ঢাকা, শনিবার,২৫ মার্চ ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

আমাদের নামের গল্প

১৪ মার্চ ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:৪২


প্রিন্ট

আমার গল্প লেখার গল্পটি ‘শেষ না হয়েও হয়ে গেল শেষ’। হাইস্কুলের শেষ আর কলেজের শুরুর মাঝে অখণ্ড অবসরে আমাদের সময়ে তরুণ বয়সের প্রায় সর্বজনীন রোগ কবিতা লেখার চেষ্টার সাথে সাথে ভাবলাম- কবিতা তো সবাই লিখছে, একটা গল্প লিখলে কেমন হয়? কলম ধরার আগে গল্পের আদৌ কোনো প্লট পরিষ্কারভাবে মাথায় এসেছিল কি না বা এসে থাকলেও তা কী ছিল, কিছুই আজ মনে নেই। তবে বেশ মনে আছে, আমার বয়সী একটা ছেলেকে কল্পনা করে কয়েকটি বাক্য লিখে আর এগোতে পারিনি। ছেলেটির নাম কী দেবো, সেটাই হয়ে দাঁড়াল এক যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। যাদের সাথে ভাববিনিময় ও খেলাধুলা করে এ পর্যন্ত বড় হয়েছি, তাদের কথা লিখতে চাচ্ছি। কিন্তু গল্পের চরিত্র হিসেবে তাদের কারো নামই পছন্দ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কামাল, রফিক বা আব্দুল্লাহ নামগুলো কেন যেন মানায় না। ইন্দ্রনাথ, মৃত্যুঞ্জয়, অনিমেষ নামগুলো আমাকে টানছে; কিন্তু আবার বাস্তবজীবনে তাদেরকে খুব বেশি খুঁজে পাচ্ছি না। এই মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে আমার প্রথম গল্প তাই শেষ না হয়েও শেষ হয়ে গেল কিন্তু ছোট, বড় ও মাঝারি কোনো গল্পের কাতারে নাম লিখাতে পারলাম না।
পরে বিভিন্ন সময় এই যন্ত্রণাকর অভিজ্ঞতার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছি, সময়ের সাথে সাথে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আরো অভিজ্ঞতা অর্জনের ফলে কিছুটা উত্তরও পেয়েছি বলে মনে হয়। ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে সমসাময়িক লেখকদের লেখা কিছু মুসলিম চরিত্রের গল্প পড়েছিলাম। কিন্তু কেন যেন মনে খুব বেশি দাগ কাটেনি। মূল কারণ হয়তো বাংলা গল্পের চরিত্র বলতে অবচেতন মনে শুধু শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বা বিভূতিভূষণের গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলোকেই জেনে এসেছি। তাই ইন্দ্রনাথ আর বলাইদের আকর্ষণ ছেড়ে বেচারা গফুর বা রহমতের মতো নামের দিকে যেতে রুচিতে বাধত।
আজ এতকাল পরে মনে হচ্ছে, বহু যত্নে লালিত সেই রুচি আমাদের জীবনযাত্রা, ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদির সাথে খুব বেশি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। কারণ আমার গল্পে কামালকে কামাল নামে ডাকতে রুচিতে বেধেছে, বেধেছে আবদুল্লাহকে আব্দুুল্লাহ বলতে। শত শত বছর এ দেশের ছেলেদের আব্দুল্লাহ নামে, মেয়েদের আয়শা নামে ডাকার পরও এ নামগুলো বাংলা সাহিত্যের চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। এই নামের মানুষের জীবনচিত্রও বাংলা সাহিত্যে প্রতিফলিত হতে পারেনি তেমন। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো আব্দুল্লাহরা বা আয়শারা নিজেদের নিজ নামে ডাকতেও দ্বিধা-সঙ্কোচ করে কাটিয়েছে অনেক বছর।
যদি প্রশ্ন করা হয়- জন, পিটার, পল, মাইকেল, মেরি, এলিজাবেথ, অ্যান ও মার্থা নামগুলো কি ইংরেজি? প্রায় সবাই বলবেন- অবশ্যই। নামগুলোর মানে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর পাওয়া কঠিন হবে। কারণ শব্দগুলো প্রচলিত অর্থে ইংরেজি শব্দ নয়, কিন্তু নামগুলো অবশ্যই ‘ইংরেজি’। শত শত বছর ধরে ইংরেজিভাষীরা নিজেদের জন্য এ নামগুলো ব্যবহার করছে। এগুলো এসেছে বাইবেল থেকে। খ্রিষ্টান ধর্মের জন্মভূমি মধ্যপ্রাচ্যের মূল অ্যারামায়িক, হিব্রু বা আরবি থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষা পর্যন্ত পৌঁছতে নামগুলোর বানান ও উচ্চারণে বিভিন্ন রকম পরিবর্তন হয়েছে। কোনো কোনো নাম আবার মধ্যপ্রাচ্যীয় মূল নামটির অর্থগত অনুবাদ করে তৈরি হয়েছে। আসলে সমগ্র পৃথিবীর খ্রিষ্টানদের বেশির ভাগের প্রথম নাম (given name/first name) আজ পর্যন্ত মাত্র কয়েকজন বাইবেলীয় ব্যক্তির নামের বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তিত রূপ মাত্র। ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে পারিবারিক নামের (surname/last name) যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, প্রথম নামটির বেলায় তা একেবারেই দেখা যায় না।
বাইবেল থেকে এবং প্রথম যুগের খ্রিষ্টানদের নামের অনুকরণে গৃহীত নাম নিয়ে কথিত সেক্যুলার ইউরোপের প্রতিটি দেশের মানুষ বেশ আছে। আমেরিকাসহ সারা দুনিয়ার সব খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দেশে একই চিত্র। এ দেশগুলোতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও নাম গ্রহণের বিষয়টিতে তারা কোনো রকম পরীক্ষায় যাননি। ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে গৃহীত একই ধরনের নাম চলে আসছে শত শত বছর ধরে। এ দিক দিয়ে পুরো খ্রিষ্টানবিশ্ব রক্ষণশীল। অনেকে প্রাত্যহিক জীবনে এই নামের বিচিত্র রূপের পরিবর্তিত ও সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ব্যবহার করেন মাত্র। উদাহরণ হিসেবে লিজ, লিজা, লিসা, এলিজা, বেস, বেটসি, বেটি নামে পরিচিত সবারই খ্রিষ্টান নাম হলো এলিজাবেথ। বাইবেলে এলিজাবেথ হলেন, জন দ্য ব্যাপ্টিস্টের (ইয়াহিয়া) মায়ের নাম।
প্রশ্ন যদি করা হয় এভাবে- মোহাম্মদ, ইব্রাহিম, রহিম, করিম, হামিদ, আয়শা, ফাতেমা, জোহরা, মরিয়ম নামগুলো কি বাংলা? প্রায় সবাই বলবেন- না, এগুলো আরবি নাম। এ ক্ষেত্রে কিন্তু শত শত বছর ধরে বাংলাভাষী সংখ্যাগুরু মুসলিমরা নিজেদের জন্য নামগুলো ব্যবহার করা সত্ত্বেও এগুলোকে বাংলা বলছেন না। এর কারণ কী? ইউরোপীয় বিভিন্ন ভাষাভাষীর বেশির ভাগ নামই যেমন প্রচলিত অর্থে তাদের নিজেদের ভাষার শব্দ নয়, একইভাবে প্রচলিত অর্থে এ নামগুলো বাংলা ভাষার শব্দ নয়। কিন্তু শত শত বছর ধরে বাঙালি এ নামগুলো গর্বের সাথে বহন করার কারণে উৎপত্তিগত শাব্দিক অর্থে বাংলা না হলেও এগুলো ১০০ ভাগ বাঙালি নাম, যেমন রাম, অর্জুন, ইন্দ্র, সীতা, সাবিত্রী নামগুলো উৎপত্তিগত শাব্দিক অর্থে বাংলা না হলেও ১০০ ভাগ বাঙালি নাম। বলা যায়, ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতির কারণে বেশির ভাগ বাংলা বা বাঙালি নাম দু’টি উৎস থেকে এসেছে : মুসলিম নামগুলো প্রধানত আরবি, কিছুটা ফার্সি থেকে, আর হিন্দু-বৌদ্ধদের নামগুলো এসেছে সংস্কৃত থেকে। বাংলা ভাষা উৎপত্তিগতভাবে সংস্কৃত থেকে এলেও বাংলাভাষীর নামের উৎস সংস্কৃত থেকে আসতে বাধ্য নয়, যেমন তামিল দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত হলেও সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতির কারণে প্রায় সব নামই গ্রহণ করেছে ইন্দো ইউরোপীয় সংস্কৃত উৎস থেকে, এতে তামিল হিন্দুদের তামিলত্ব বিন্দুমাত্র হালকা হয়ে যায়নি। আর সমগ্র পৃথিবীর প্রায় সব খ্রিষ্টানের মধ্যপ্রাচ্যীয় উৎস থেকে গৃহীত নামগুলো কারো কাছে কখনো তাদের জাতীয় পরিচয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়নি।
বাংলাদেশে আজ একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে শত শত বছরের মুসলিম ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত নামগুলো থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের ভাষায়, তাদের পছন্দের নতুন নামগুলো অনেক বেশি স্বাজাত্যবোধের পরিচায়ক। আসলেই কি তাই? আমরা কি আবার ঐতিহ্যবিচ্ছিন্ন এমন রুচির লালন করতে শুরু করেছি, যেখানে আমাদের সামষ্টিক জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবহেলায় ফিকে হয়ে যাবে। আমাদের সবার গল্পের চরিত্রগুলো নিজেদের চিনতে পারবে তো?

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী আবু আসাদ ১৯৯০ সাল থেকে বিদেশে আছেন। ভূপদার্থবিদ্যায় পিএইচডি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থিতু হন। বর্তমানে আমেরিকার বিখ্যাত তেল কোম্পানি কনোকোফিলিপসে জিওফিজিসিস্ট (ভূপদার্থবিদ) হিসেবে চাকরিরত আসাদ টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরে সপরিবারে বসবাস করেন। আরবি, ইংরেজি, ফার্সি, রাশিয়ান প্রভৃতি ভাষায় তার দখল রয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫