ঢাকা, সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭

থেরাপি

অস্কার পেলেন আতা চাচা

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

চাচা-ভাতিজা মিলে ডানে বামে উঁকিঝুঁকি মারছে। কিন্তু নিñিদ্র হলঘরে কোনোক্রমেই প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এদিকে এই হলঘরের ভেতর থেকে মুহুর্মুহু হাততালি, হর্ষধ্বনি ভেসে আসছে। ক্ষণে ক্ষণে মনকাড়া-হৃদয়হারা সঙ্গীতের সুর কানে আসছে। সঙ্গীতের সুরে চাচা-ভাতিজার পাগলপারা-ছাগলতাড়া অবস্থা। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ শিয়ালের গর্তের মতো ভাঙা অংশ চোখে পড়ল আতা চাচার। চাচার চোখ দু’টি ১০০ পাওয়ারের এনার্জি বাল্বের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। তিনি মিটমিট করে তাকালেন ভাতিজার দিকে। ভাতিজার মুখেও হাসির প্রদ্বীপ।
Ñ ভাতিজা, এই ভাঙা অংশ দিয়ে একটু চেষ্টা করলেই ঢোকা যাবে। তার আগে বল মাথা ঢোকাব আগে, না পা ঢোকাব? উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন আতা চাচা।
Ñ চাচা, মাথাটা কোনো করমে ঢোকান। বাকি ব্যবস্থা আমি করছি।
ভাতিজার জোরসে বলো মার্কা ধাক্কায় আতা চাচা ভেতরে ঢুকে গেলেন। দুই চাচা-ভাতিজা ভেতরে ঢোকে তো হতবাক। এমন চোখ জুড়ানো অনুষ্ঠান চাচা-ভাতিজার মিলিত বয়সেও দেখেনি। চাচা-ভাতিজা হাত ধরাধরি করে, উত্তেজনার বারুদ হৃদয়ে ভরে, পেছনের চেয়ারে গিয়ে বসল। খানিক পরই মঞ্চে উঠে এলো একঝাঁক ডানাকাটা পরী। শুরু হয়ে গেল দোলানো-ঝুলানো-মন ভোলানো নৃত্য। নৃত্যের তালে, আনন্দের হালে ভাতিজা দেয় এক লাফ তো চাচা দেয় দুই লাফ। লাফে আর ফালে যখন চাচা ভাতিজার বেহাল অবস্থা, সেই সময় শুরু হলো পুরস্কার ঘোষণা। অস্কার প্রদান পর্ব। চাচা-ভাতিজা এতক্ষণে বুঝে গেছে এটাই সেই কাক্সিত অস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। সেরা অভিনেতার নাম ঘোষণা হলো। মুহুর্মুহু করতালিতে ফেটে পড়ল হলঘর। মঞ্চে উঠে এলেন সেরা অভিনেতা মি. জ্যাক। রাজ্য জয়ের হাসি তার মুখে। চন্দ্র জয়ের চাহনি তার চোখে। ধবধবে সাদা দাঁতগুলো তিনি বের করে রাখলেন যেন টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে এসেছেন। সেরা অভিনেত্রীর নাম ঘোষণা হলো। ঝলমলে পোশাক পরিহিত সেরা অভিনেত্রী হেলেদুলে মঞ্চে উঠে এলেন। দর্শকদের উপহার দিলেন খিলখিলে হাসি। হাসির তরঙ্গে ভাতিজার হৃদয় ছেদ হলো, চাচার হৃদয় ভেদ হলো। ভাতিজা বলল, ‘ওয়াও।’ আর চাচা বললেন, ‘ওএমজি।’। ছেদভেদ হওয়া হৃদয় নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে চাচা-ভাতিজা। এমন সময় সঞ্চালকের কণ্ঠে উচ্চারিত হলোÑ ‘পরের ইভেন্টে বিজয়ী হলেন আতা চাচা। ঘোষণা শুনে চাচা টাসকি খেলেন, ভাতিজা ভেংচি খেল। একে-অপরের চোখে তাকাল উদ্বেলিত হৃদয়ে, বিগলিত চোখে। আতা চাচা বিশ্বাস করতে পারছেন না, তিনি কোন ইভেন্টে বিজয়ী হয়েছেন। সঞ্চালক বললেন, ‘আতা চাচা, আপনি পেছনে বসে থাকবেন না, মঞ্চে উঠে আসুন।’ আতা চাচার আগেই ভাতিজা মঞ্চের দিকে দৌড়াতে লাগল। ভাতিজার সাহস দেখে আতা চাচা বুকে থুথু দিয়ে মঞ্চে উঠে এলেন। গগনবিদারী করতালির মাধ্যমে আতা চাচাকে শুভেচ্ছা জানানো হলো। এবার তিনি আনন্দে উদ্বেলিত। অতি আনন্দে মৃগী রোগীর মতো হাত-পা ডানে বামে ছুড়তে লাগলেন। দু’হাত যত দূর যায় প্রসারিত করলেন। হাত দু’টি উঁচু করে ধরলেন যেন ইচ্ছা করলেই আকাশ ছুঁতে পারেন। এ দিকে আঁটসাট জামা ও জিন্স প্যান্ট পরা আরেক ডানাকাটা পরী এগিয়ে এলো মেডেল হাতে। সে চাচার গলায় মেডেল পরিয়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো হ্যান্ডশেক করতে। নরম হাতের ছোঁয়া পেয়ে আতা চাচার হৃদয়ে বিদ্যুৎ চমকালো। তিনি নিজেকে ৭০০ বছরের যুবকের মতো অনুভব করলেন। আতা চাচা হ্যান্ডশেক করার পর কোলাকুলি করতে উদ্যত হলেন এমন সময় ভাতিজা তাকে পেছন থেকে টেনে ধরল। বলল, ‘চাচা এটা অন্ধকারঘর নয়, হলঘর।’ আতা চাচা নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি মেডেলে কামড় দিলেন। ভাতিজা মেডেলের ফিতে চাচার গলায় পেঁচাতে লাগল। আতা চাচার কষ্ট হচ্ছে। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এ কী করিস?’ এমন সময় তিনি একটি কুচকুচে কালো মহিলার কণ্ঠ শুনতে পেলেন। আতা চাচা ভীষণ বিরক্ত হলেন। মহিলার কর্কশ চেঁচামেচিতে গেদু চাচা চোখ খুলে দেখলেন, তার স্ত্রী মানে আমাদের চাচী দাঁত কিড়মিড় করে তেড়ে আসছেন; আর বলছেন, ‘বেলজ্জ, বেশরম কোথাকার, টিভি দেখে অধিক রাত করে নিদ্রা যাও আর সকাল ৮টায় ঘুম ভাঙে না; বলি তোমার লুঙ্গি কোথায় আছে সে খবর রাখো তুমি?’ আতা চাচা প্রতিযোগিতার অর্ধেক রাস্তায় ঘুমিয়ে পরা খরগোশের মতো ঘুম ঘুম চোখে দেখলেনÑ তার লুঙ্গি গলায় পেঁচিয়ে আছে। তিনি লাফ দিয়ে শয্যা থেকে উঠলেন। হাঁসফাঁস করে নিজেকে গুছিয়ে নিলেন। এতক্ষণে তিনি বুঝতে পারলেন, স্বপ্নের মধ্যে গলায় ফিতার পেঁচ অনুভব করেছিলেন কেন। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে চাচীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, তোমার আগে কেউ ঘরে আসেনি তো?’

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫