ঢাকা, শুক্রবার,২৪ মার্চ ২০১৭

মতামত

আবার মোদি-ম্যাজিক

আহমেদ বায়েজীদ

১৫ মার্চ ২০১৭,বুধবার, ১৭:১৯ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০১৭,বুধবার, ১৭:৪৫


প্রিন্ট
ভারতের রাজনীতিতেও হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি ধারা সৃষ্টি করেছে বিজেপি

ভারতের রাজনীতিতেও হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি ধারা সৃষ্টি করেছে বিজেপি

আবারো মোদি ম্যাজিক দেখল ভারত। নানা সমালোচনা আর জন-অসন্তোষের জোয়ার যেন মুহূর্তেই পাল্টে গেল নির্বাচনের দিন। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য পেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল। মোদির জাদুকরি নেতৃত্ব, হিন্দু জাতীয়তাবাদের জোয়ার নাকি প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের দুরবস্থা- এই নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, তা রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষকদের জন্য চিন্তার খোরাক বটে! তবে কারণ যা-ই হোক, ভোটের রাজনীতিতে দিনশেষে ফলাফলই মুখ্য। আর সেখানেই অন্যদের চেয়ে বহু গুণ এগিয়ে গেছেন নরেন্দ্র মোদি।
বিভিন্ন কারণে এবারের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনকে ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতজুড়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার, মোদির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সীদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক এবং সর্বোপরি ২০১৯ সালের নির্বাচনের বিষয়ে ভোটারদের মনোভাব বোঝার জন্য এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করেছিলেন বিশ্লেষক মহল।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন, যেখানে ১৪ বছর পর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে দলটি। বলা হয়ে থাকে, উত্তরপ্রদেশে যে দল সরকার গঠন করে দিল্লির গদি তাদেরই হয়। সে কারণে এই রাজ্যটির গুরুত্ব ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি। এ পর্যন্ত ভারতের ১২ জন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাতজনই ২০ কোটি মানুষের এই রাজ্য থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। আরেকটি কারণে এই রাজ্যটির ভোট ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্ব বহন করে সেটি হলো- ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস উত্তরপ্রদেশে। মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশই মুসলিম। সংখ্যায় যার প্রায় চার কোটি।

হিন্দু জাতীয়তাবাদ
বিশ্বব্যাপী কট্টর জাতীয়তাবাদের যে বিস্তার শুরু হয়েছে তার ঢেউ যে ভারতে আছড়ে পড়েনি সে কথা বলা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা ও কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থানের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ফ্রান্সের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও একই চিত্র দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় সব প্রার্থীই রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা আর জাতীয়তাবাদের বাণী নিয়ে প্রচরণায় নেমেছেন। কট্টর ডানপন্থী মেরিন লা পেন তো ইতোমধ্যেই ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন। নেদারল্যান্ডের নির্বাচনে গ্রিট উইল্ডার্স মুসলিমবিদ্বেষকে পুঁজি করেই মাঠে নেমেছেন। ডানপন্থী ভোটারদের একত্র করতে তার চেষ্টার অন্ত নেই। এ ছাড়া জার্মানি, অস্ট্রিয়া কিংবা পোল্যান্ডে অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার বিরোধিতা করে রক্ষণশীলরা ব্যাপক তৎপর হয়েছে। সব মিলে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বেই রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের রাজনীতিতেও হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি ধারা সৃষ্টি করেছে বিজেপি। আর এটিকে তারা ভোটের মাঠেও ব্যবহার করেছে তুরুপের তাস হিসেবে। নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিপ্রধান অমিত শাহ দু’জনই হিন্দু ভোটারদের কাছে টানতে সাম্প্রদায়িক বক্তৃতা ও বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছেন। উত্তরপ্রদেশের জন্য বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে উন্নয়নের নানা অঙ্গীকারের সাথে ছিল রাম মন্দির নির্মাণের ঘোষণাও। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ভোটারদের আস্থা অর্জন করতেই এই পথ বেছে নিয়েছে। ভারতের মধ্যে সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার বাস উত্তরপ্রদেশে, অথচ এই রাজ্যটিতেও কোনো মুসলিমপ্রার্থী দেয়নি দলটি। সব মিলে হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ নিয়েই বিজেপি ভোটের মাঠে নেমেছে।
মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার দিল্লির মসনদে বসার পর থেকেই ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। হিন্দু জাতীয়তাবাদের গান গেয়েই ২০১৪ সালে ক্ষমতায় বসেছিল বিজেপি। বিজেপির জয়ের পর বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার হয়েছে মুসলিমসহ সংখ্যালঘুরা। গোরুর গোশত কাণ্ডে আখলাক হত্যা তো সারা বিশ্বেই সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। আরএসএসের মতো সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে।

নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি প্রধান অমিত শাহ দু’জনই হিন্দু ভোটারদের কাছে টানতে সাম্প্রদায়িক বক্তৃতা ও বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছেন

কংগ্রেসের দুরবস্থা
দীর্ঘ দিন ভারতের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থা খুবই হতাশাজনক দলটির সমর্থকদের জন্য। বিগত পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে ভরাডুবি হয়েছে ১৩২ বছরের পুরনো দলটির। নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য অবশ্য তাদের মনমোহন সরকারের শাসনব্যবস্থাকেই দায়ী করেন অনেকে। নির্বাচনে হারার পর বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেসের ভূমিকাও ছিল তাদের ঐতিহ্যের সাথে বেমানান। বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্কট। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলকে ঐক্যবদ্ধ ও চাঙ্গা রাখার মতো নেতৃত্ব পাচ্ছে না বহু ডাকসাইটে নেতার জন্ম দেয়া এই দল। বর্তমানে কংগ্রেসের অন্যতম নীতিনির্ধারক রাহুল গান্ধী। তরুণ এই নেতা তার পারিবারিক ঐতিহ্য ও নামে প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না রাজনীতির মাঠে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যোগ্য নেতৃত্বের অভাবেই দলটি জনগণের মাঝে সাড়া ফেলতে পারছে না। বিজেপিতে মোদি যে জাদুকরী ও করিৎকর্মা নেতৃত্ব প্রদর্শন করছেন, তার মোকাবেলায় কংগ্রেস দাঁড়াতেই পারছে না।
উপকূলীয় রাজ্য গোয়ায় বেশি আসন পেয়েও সরকার গঠন করতে পারেনি দলটি। তাদের চেয়ে কম আসন পেয়েও শরিক জোগাড় করে মনোহর পারিকরের নেতৃত্বে সরকার গঠন করছে বিজেপি। এ জন্য গোয়ার কংগ্রেস নেতারা দায়ী করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের। তারা মনে করেন কেন্দ্রীয় নেতারা শরিকদের ম্যানেজ করতে না পেরে নিজেদের অযোগ্যতাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শেখর গুপ্ত মনে করেন, ‘ভারতের কোনো রাজ্যই এখন আর গান্ধী পরিবারকে ভোট দিতে চাইবে না।’ প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটির ব্যর্থতাই হয়তো বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে জয়ের পথ সুগম করে দিয়েছে।
বিজেপি এখন থেকে জাতীয় নির্বাচনের জন্য আটঘাট বাঁধতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদ ছেড়ে মনোহর পারিকরকে তারা পাঠিয়েছে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী পদে। শরিকদের দাবির মুখে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি। এর থেকে বোঝা যায় প্রতিটি পদক্ষেপ কতটা সাবধানে ফেলছে দলটি। কংগ্রেসকে তারা এক ইঞ্চি পরিমাণও ছাড় দিতে রাজি নয়।

মোদি-ম্যাজিক
চমক দেখাতে বরাবরই দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন নরেন্দ্র মোদি। এ গুণের কারণেই দীর্ঘ দিন পর ভারতীয় রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ইতোমধ্যে তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তার বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণ কিভাবে নিয়েছে তা যাচাই করার একটি সুযোগ হয়েছে এবারের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। আবার পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে তার প্রতি ভোটারদের আস্থারও যাচাই-বাছাইও বলা যেতে পারে এই নির্বাচনকে।
কিছু দিন আগে হঠাৎ করেই ৫০০ ও এক হাজার টাকার ব্যাংক নোট বাতিল ঘোষণা করে ভারত সরকার। দেশের অর্থনীতিতে রীতিমতো ঝড় বইয়ে দেয় নরেন্দ্র মোদির এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন মহলে। তবে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মনোভাব কেমন তা জানার সুযোগ ছিল না। অনেকেই তাই এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে মোদির সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পাকিস্তানের সাথে সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়েও পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা ছিল। তথাকথিত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে কম ঝড় ওঠেনি টিভি টকশো কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায়। আবার পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। তবে ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে দু’টি ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন মোদি। কালো টাকা প্রতিরোধে তার নোট বাতিলের সিদ্ধান্তকে জনগণ ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। অন্য দিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোও তাদের হতাশ করেনি।
পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় বিজেপির প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। দিন রাত চষে বেড়িয়েছেন ভোটের মাঠ। সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তরপ্রদেশে। উত্তর প্রদেশের ইতিহাসে আগে এতগুলো আসন পায়নি কোনো দল। তাই ভোটের ফলাফলে আর সব কারণের সাথে মোদির সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টি তার দলের জন্য সুফল বয়ে এনেছে সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫