ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

মতামত

তাঁর হাসিটা এখনো চোখে ভাসে

প্রফেসর ড. আব্দুল করিম

১৫ মার্চ ২০১৭,বুধবার, ১৭:৫৩


প্রিন্ট

বিএনপি মহাসচিব মরহুম অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সাথে পরিচয় তার বড় ছেলে ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলুর মাধ্যমে। দেলোয়ার সাহেব তখন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। ড. আকবর ও আমি দু’জনই গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক। আকবর আমাদের কয়েকজন অধ্যাপককে সংসদে চিফ হুইপের অফিস কক্ষে নিয়ে গেলেন। সময়টা ২০০৫ সালের নভেম্বর। তিনি অকৃত্রিম হাসি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন। আমার ধারণা ছিল, চিফ হুইপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত মানুষটি কতই না গুরুগম্ভীর এবং বেশভূষায় ফিটফাট থাকবেন; কিন্তু এর ব্যতিক্রম দেখলাম। তিনি লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরে টেবিলে কাজ করছেন। আপ্যায়নের কথা জিজ্ঞেস করলে আমরা স্ন্যাক্স গ্রহণের পক্ষেই মত দিলাম। কিছুক্ষণ আগে তিনি বাসা থেকে পাঠানো দুপুরের খাওয়া সেরেছেন। কথা প্রসঙ্গে তার খাবারের মেনু সম্পর্কে জানলাম। সারাজীবনের অভ্যাসমতো তিনি খাঁটি বাঙালিদের খাবার কালিজিরার ভর্তা, শাক, ডালের চচ্চড়ি, ভাজি ও এক টুকরা মাছ দিয়ে আহার পর্ব সরেছেন। তার অতি সাধারণ বেশভূষা, খাবার এবং কথাবার্তার ধরনই মনে করিয়ে দিলোÑ তিনি মওলানা ভাসানীর ফটোকপি, যার রাজনীতি বাংলার কৃষাণ-কৃষাণীর উঠানকে ঘিরেই আবর্তিত। আমরা আমাদের সহকর্মী ড. আকবর হোসেনের বাবা বলেই মূলত তার সাথে পরিচিত হতে গিয়েছিলাম। এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সমস্যার সমাধান নিয়েও মতবিনিময় হলো। তিনি আমাদের সামনেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সাথে কথা বলে আমাদের একটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দিলেন।
এরপর আর একদিন ড. আকবর হোসেনের সাথেই ন্যাম বিল্ডিংয়ের বাসায় দেখা হলো খোন্দকার দেলোয়ারের সাথে। এবার তার একেবারে শয়নকক্ষেই আলাপ; সম্ভবত ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ভয়ানক ভরাডুবির পরপরই। দর্শনার্থীদের সাথে ড্রইংরুমেই বসেছিলাম। আকবর ভেতর থেকে ঘুরে এসে জানাল- তিনি শুয়ে আছেন, আমাকে তার কক্ষে যেতে বলেছেন। বিএনপির মতো বড় সংগঠনের মহাসচিবের অন্দর মহলে গমন! সত্যি বলতে, এত বড় মাপের রাজনীতিবিদের একান্ত সাহচর্য আমার এ প্রথম। তিনি খুবই ক্লান্ত ছিলেন। লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন। বোঝা গেল, জাতীয় নির্বাচনের ধকল তখনো অবশিষ্ট আছে। পুরনো খাট, যার বার্নিশ বহু আগেই করা উচিত ছিল, সেটার ওপর শুয়ে আছেন। ঘরের ভেতর বসার চেয়ার যা আছে তা অতি সাধারণ। দেখেই বললেন, সাভারের ড. করিম কেমন আছো? এই ‘আছো’ এবং ‘সাভারের ড. করিম’ বলে সম্বোধন করাতে তাকে অনেক আপন মনে হলো। সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের আদি মানুষের সংস্কৃতি, বিশেষ করে কথাবার্তার ধরন একই রকম। বড় রাজনীতিবিদদের কিছু ক্যারিশমা থাকে, যা দিয়ে তারা মানুষকে দ্রুত আপন করতে পারেন। সম্ভবত সেটাই আমার ওপর প্রয়োগ করলেন। অবশ্য বর্তমানে শহরকেন্দ্রিক স্যুটেড-বুটেড রাজনীতিবিদেরা তাদের ড্রেস আর কথা বলার স্মার্টনেসটাকেই ক্যারিশমা ভাবেন। তবে সাধারণ মানুষ ওই সবকে বাঁকা চোখে দেখেন। তিনি প্লাস্টিকের বৈয়ামের ভেতর থেকে নিমকি বের করতে বললেন আকবরকে। জানালেন, নিমকিগুলো মানিকগঞ্জের।
বিভিন্ন আলাপ হলো। রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচনও বাদ গেল না। আমার জানা ছিল, তিনি ফখরউদ্দিন-মইনউদ্দিন সাহেবদের নীল নকশার নির্বাচনে যেতে চাননি। তার যুক্তি ছিল- আওয়ামী লীগ নেত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেবে; পক্ষান্তরে বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন- তার দল সব অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিচার করবে এবং সেই রাজনৈতিক প্যারাডক্সের মধ্যেই সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং সে নির্বাচন হবে বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার এক চক্রান্ত। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। কোন পরিস্থিতিতে তাকে বিএনপি নেত্রী মহাসচিব করছেন তা নিয়েও আলাপ হলো। সে প্রসঙ্গ আমাদের কমবেশি জানা।
তিনি যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আলাপ করলেন, তাহলো দেশ গঠনের পরিকল্পনায় পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা। পেশাজীবীদের রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হতে না দিয়ে, সব সরকারেরই উচিত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া। আমলানির্ভর সরকারের স্বল্পমেয়াদি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উভয়ই হয় ত্রুটিপূর্ণ। অন্য দেশের সাথে যেকোনো ধরনের চুক্তি করার আগে তা নিয়ে অবশ্যই পেশাজীবীদের সাথে পরামর্শ করা উচিত। আমিও অভিমত ব্যক্ত করার একান্ত সুযোগ পেয়েছিলাম। আকবর যখন উচ্চতর গবেষণার জন্য দেশের বাইরে ছিল, তখন তার অনুপস্থিতিতেও কয়েকবার দেলোয়ার সাহেবের সাথে কথা হয়েছে। তিনি দেখা হলেই তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে ‘সাভারের ড. করিম’ বলে সম্বোধন করে কথা বলতেন। এটা দিয়ে তিনি সাভার-ধামরাই-মানিকগঞ্জের সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের অভিন্ন সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে, কী তাদের প্রতি আমার দায়িত্ব সে কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন? হয়তো তাই, তা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি। যতক্ষণ কথা বলতেন, তার সেই অকৃত্রিম হাসিটা মুখেই লেগেই থাকত। ন্যাম বিল্ডিংয়ের বাসায় আলাপের পর থেকেই আমিও তাকে চাচা বলেই সম্বোধন করতাম। আজো দেলোয়ার চাচার মুখের হাসিটা চোখের সামনে ভাসে। মোটেও মিলিয়ে যায়নি। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন চাচার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক : সাবেক ট্রেজারার, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
সদস্য, এগ্রিকালচারিস্টি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫