ঢাকা, সোমবার,০১ মে ২০১৭

অবকাশ

দীক্ষার পথ চলা

শওকত আলী রতন

১২ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
খোলা আকাশের নিচে দীক্ষার স্কুলে পড়ছে ছোট্ট শিশুরা

খোলা আকাশের নিচে দীক্ষার স্কুলে পড়ছে ছোট্ট শিশুরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ট্রান্সপোর্ট এলাকায় গেলে চোখে পড়বে ছোট ছোট শিশুরা খোলা আকাশের নিচে গভীর মনোযোগে নতুন নতুন বিষয় শিখছে। যাদের চোখেমুখে আগামী দিনের এক রঙিন স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বুকে লালন করে শিশুরা প্রত্যেকে পাঠে মনোযোগী হয়ে ওঠার এমন দৃশ্য প্রতিদিনের। সুবিধাবঞ্চিত শিশু যাদের বাবা-মায়ের তাদের গৃহশিক্ষক রেখে পড়ানোর মতো সামর্থ্যটুকু নেই এমন স্কুলপড়ুয়া ১৫০টি শিশুকে যুগোপযোগী শিক্ষায় গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দীক্ষা নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। শুধু তা-ই নয়, পাশাপাশি এসব শিশুর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ যেমন বই, খাতা, কলম, স্কুলব্যাগ ও পোশাকসহ আর নানা দ্রব্য বিতরণ করছে। তা ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী যাতে আগেই ঝড়ে না পড়ে সে দিকে তীক্ষè নজর সংগঠনটির।
সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের শিক্ষার প্রসারের কথা মাথায় রেখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম ব্যাচের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো: উজ্জ্বল আকন্দ ২০১৫ সালের শুরুর দিকে দীক্ষা নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের দেড় শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর কোনো ধরনের টিউশন ফি ছাড়াই শিক্ষালাভের সুযোগ পাচ্ছে। তার এই মহৎ উদ্যোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো: মামুনুর রশিদ, অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহিম ( জার্নালিজম), মাহমুদা আকন্দ (ফিলোসফি), আবু সাঈদ মুস্তাফিজুর রহমান (ইএনভি), মো: জালাল উদ্দিন রুনু (ইএনভি), মাসুম শাহরিয়ার (ফার্মেসি), সাবিনা ইয়াসমিন (ফার্মেসি), আনিসা নূরী কাকন (ইউআরপি), আফসানা হক (ইউআরপি), মো: নজরুল ইসলাম (ম্যাথ) ও কামাল হোসেন (ফিজিক্স)। দীক্ষার সব কার্যক্রমে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা থাকে। যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে দীক্ষার যাত্রার শুরু হয়েছিল তা সফলতার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা গেরুয়া, আমবাগান ও ইসলামনগরের নি¤œ আয়ের অর্থাৎ যাদের পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখা করার জন্য সামান্যতম সামর্থ্যটুকু নেই এমন পরিবারের দেড় শতাধিক শিশু শিক্ষালাভের সুযোগ পাচ্ছে। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ট্রান্সপোর্ট এলাকায় উন্মুক্ত স্থানে পাঠে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতসহ অন্যান্য বিষয় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। আর শিশুদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পাঠদান করাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জানা যায়, দীক্ষা কার্যক্রমের শুরুর দিকে প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের ভর্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অনেকের দেখাদেখি এলাকার অন্য শিশুরাও দীক্ষায় ভর্তি হয়ে নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তুলছে। প্রতিটি শিশু নিজেদের তাগিদেই দীক্ষার কার্যক্রমে পাঠে মনোযোগী হয়ে উঠছে।
দীক্ষার প্রতিটি সদস্যের আন্তরিকতা আর ভালোবাসার কারণে খুদে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ট্রান্সপোর্ট এলাকায় প্রতিটি শিশু হাসিমুখে ও উৎসবমুখর পরিবেশে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে থাকে। পাঠদান শেষ হলে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে পথচলার এমন দৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরচেনা রূপে পরিণত হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের সুনাম কুড়াচ্ছে দীক্ষা। দীক্ষার প্রতিটি শিশু পড়াশোনার প্রতি খুবই মনোযোগী, তার প্রমাণ মেলে তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললেই। সাভার উপজেলার গেরুয়া এলাকার নি¤œ আয়ে পরিবারের সন্তান রনি। রনির সাথে কথা বললে সে জানায়, এখানে ক্লাস করতে তার অনেক ভালো লাগে। সব স্যারই তাকে আদর করে। এখানে এসে সে অনেক কিছু শিখছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাঈম জানায়, এখানে নিয়মিত ক্লাস করে আগের তুলনায় ভালো ফলাফল করছে। সে খ্্ুবই খুশি সবার সাথে ক্লাস করার কারণে।
জানা যায়, বৈরী আবহাওয়া থাকলেও পাঠদানের জন্য পাশেই রয়েছে একটি কক্ষ। সেখানেই চলে শিশুদের পড়ালেখার কাজটি।
এক সময় যেসব শিশু বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে জিনিসপত্র বিক্রি করত এমন শিশুরাও দীক্ষার কারণে মেধাবী ছাত্রে পরিণত হয়েছে।
ক্লাস শেষে দীক্ষার পক্ষ থেকে দেয়া হয় স্বাস্থ্যসম্মত বিভিন্ন ধরনের খাবার। খাবার বাবদ খরচ দীক্ষার সদস্যরাই জোগান দিয়ে থাকেন। তবে শিক্ষাকার্যক্রম আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন দীক্ষার সদস্যরা। এ ব্যাপারে কথা হয় দীক্ষার প্রতিষ্ঠাতা মো: উজ্জ্বল আকন্দের সাথে। তিনি জানান, অমনোযোগী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা মাথায় রেখেই মূলত দীক্ষার অগ্রযাত্রা। দীক্ষার মাধ্যমে শিশুরা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করুক আর এই শিশুরাই আগামীতে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়–ক। দীক্ষার সভাপতি মো: জাহিন আমান বলেন, আত্মতৃপ্তির জন্যই দীক্ষার সাথে কাজ করছি। কী পেলাম এই মনমানসিকতা নয়, বরং কী দিলাম এ ধ্যানধারণা থেকে সমাজের জন্য কাজ করছি। আগামী দিনে দীক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্কুলে রূপান্তরের জন্য চেষ্টা করছি। সবার সহযোগিতা থাকলে শিগগিরই এর কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। তিনি বলেন, পথশিশুদের রয়েছে অধিকার। তাদের অধিকার পূরণে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই সুন্দর একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে পারব।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫