প্রতিবন্ধীদের বাঁচার অধিকার

হেলেনা জাহাঙ্গীর

প্রতিবন্ধীদের সমস্যা যত ব্যাপক, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্ব দেয়া হলেও বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ততটা মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যক্তিগতভাবে অনেক মহৎ ব্যক্তি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও ব্যাপক পরিসরে প্রতিবন্ধীদের সমস্যা দূর করতে সামাজিক উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না।
একজন প্রতিবন্ধী দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেও সামান্য সহযোগিতার জন্য কেউ হাত বাড়াতে চায় না। এর কারণ, বহুভাবে প্রতারিত হওয়ার পর পরস্পরের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস বেড়েই চলেছে। প্রতিবন্ধীদের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে তাদের প্রতি মানুষের সহমর্মিতাও অনেক কমেছে। এসব সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিবন্ধীদের নামে বরাদ্দ অর্থ ও অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে যেন দুর্নীতি না হয়, সেদিকেও কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী শিশু বলতে অসুস্থতার কারণে, দুর্ঘটনায়, চিকিৎসাজনিত ত্রুটি বা জন্মগতভাবে যদি কারো শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মাধ্যমে কর্মক্ষমতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে লোপ পায় বা তুলনামূলকভাবে কম হয় তাহলে সেই শিশু প্রতিবন্ধী।
প্রতিবন্ধিতার ধরনগুলো হচ্ছে : ১. অটিজম, ২. চলনপ্রতিবন্ধিতা, ৩. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, ৪. দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, ৫. বাকপ্রতিবন্ধিতা, ৬. বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, ৭. শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, ৮. সেরিব্রাল পালসি, ৯. বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা ও ১০. অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা।
জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) ২৩ ধারা অনুযায়ী, অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুর মতো প্রতিবন্ধী শিশুরাও সম-অধিকার ও সমসুযোগ পাওয়ার অধিকারী।
২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক একটি সনদ (সিআরডিপি) গৃহীত হয়। এ সনদ ২০০৮ সালের ৩ মে থেকে কার্যকর হয়। সিআরসি ও সিআরডিপি সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশু যেন কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই তাদের অধিকার ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করবে। এ দু’টি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিমালায়ও প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশুর অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১-এও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার পরও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
জাতিসঙ্ঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউনিসেফ) তার বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১৩ প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে : প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সনদ ও শিশু অধিকার সনদ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। সাধারণ মানুষ, নীতিনির্ধারক এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো জরুরি সেবা যারা দিয়ে থাকেন, তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
একীভূতকরণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে, যেন পরিবেশ শিশুবান্ধব হয়। যেমন- বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা, জনপরিবহন প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা সহজ হয় এবং প্রতিবন্ধী শিশুরা যেন তাদের সহপাঠী বা সমবয়সীদের মতো অংশগ্রহণে উৎসাহিত হয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পরিবারভিত্তিক সেবা ও কমিউনিটিভিত্তিক পুনর্বাসনের বিস্তার ঘটাতে হবে এবং এসব ক্ষেত্রে সহায়তা ত্বরান্বিত করতে হবে। পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনযাপনের জন্য যে বাড়তি খরচ হয় তা মেটাতে পারে এবং আয়ের হারানো সুযোগ ফিরে পেতে পারে। প্রতিবন্ধী শিশু ও তাদের পরিবারের চাহিদা পূরণের জন্য যেসব সহায়তা ও সেবার পরিকল্পনা করা হয়, সেগুলো মূল্যায়নে প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরীসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে এর ন্যূনতম মান ছাড়িয়ে যেতে হবে। সব খাতের সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে, যেন প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরী এবং তাদের পরিবার যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, সেগুলোকে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়। প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জীবন প্রভাবিত করে, এমন সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরীকে শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.