ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

অবকাশ

নানা আমার বন্ধু ছিলেন

জীবনের বাঁকে বাঁকে

ইদ্রিস রিয়াদ

১২ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ছোটবেলা থেকেই অনেকটা ডানপিটে স্বভাবের ছিলাম। স্কুল পালিয়ে সাঁতার কেটে, ক্রিকেট খেলে ও ফুটবল খেলে কতশত দিন কাটিয়ে দিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। স্কুল বন্ধ দিলে আনন্দের সীমা থাকত না। বাড়ির বেশির ভাগ ছেলেরা কওমি মাদরাসায় পড়ত বলে তাদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধ মিলত না। সে জন্যই আমার বন্ধের দিনের সব ভালোবাসা থাকত নানা বাড়িকে ঘিরে।
কোনোক্রমে স্কুল বন্ধ দিলেই জামা-কাপড় গুছিয়ে নানাবাড়ি যাওয়ার বায়না। আম্মুও খুব সহজে রাজি হতেন না। মাটিতে গড়িয়ে কত দিন কান্না করেছি তার হিসাব নেই। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলেই আমার নানাবাড়ি যেতে ইচ্ছে করত। সব সময় যে যেতে পারতাম তা নয়। সেই নানাবাড়িতে যে অনেক বন্ধু ছিল তাও কিন্তু নয়। সেখানে আমার এক আকাশ মুগ্ধতা যে বন্ধুটিকে ঘিরে, তিনি আমার নানা। দুনিয়ার বুকে কেউ যদি কখনো আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধুর তালিকা করতে বলে তবে আমার নানা সে তালিকার অগ্রভাগেই থাকবে। আবেগের কথা নয়, বাস্তবেই এই বুড়ো বন্ধুটির মতো প্রিয় কোনো বন্ধু এ জীবনে জোটেনি।
পাঠ্যবইয়ে অমনোযোগী এই আমি মনোযোগ দিয়ে নানার পুঁতি পাঠ শুনতাম। নানা মাছ ধরতে গেলে তার পেছনে মাছের ঝুড়ি বয়ে বেড়ানোয় যে আনন্দ তা লিখে বোঝান অসম্ভব। নানা খুব শিক্ষিত কেউ ছিলেন না, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকা আমার নানাকেই আমার কাছে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত মানব মনে হতো, এখনো তাই মনে করি।
নানা আমাদের সাথে পাখি ধরতে বনে যেতেন। আমার মামাতো ভাই রাজু আর আমাকে ঘুড়ি বানিয়ে দিয়ে কি ভালোবাসা কুড়িয়েছিলেন তা ওনার হয়তো অজানা। যে সময়ে অনেকে নানাদের ভয়ে তটস্থ তখন আমরা নানার আঙুল ধরে নলদিয়া মেলায় যেতাম। বাঁশি কিনে উচ্চস্বরে বাজিয়ে বাজিয়ে বাড়ি আসতাম। নানার হাতে বানিয়ে দেয়া শৈল্পিক পাখির খাঁচা দেখে এলাকার কতজন যে আফসোসে ফেটে পড়েছে এমন একটা পাখির খাঁচার লোভে!
বাড়িতে গোশত-পোলাও রেখেও নানার সাথে গিয়ে কেটে আনা কচুশাক রান্না দিয়ে ভাত খাওয়ায় লোভ ছিল আজীবন। নানা মাছের পোনা ধরে প্রায় বিশ কিলোমিটার পথ হেঁটেও আমাদের বাড়িতে এনে দিয়ে গেছেন। সবার নানা সবার মুরব্বি সাজেন, আমার নানা আমাদের বন্ধু সেজেছিলেন।
এক মঙ্গলবার আমার ছোট মামাটা হঠাৎ অজ্ঞাত রোগে মারা গেল। আমরা সবাই ছুটে গেলাম। চারপাশ কান্নায় ভারী হয়ে আছে। আমি শুধু তাকিয়ে আছি বিছানার এক পাশে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আমার নানার দিকে। একসময় আমাদের নিয়ে তেপান্তর দাপিয়ে বেড়ানো মানুষটা আজ ছেলের লাশ দেখার জন্য বিছানা থেকে নামার শক্তি হারিয়েছেন। অনেকটা নির্বাক মানুষটা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, তার সবচেয়ে ছোট ছেলেটাই তার আগেই দুনিয়া ছেড়েছে। নীরব দু’টি চোখের কোনা গড়িয়ে পড়া জলে তার বুক ভেসে যাচ্ছিল। মামার লাশ দেখে নয়, আমার নানার কষ্টমাখা চেহারা সেদিন এই বুকে ব্যথার ঝড় তুলেছিল।
মামার কুলখানিতে গিয়ে নানার সামনে গেলাম। নানা বিছানার এক কোনায় বসা। আমাকে দেখেই ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলেন। আমি আর আমার ছোট ভাই সোহেল অনেক্ষণ কথা বলে ফিরে এলাম, আসার সময় নানা আমাকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখলেন।
কুলখানির দুই দিন পর মঙ্গলবার, রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমার ছোট খালার ফোন এলো। আম্মু রিসিভ করলেন। কথা বলা শেষে বললেন নানার অবস্থা নাকি ভালো না। আম্মু কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সকালে রওনা দেবো। রাত ২টার দিকে আম্মুর আহাজারিতে ঘুম ভাঙল। নানা মারা গেছেন।
নানার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি। দুনিয়ার আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার নিথর দেহ আমার সামনে। বুক দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। চোখে ভাসছে এ মানুষটার সাথে ঘুড়ি উড়ানো, কচুর শাক কাটতে গিয়ে তার হাত কেটে দেয়া, তার সাথে মাছ ধরতে যাওয়ার বায়না করে কান্না করা। নানার কিচ্ছা শোনার জন্য ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে রাত জাগা।
জীবন্ত স্মৃতি রেখে যাওয়া মানুষটি জীবিত নেই। এ কথাটা মাথায় এলেই দুনিয়াটা ফ্যাকাশে মনে হয়। অবাক লাগে খুব, যখন ভাবি নানাবিহীন এক পৃথিবীতে আমাকে থাকতে হচ্ছে হয়তো আরো কিছু দিন...
দাগনভূঁইয়া,ফেনী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫