ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

মতামত

এরদোগান-ভীতিতে ইউরোপ

আলফাজ আনাম

১৫ মার্চ ২০১৭,বুধবার, ১৭:১৪


প্রিন্ট

অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ তুরস্কের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের সাথে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পর্কের অবনতি এ অঞ্চলে কৌশলগত সম্পর্ক বদলের যে নানামুখী তৎপরতা চলছে, তার প্রভাব বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে জার্মানি থেকে। কিছু দিন থেকে জার্মান-তুরস্ক সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক জার্মান সাংবাদিককে আটক করে তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী। এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দেশটির নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র সংগঠন পিকেকের পক্ষে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ আনে তুরস্ক। তার কাছ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার গোপন নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। এই সাংবাদিকের গ্রেফতারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় জার্মানি। এর অংশ হিসেবে জার্মানিতে তুরস্কের একজন মন্ত্রীর অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।
আগামী ১৬ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে তুরস্কে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৫০ লাখ তুরস্কের নাগরিক বসবাস করে। এই অভিবাসীরা যাতে এই গণভোটে এরদোগানের পক্ষে ভোট দেয় এ জন্য প্রচারণায় যাচ্ছেন তুরস্কের মন্ত্রীরা। আগের নির্বাচন ও গণভোটেও এভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রচারণায় অংশ নিয়েছে তুরস্কের মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু এবার জার্মানির সিদ্ধান্তের পর একের পর এক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তুরস্কের মন্ত্রীদের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এসব দেশে মন্ত্রীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন। গত ১০ মার্চ তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওলুদ কাভুসোগুলুকে বহনকারী বিমান নেদারল্যান্ডে নামার অনুমতি দেয়া হয়নি। এরপর তুরস্কের পরিবার ও সামাজিক নীতিবিষয়কমন্ত্রী ফাতমা বেতুল সায়ান কায়াকে রটারড্যামে তুরস্কের কনস্যুলেট অফিসে ঢুকতে দেয়া হয়নি। সেখানে তুরস্কের কয়েকজন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ কনস্যুলেট অফিস বন্ধ করে দেয়। কনস্যুলেট অফিসের সামনে তুর্কি নাগরিকদের ওপর হালকা লাঠিচার্জ করা হয় এবং কুকুর নামানো হয়। তুরস্কের মন্ত্রী সমাবেশ না করে নেদারল্যান্ড থেকে জার্মানির কোলন হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এ নিয়ে তুরস্কের বিভিন্ন শহরে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান আগেই অভিযোগ করেছেন, জার্মানি নাৎসি সময়ের মতো আচরণ করছে এবং সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। তিনি বলেছেন, জার্মানি ও নেদারল্যান্ড নাৎসিদের অবশিষ্টাংশ ও ফ্যাসিস্ট। অপর দিকে, তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন নেদারল্যান্ডের সাথে সব ধরনের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা বন্ধ থাকবে।
প্রেসিডেন্ট এরদোগান নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও কূটনৈতিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মানবাধিকারবিষয়ক ইউরোপীয় আদালতে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত একটি বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। সুইডেন ও অস্ট্রিয়ার সাথেও এই ইস্যুতে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর এই আচরণকে বর্ণবাদী, জাতিবিদ্বেষী ও ইসলামবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছে তুরস্ক।
তুরস্ক নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো যে একধরনের অস্থিরতায় আছে, তুর্কি মন্ত্রীদের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ইউরোপ। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট এরদোগান মস্কো সফর করেছেন। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপারে একমত হয়েছেন। সিরিয়া সঙ্কট নিরসনে তুরস্ক ও রাশিয়া এখন একযোগে কাজ করছে। গত বছর এরদোগানের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর রাশিয়ার সাথে তুরস্ক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথেও এরদোগান প্রশাসন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। রাশিয়া-তুরস্ক ঘনিষ্ঠতা এখন ইউরোপের মাথাব্যথার বড় কারণ। বিশেষ করে ক্রিমিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততায় এই উদ্বেগ আরো বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে একধরনের এরদোগান ভীতি কাজ করছে। এর মধ্যে ১৬ এপ্রিলের গণভোটে যদি এরদোগান বিজয়ী হন তাহলে দেশটি অনেকটা প্রেসিডেন্টশাসিত সরকারব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। সেই সাথে প্রেসিডেন্ট এরদোগান আরো দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। সে ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন।
তুরস্কে গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো এই বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা এরদোগানকে আর তুরস্কের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এই নীতি জার্মানিসহ অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এখন তুরস্ক আরো বেশি মাত্রায় রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা গোটা ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ইউরোপের নিরাপত্তার দায়িত্ব যে মার্কিন প্রশাসন আগের মতো নেবে না, তা আগেই জানিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হবে তাতে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তুরস্ক বেশি লাভবান হবে। অপর দিকে, জার্মানিসহ ইউরোপীয় অনেক দেশ তুর্কি অভিবাসী ও উদ্যোক্তাদের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ছেদ এসব দেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া কৌশলগত অবস্থানের কারণে ইউরোপে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টিতে তুরস্ক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার শরণার্থীরা যাতে ব্যাপক হারে ইউরোপে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে জন্য তুরস্ক সেফ জোন হিসেবে কাজ করছে। এখন তুরস্ক সীমান্ত খুলে দিলে আবারো ব্যাপক হারে মানুষ ইউরোপের দিকে যেতে থাকবে। ফলে এরদোগানকে যতই অপছন্দ করুক না কেন তাকে মেনে না নেয়া ছাড়া ইউরোপের সামনে আর কোনো পথ নেই। এই বাস্তবতার কারণে ইতোমধ্যে ইউরোপের দেশগুলো সুর নরম করতে বাধ্য হচ্ছে। নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তুর্কি কূটনীতিকদের সাথে অসদাচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে রাজি হয়েছেন বলে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। জার্মানির ভূমিকা নিয়েও দেশটির মধ্যে সমালোচনা হচ্ছে। তুরস্কের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনে জার্মানি লাভবান হওয়া দূরে থাক, আরো হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন। ইউরোপের দেশগুলোকে নিজের স্বার্থে তুরস্কের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে আগের মতো তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো অবস্থান এখন আর ইউরোপের দেশগুলোর নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫