ঢাকা, শুক্রবার,২৪ মার্চ ২০১৭

অবকাশ

খোঁড়া

স্বাধীনতার গল্প

জোবায়ের রাজু

১২ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

জ্ঞান ফেরার পর আমির হোসেন দেখেন তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। রোগীর জ্ঞান ফিরেছে দেখে নিলা আনন্দে সবাইকে ডাকতে শুরু করল। মুহূর্তে কেবিনে ডাক্তার-নার্সসহ সবাই চলে এলো। আমির হোসেন অসহায় চোখে সবাইকে দেখছেন, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছেন না। কিভাবে তিনি এখানে এলেন আর কবেই বা এলেন, কিছুই জানেন না। বিড় বিড় কণ্ঠে ছোট্ট করে প্রশ্ন করলেনÑ ‘আমি এখানে কেন?’ রোগীর মুখে কথা ফুটেছে দেখে নিলার তৎক্ষণাৎ জবাবÑ ‘আপনি তিন দিন আগে রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন। ভার্সিটির ছেলেরা আপনাকে এখানে নিয়ে এলো।’ নিলার কথা শুনে আমির হোসেন বললেনÑ ‘তুমি কে?’ হাসিমুখে নিলার জবাবÑ ‘আমি এই হাসপাতালের নার্স। দশ বছর ধরে এখানে আছি।’ নিলার পাশ থেকে আরো একটা মেয়ে আমির হোসেনকে বললÑ ‘চাচা, আমি রোদেলা। নিলার মতো একজন নার্স। আপনার বাড়িতে কে কে আছেন, আমাদের বলেন। আমরা আপনার বাড়িতে লোক পাঠাব। তারা এসে আপনাকে নিয়ে যাবে।’ রোদেলার কথা শুনে আমির হোসেন চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর নিরস কণ্ঠে বললেনÑ ‘আমার বাড়ি পালপাড়া। মা-বাবা নেই। আমার দুই ছোট ভাই ও তাদের স্ত্রী আছে সংসারে। তাদের ছেলে মেয়েও আছে।’ নিলা প্রশ্ন করলÑ ‘আপনার ছেলে মেয়ে নেই?’ আমির হোসেন বললেনÑ ‘আমি বিয়ে করিনি’। সবার এই আলাপচারিতা দেখে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমজাদ হোসেন বললেনÑ ‘তোমরা কী সব আলাপ জুড়ে দিলে! কাউকে উনার বাড়িতে পাঠাও। লোক এসে নিয়ে যাক।’
কেয়ারটেকার বাপ্পীকে পাঠানো হলো আমির হোসেনের বাড়ি। ততক্ষণে কেবিন থেকে নার্স-ডাক্তাররা সরে গিয়ে নিজ নিজ কাজে মন দিলো। নিলা এই তিন দিন ধরে আমির হোসেনের সেবাযতেœ বেশ খেটেছে। এখন রোগীর জ্ঞান ফিরেছে দেখে তার বেশ ভালো লাগছে। হঠাৎ আমির হোসেন খেয়াল করলেন নিলা কাঁদছে কেবিনের এক কোণে দাঁড়িয়ে।
Ñতুমি কাঁদছ কেন?
Ñআপনাকে প্রথম দিন দেখেই আমার বড় ভাইয়া সেলিমকে মনে পড়ে গেল।
Ñতাই নাকি? কোথায় সেলিম?
Ñদশ বছর আগে জলাতঙ্ক রোগে ভাইয়া মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাব দেখা দেয়। পরিবারের হাল ধরতেই বাধ্য হয়ে এখানে এলাম।
Ñখুব দুঃখজনক।
Ñআচ্ছা আপনাকে একটা প্রশ্ন করব?
Ñকী?
Ñএকটু আগে বললেন, আপনার ছোট ভায়ের স্ত্রীরা সংসারে আছে এবং তাদের সন্তানও আছে। আপনি বিয়ে করেননি কেন?
Ñসে অনেক কথা। অনেক লম্বা গল্প।
Ñআমাকে বোন মনে করে বলতে পারেন।
Ñশোন। তখন ১৯৭১ সাল। পারভিনের সাথে আমার প্রেম ছিল। জীবন দিয়ে আমরা একে অন্যকে ভালোবাসতাম। আমি আদর করে পারভিনকে ‘নিঝুম’ নামে ডাকতাম। সে বেশ খুশি হতো।
হঠাৎ দেশে হানা দিলো পাকিস্তানি বাহিনী। মার্চের কালো রাতে তারা সারা বাংলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। দিন দিন বাঙালি তাদের অপকর্মের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে থাকে। আমাদের পালপাড়ার ঘরে ঘরে ধর্ষিত হতে থাকে মা-বোন। গ্রামের দামাল ছেলেরা পণ করেছে তারা যুদ্ধে যাবে। ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। আমিও তাদের সাথে যুদ্ধে যাবো বলে রাজি হলাম।
পরিবারের যথেষ্ট চাপ থাকা সত্ত্বেও অংশ নিলাম মুক্তিযুদ্ধে। দলবল নিয়ে চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে। সেখানে আমাদের প্রশিক্ষণ চলতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় আমার বাম পায়ে এসে বেঁধে মেলেটারিদের বিষাক্ত বুলেট। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি কাতরাতে থাকি। সহকর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টায় বুলেটটা বের করা সম্ভব হলেও চিরদিনের জন্য খোঁড়া হয়ে গেলাম আমি। হাঁটলে আমার পায়ের খোঁড়া ভাবটা সবার চোখে পড়ে।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের পর খোঁড়া পা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার নতুন পরিচয়ে এলাকায় ফিরে আসি। আমার খোঁড়া পা দেখে পরিজনরা খুব দুঃখ প্রকাশ করল। পা নিয়ে অবশ্য আমার কোনো কষ্ট ছিল না। কারণ দেশের জন্য পা কেন, জীবন দিতেও রাজি ছিলাম।
কিছু দিন পর আমার মা বাবা পারভিনদের বাড়ি গেল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। ওদের সবাই মোটামুটি বিয়েতে রাজি থাকলেও পারভিন বদলে গেল। আমার মতো খোঁড়া স্বামীর সংসার করা নাকি তার পক্ষে সম্ভব না বলে আমার মা-বাবাকে সে ফিরিয়ে দিলো। এ ঘটনায় ভেঙে পড়লাম আমি। আমার জন্য অন্যত্র পাত্রী খোঁজেন বাবা-মা। কিন্তু আমি পারভিনকে এতই ভালোবেসে ছিলাম যে, অন্য কাউকে বিয়ের কথা ভাবতেই পারতাম না এবং শেষ পর্যন্ত তাই হলো। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর কুমার জীবন বেছে নিয়ে ছোট ভাইদের বিয়ে দিলাম।
দিন দিন আমি ভাই ও তাদের বউদের কাছে গৌণ হয়ে উঠলাম। বয়স বাড়তে থাকে আমার। শরীরে নানা রোগের সঙ্কেত। আমার চিকিৎসা আর সেবাযতেœ ভাই ও তাদের বউদের বেশ অপরাগতা। বুঝতে পারলাম আমি তাদের হেলার পাত্র হয়ে উঠছি। ভাসুর না হোক, অন্তত একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে সম্মানটুকু তারা আমায় করেনি।
আমির হোসেনের গল্প শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল নিলা। তিন দিন আগে যে ছিল এখানকার একজন অজ্ঞাত রোগী, এখন তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
পালপাড়া থেকে বাপ্পী নিরস মুখে ফিরে এলো। নিলা বাপ্পীকে প্রশ্ন করেÑ ‘কিরে, উনার কেউ আসেনি?’ বাপ্পীর মরা জবাবÑ ‘কেউ আসতে চাইছে না। সবাই তিতি না কার কেক কাটা নিয়ে ব্যস্ত। উনার অসুস্থতার কথা শুনে তারা কোনো পাত্তা দিলো না দেখে আমি চলে এলাম।’ আমির হোসেনের দিকে তাকিয়ে নিলার বুকটা হু হু করে উঠল। ধীরপায়ে আমির হোসেনের শিয়রে গিয়ে বসে ছোট্ট করে প্রশ্ন করলÑ ‘আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি আপনাকে চিরদিনের জন্য এখান থেকে আমার বাসায় নিয়ে যেতে চাই। আমার বাসায় তেমন কেউ নেই। মা আর ছোট ভাই জনি ছাড়া। আমরা দুই ভাই-বোন মিলে আপনার সেবা করব। আমার ভাই সেলিম থাকলে সেটা নিশ্চয় করতাম। যাবেন তো?’ নিলাকে কী জবাব দেবেন আমির হোসেন বুঝতে পারছেন না। টপটপ করে ঝরে পড়ল আমির হোসেনের ক’ফোঁটা চোখের জল।
আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫