক্ষপীড়িত ুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বিশ্ববাসী এগিয়ে আসবে বলেই পর্যবেক্ষক মহল আশা করে। সোমালিয়া অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় রাজনৈতিকভাবে এখন একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই জাতিসঙ্ঘ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন এগিয়ে এলেই সোমালিয়ার ুধা, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের অবসান ঘটানো সম্ভব।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫