ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

প্রযুক্তি দিগন্ত

বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর একজন মার্ক জাকারবার্গ

১১ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ফেসবুক শুরুর দুই মাসের মাথায় কোটি ডলারে ফেসবুক কিনতে চায় এক বিনিয়োগকারী। ২০ বছর বয়সী মার্ককে এই প্রস্তাব এতটুকু টলাতে পারেনি। বর্তমানে চীন ও ভারতের পর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল সত্তা ফেসবুক। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা শত কোটি অতিক্রম করেছে। ফেসবুক ও জাকারবার্গের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন সুমনা শারমিন

জাকারবার্গের শৈশবে যখন সমবয়সীরা গেমস খেলত, তিনি তখন নিজেই গেমস তৈরি করতেন। টিনএজ বয়সে তিনি সিন্যাপ্স নামে একটি মিউজিক প্লেয়ার তৈরি করেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কাজে লাগিয়ে সিন্যাপ্স শ্রোতার রুচি অনুযায়ী প্লে-লিস্ট গ্রন্থনা করতে পারত। জাকারবার্গের তৈরি করা সফটওয়্যারটি মাইক্রোসফট ও এওএল কিনতে চেয়েছিল। হাইস্কুল পেরোনোর আগেই প্রতিষ্ঠান দু’টি মার্ককে চাকরিও দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জাকারবার্গ দু’টি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে হার্ভার্ডে পড়তে যান। কম্পিউটার কোডিংয়ের ভক্ত মার্কের শুরু হ্যাকার হিসেবে। নিজের কম্পিউটার কাজে লাগিয়ে তিনি নিয়ম ভেঙে বিভিন্ন সিস্টেমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতেন; চাইতেন সেভাবে নতুন প্রোগ্রাম তৈরি করতে।
হার্ভার্ডের আবাসিক হলগুলোয় শিক্ষার্থীদের ছবিসহ প্রোফাইল থাকে। ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা এসব ফাইলকে ফেসবুক বলে। মার্ক তার কম্পিউটার থেকে হার্ভার্ড ফেসবুকে অনুপ্রবেশ ও শিক্ষার্থীদের ছবি চুরি করতেন। নিজের রুমমেটদের নিয়ে একটি ওয়েবসাইট নির্মাণ করেন তিনি। ফেসম্যাশ নামের ওয়েবসাইটটিতে হার্ভার্ড শিক্ষার্থীরা পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এটাই ফেসবুকের ভ্রƒণ। কিন্তু শুরুটা ভালো ছিল না। হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ জাকারবার্গকে অনুপ্রাণিত করেনি। তবে জাকারবার্গ নিজের খেয়ালিপনায় অবিচল ছিলেন। মাইস্পেস ও ফ্রেন্ডস্টারের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কের ধারণা সামনে রেখে তিনি বিভিন্ন প্রোগ্রামিং প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে থাকেন। তার নির্মিত দ্য ফেসবুক প্রকল্পটির সুবিধা ছিল, ইউজাররা সেখানে বিভিন্ন আপডেট পোস্ট করার পাশাপাশি লাইফ ইভেন্ট যোগ করতে পারতেন। মূলত এ সুবিধার সুবাদেই দ্য ফেসবুক দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ক্যাম্পাসগুলোয় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ২০০৪ সাল নাগাদ ফেসবুকের এতটাই প্রসার হয় যে, বিজ্ঞাপনদাতারা এ সাইটে নিজেদের পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে বিজ্ঞাপন নিয়ে ঘুরতে থাকেন। এভাবে ফেসবুক হয়ে ওঠে লাভজনক উদ্যোগ। জাকারবার্গ ও তার রুমমেটরা তখন হল ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে একটি ঘর ভাড়া নেন। পালো আল্টোতে জাকারবার্গের পরিচয় হয় শন পার্কারের সাথে। মিউজিক শেয়ারিং সাইট ন্যাপস্টারের সহপ্রতিষ্ঠাতা শন পার্কার। চার বছর আগে সিলিকন ভ্যালিতে পদার্পণ করায় জাকারবার্গ ও সঙ্গীদের চোখে শন পার্কার ছিলেন অভিজ্ঞ লোক। মার্ক জাকারবার্গের মতোই ইন্টারনেটের পিয়ার-টু-পিয়ার দর্শনের ভক্ত শন পার্কার।
হার্ভার্ড ড্রপআউট জাকারবার্গের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা পার্কারের পছন্দ হয়। ফেসবুকে ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে যোগ দেন শন পার্কার। সিলিকন ভ্যালিতে সিনিয়র হিসেবে তার কাজ ছিল বিনিয়োগকারীদের সাথে যোগাযোগ করা।
সব মিলিয়ে একসময় ইউনিভার্সিটির হলে শুরু হওয়া উদ্যোগ দ্রুত কোটি ডলারের স্বর্ণখনি হয়ে ওঠে। বিশ্বকে বদলে দেয়ার কথা যেভাবেই বলুক না কেন, ফেসবুকের মানবসম্পদ কাঠামো গড়া হয়েছে পঞ্চাশের দশকের কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়াশীলতার আদলে। ফেসবুকের প্রথম দিকে জাকারবার্গের একাধিপত্য ছিল। যে যা-ই করুক না কেন, সবাইকে জাকারবার্গের দর্শন মেনে চলতে হতো। অফিস থেকে এক মাইলের মধ্যে যাদের বাড়ি ছিল, যখন তখন অন-কল থাকার প্রতিদান হিসেবে তারা মাসিক ৬০০ ডলার বোনাস পেতেন। স্যান্ডেল-গেঞ্জি পরে, ছেলেমানুষি কায়দায় যেভাবেই অফিস চালানো হোক, ফেসবুক মূলত ছিল ভীষণ নিয়ন্ত্রিত এক উদ্যোগ। জাকারবার্গের বিজনেস কার্ডেই ঘোষণা ছিল, ‘আই অ্যাম সিইও, বিচ।’
জাকারবার্গের দর্শন ছিল নিয়ন্ত্রণ ও অবতারের মিশ্রণ। বিশ্বকে বদলে দেয়ার অঙ্গীকারে তিনি ফেসবুক যাত্রা শুরু করেন। গোড়ার দিকে তরুণ রক্তের উন্মাদনা বলে অনেকে উড়িয়ে দেন। কিন্তু মার্ক জাকারবার্গ নিজের নীতিতে অটল থেকেছেন। হার্ভার্ডের নিয়ম ভেঙে ফেসম্যাশ পেজ গঠনের সময় থেকে তিনি বরাবরই হ্যাকার নৈতিকতার সমান্তরাল মনোভাব ধারণ করেছেন। নিয়ম ভাঙার, প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাসের প্রবণতা তার সবসময়কার।
জীবনাচারেও তিনি বিলাসিতা এড়াতে চান। নিজস্ব জেট রয়েছে তার। ফেসবুকেরও বিরাট বাজেট রয়েছে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও সিইওর সুরক্ষায়। তবু মার্ক বেড়ানোর সময় বরাবরই বিলাসিতা এড়ানোর পক্ষপাতী। জাকারবার্গের সম্পদের পরিমাণ এখন ৫ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। ফোর্বসের শীর্ষ ধনীর তালিকায় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি ছিলেন ৬ নম্বরে; বিশ্বে ক্ষমতাবানের তালিকায় তিনি রয়েছেন ১০ নম্বরে। এরপরও জাকারবার্গ ও তার স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান ‘মানুষের সম্ভাবনা বিকাশে’ নিজেদের জীবদ্দশায় ফেসবুকে মালিকানার ৯৯ শতাংশ দান করার ঘোষণা দিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বনেদি এলাকা পালো আল্টোতে ৭০ লাখ ডলারে কেনা জাকারবার্গের বাড়িটি সিলিকন ভ্যালির অন্য অভিজাতদের ঠিকানার তুলনায় সাদামাটা বলতে হবে। এ বাড়ি কেনার আগে জাকারবার্গ বরাবরই ভাড়াবাড়িতে থেকেছেন।
হার্ভার্ডে পড়াশোনা অর্ধসমাপ্ত রেখে নতুন কিছু করার স্পৃহায় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছিলেন জাকারবার্গ। অবশেষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি মিলছে ফেসবুক কর্ণধারের। তবে এ জন্য হার্ভার্ডে আবারো পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন না ৩২ বছর বয়সী জাকারবার্গ। এর পরিবর্তে নতুন বছরে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রথম ক্লাসে সূচনা বক্তব্য রাখবেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে জাকারবার্গও অর্জন করবেন সম্মানসূচক ডিগ্রি। সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়েছেন হার্ভার্ড প্রেসিডেন্ট ড্রিউ ফস্ট। তিনি বলেন, বৈশ্বিক আন্তঃযোগাযোগে যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে ফেসবুক। আধুনিককালে প্রতিষ্ঠানটিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, এমন উদ্ভাবন হয়েছে অনেক কম। প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বকে বদলে দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন জাকারবার্গ। গত ১৩ বছরে বিশ্বের অন্যতম দামি, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে ফেসবুক। আগামী ২৫ মে হার্ভার্ডে নবীনদের প্রথম ক্লাসে সূচনা বক্তব্য রাখবেন জাকারবার্গ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫