ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

অবকাশ

ভালোবাসার বৃষ্টিরা

জীবনের বাঁকে বাঁকে

রায়হান রাশেদ

১২ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম। কোনো বন্ধুর চেঁচামেচিতে কিংবা ভার্সিটিতে যাবার তাড়া নিয়ে নয়। নয় অন্য কোনো দিনের মতো পাখির কুজনে অথবা কাকের অবিরাম কা কা ডাকে। সদ্য ঘুম ভাঙা মনটা প্রফুল্লতায় ভরে গেল। অনাকাক্সিক্ষত খুশিতে সত্তাটা নেচে উঠল। মনপাড়ায় শত শত ইচ্ছা অভিলাষ ভরা যৌবন নিয়ে উথলে উঠল। ঘুম থেকে উঠেই আমার মন ভালো করা প্রিয় বন্ধুদের আগমন দেখে আকাশসমান সুখসাগরে ভেসে বেড়াতে লাগলাম। ধৈর্যের দেয়াল ভেঙে বারান্দার রেলিংয়ের ভেতর দিয়ে বের করে দিলাম হাত দু’টি। পরম ভালোবাসা নিয়ে ছুঁয়ে দিলাম কামনার প্রিয়জনদের। অভিমানি মনে মায়াভরা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলামÑ ‘আজ কত দিন পরে এলে। কোথায় ছিলে এত দিন? সেবারে যে আমাকে একা রেখে চলে গেলে, আর তো ফিরে এলে না।’ তারা ¯েœহভরে ভালোবাসার মমতায় সতত ছুঁয়ে দিচ্ছে আমার শূন্যে ভেসে বেড়ানো যুগল হাত। তাদের সুখকর ভেজা স্পর্শে অভিমান ভুলে শিহরিত পুলকিত না হয়ে পারা যায় না।
তারা আমার অতীত স্মরণের সঙ্গী। আমাকে দমবন্ধ শহরের চার দেয়াল পেরিয়ে গ্রামের টিনের চালের নাবালে শোয়া থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি, ইশকুল মাঠ, নদীতে দৌড়ঝাঁপের কালে নিয়ে যায়। আমার অতীতকে সে কখনো বিদায় বলে না। বিদায় বলে না আমার দুরন্ত ছেলেবেলাকে।
আজ আমার দেহের সব অস্তিত্ব লোভলালসায় বান ডেকেছে। ইচ্ছা হচ্ছে, বাইরে বেরিয়ে পড়ি না কেন? কত দিন পর এই মাটির পৃথিবীতে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই দূর আকাশ থেকে নিরন্তর ধারাবাহিক নিñিদ্র ফুল হয়ে জমিনে পড়ছে বৃষ্টি। জগতের মাটির দেহ ভিজে একাকার। পবিত্র বারির অবগাহনে সিক্ত তার সমান্তরাল বন্ধুর শরীর। বৃষ্টির ছাঁট গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আছড়ে পড়ছে বারান্দার ফ্লোরে। গাছের সবুজ পাতারা মহা সুখে নাচছে। স্নান করছে ভালোবাসার প্রথম রাত পার করার মতো। বৃক্ষের সবুজ পাতার ফাঁক গলে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে জমিনে। সবুজ পত্রপল্লবে শুভ্র বৃষ্টির ফোঁটা মুক্তার দানার মতো লাগছে। বৃষ্টির পানিতে নুইয়ে পড়া গাছের পাতার আগায় শেষ বিন্দু বিন্দু ফোঁটা হাতের মুঠোয় ভরে নিতে চোখ মিলে অপেক্ষা করেছি পাতার নাবালে।
আমার চোখের সামনে দৃশ্যত সব বিল্ডিংগুলো বৃষ্টিতে ভিজে আছে। বহু দিন পর তাদের গায়ের রঙটা আজ ভিন্ন রকম লাগছে। পুরো শহরটা ভিজে আছে বৃষ্টিকন্যার নির্ভেজাল প্রণয়ে।
কোত্থেকে যেন চার পাঁচটা ছেলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। তারা মহানন্দে নাচছে। আর দুষ্টুমি করছে। তাদের বাঁধভাঙা আনন্দ দেখে আমার মন চলে যায় আরও ১০ বছর আগে। ২০০৬ সালে। মায়ের হাজার বকুনি উপেক্ষা করে বৃষ্টির দিনে বন্ধুদের নিয়ে ফুটবল হাতে চলে যেতাম মাঠে। খেলতাম আঁকাবাঁকা। হৈ-হুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখতাম বৃষ্টির গ্রামটাকে। আমাদের দেখে নেমে আসত সেই বাল্যবান্ধবীরা। তখন আমাদের খেলার গতি আনন্দের মাত্রা বেড়ে যেত বহু গুণ। খেলাশেষে মেতে উঠতাম নদীতে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করার মাতামাতি লাফালাফি খেলায়।
বৃষ্টি এলে মনে পড়ে, টিনের চালে বৃষ্টি নাচনের কথা। ছেলেবেলায় টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার মধুর শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। সেই নাচন ঝঙ্কার তুলত মন মহল্লায়। টিনের ঢেউ বরাবর হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতাম বৃষ্টিকে। ইট-পাথরের এই শহরে চাইলেও শুনতে পাই না বৃষ্টির নাচনের শব্দ।
আজ বড্ড ইচ্ছে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভেজার। ফুটবল নিয়ে বেরিয়ে পড়ার। পারছি না। পাছেই কেউ বিদ্রƒপ করে। কিংবা বৃষ্টি ভেজার সঙ্গীরা নেই। অথবা আমাকে দেখে এখন হয়তো আর কেউ বাসা হতে বের হয়ে আসবে না। তবুও বৃষ্টিকে ভালোবেসে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেব আমৃত্যু।
রায়পুরা, নরসিংদী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫