পরিবহন ধর্মঘট থেকে চিকিৎসক ধর্মঘট

আলফাজ আনাম

সমাজে অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতা বাড়ছে। তুচ্ছ কারণেও মানুষ মেজাজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। একজন আরেকজনের ওপর আঘাত করা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমনকি সঙ্ঘবদ্ধভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য অমানবিক আচরণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে না অনেকে। দাবি আদায়ের জন্য এবার এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে দু’টি ধর্মঘট হয়ে গেল। গত সপ্তাহে পরিবহন ধর্মঘটের পর দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোর শিক্ষানবিস চিকিৎসকেরা ধর্মঘটের ডাক দেন। এসব ধর্মঘট ডাকা হয় পেশাগত সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এ দিকে ভোগান্তিতে পড়েন লাখ লাখ মানুষ। এ অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
আদালতের রায়ে একজন ট্রাকচালকের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ঘোষণার পর দেশের পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডেকে সারা দেশ অচল করে দিয়েছিলেন। এ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল একজন মন্ত্রীর বাসায়। পরিবহন চালকদের যাতে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ড না দেয়া হয়, এটাই ছিল তাদের দাবি। মন্ত্রী ধর্মঘটের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছিলেন ধর্মঘট নয়, শ্রমিকেরা স্বেচ্ছায় অবসরে গেছেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রবল সমালোচনার মুখে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সাথে সরকারের তিনজন মন্ত্রীর বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। এ দাবি আদায়ে রাজধানীর গাবতলীতে শ্রমিকদের বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে একজন পরিবহন শ্রমিক মারা যান; কিন্তু তাদের দাবি আদায় কী হলো তা অস্পষ্টই থেকে গেল। শ্রমিকেরা কথিত অবসর থেকে আবার কাজে ফিরে এসেছেন; কিন্তু এর মধ্যে ঝরে গেল একটি প্রাণ। হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘটে সারা দেশে বহু মানুষ নাকাল হয়েছেন। ব্যবসায় বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। অনেক অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়নি। শ্রমিকেরা রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেন। ধর্মঘটকালে পরীক্ষার্থীরা কাকুতিমিনতি করে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে পেরেছে, এমন ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকেরা দুর্ঘটনার কোনো দায় নিতে চান না। অদক্ষ চালক যদি কোনো মানুষকে হত্যা করে তারপরও তাদের শাস্তি দেয়া যাবে না কেন? এ দেশে এখন সবাই আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে চায়।
পরিবহন ধর্মঘট শেষ না হতেই দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোর শিক্ষানবিস চিকিৎসকেরাও ধর্মঘটের ডাক দিলেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষানবিস বা ইন্টার্ন এক চিকিৎসক কর্তৃক এক রোগীর ছেলেকে মারধরের ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বগুড়ার ইন্টার্নদের ইন্টার্নশিপ ছয় মাসের জন্য বাতিল ঘোষণা করলে সেখানে ধর্মঘট শুরু হয়। অবশ্য ২৭ ঘণ্টা পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট মোতাবেক চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের ইন্টার্নশিপ ছয় মাসের জন্য বাতিল করা হয়। এর প্রতিবাদে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের পাশাপাশি রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, যশোর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ধর্মঘটের ডাক দেন।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া এ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত এক রোগীর ছেলে একজন নারী ইন্টার্নের কাছে ফ্যানের সুইচ কোথায় জানতে চেয়েছিলেন। তখন তাকে সিস্টার বলে সম্বোধন করেছিলেন। ‘সিস্টার’ বলা হয় নার্সকে। নারী চিকিৎসক তো নার্স নন। ফলে তার আত্মমর্যাদায় লাগে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে ছেলেটিকে মারধর করেন কয়েকজন ইন্টার্ন ডাক্তার। অপর দিকে শিক্ষানবিস এ চিকিৎসকেরা অভিযোগ করছেন যে, রোগীর স্বজনেরা নারী চিকিৎসককে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছে। ফলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এর প্রতিবাদ করেছেন। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোয় রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। কারণ হাসপাতালে যখন কোনো রোগী এসে ভর্তি হয় তখন ভর্তিকার্যক্রম থেকে শুরু করে প্রাথমিক চিকিৎসা পর্যন্ত সবই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের করতে হয়। বলা যায়, একজন রোগীর চিকিৎসার প্রাথমিক ধকলের চাপ তাদের ওপর বেশি থাকে; কিন্তু একজন রোগীর স্বজন যদি একজন চিকিৎসককে গালি দিয়ে থাকে এ জন্য তার গায়ে হাত তোলা কতটা শোভন? তারা যে ছেলেটিকে মেরেছেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে অপরাধের পাশাপাশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের শৃঙ্খলার প্রশ্নটি জড়িত। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলো চিকিৎসার সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বটে। মানুষ ভুলত্রুটি বা অপরাধ অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে করে না। অনেক সময় পরিস্থিতি বা অসহিষ্ণু মানসিকতার কারণে এমন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ঘন ঘন যে, ইন্টার্ন ডাক্তারদের সাথে রোগী বা চিকিৎসকের মারামারি হয় তাও নয়। তাহলে তো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলো চালু থাকার কথা নয়; কিন্তু এ কথা বলতেই হবে, রোগীর স্বজনের গায়ে হাত তোলা অন্যায়। পেশাগত শৃঙ্খলার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল; কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা এ শাস্তি প্রত্যাহারের দাবিতে ধর্মঘট ডাকেন। এই ধর্মঘট ডাকার মধ্য দিয়ে সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি প্রদর্শন করা হয়। যেমন- মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যাতে না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য পরিবহন শ্রমিকেরা সঙ্ঘশক্তি দেখিয়েছিলেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকেরাও আলোচনার মাধ্যমে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন; কিন্তু তার আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ ধর্মঘটকে বেআইনি বলে উল্লেখ করেছেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইন্টার্ন চিকিৎসক নেতাদের সাথে তার বাসায় বৈঠক করে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল সে শাস্তি প্রত্যাহার করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক কেন একজন রোগীর স্বজনের ওপর হাত তুললেন? অথবা একজন রোগীর স্বজন কেন একজন নারী চিকিৎসককে অশ্লীল ভাষায় গালি দিলেন? এমন পরিস্থিতি যে আবারো ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তখনো কি এভাবে ধর্মঘট ডেকে এরপর মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে সমস্যার ‘সমাধান’ করতে হবে? কেন চিকিৎসার মতো মহান পেশায় আসা তরুণেরা এতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন? অথবা একজন নারী ডাক্তারের কর্মপরিবেশ কি এতটাই খারাপ হয়ে পড়ছে যে, রোগীর স্বজনেরা তাকে অশ্লীলভাবে গালি দেয়ার সাহস পায়। এমন পরিস্থিতির একটা ব্যাখা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা: মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, রোগীর স্বার্থকে সবার আগে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রফেশনাল হিসেবে ইন্টার্ন ডাক্তাররা ধর্মঘটে যেতে পারেন না। তারা কেন ধর্মঘটে যান এর কারণ খুঁজে দেখা উচিত এবং এর মূলে হাত দিতে হবে। ইন্টার্ন করার সময় সিনিয়র চিকিৎসকেরা তাদের চিকিৎসার বিষয়ে শেখান; কিন্তু কঠিন পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে সেই শিক্ষাটা তারা দেন না। এ ছাড়া উন্নত বিশ্বে মেডিক্যাল শিক্ষায় রোগী ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে আচরণবিজ্ঞান পড়ানো হয়। আমাদের দেশে আচরণবিজ্ঞান পড়ানো হয় না। এটা পড়ানো হলে ডাক্তার অথবা রোগীর মধ্যে সৃষ্ট ঝামেলা কমবে। এ ছাড়া আরো কিছু সমস্যা আছে। রোগীরা সব সময় মনে করেন, চিকিৎসকেরা তাকে ভালোভাবে দেখেন না। তার ধারণা, ভালোভাবে দেখলে হয়তো রোগী আরো আগে ভালো হয়ে বাড়ি চলে যেতে পারতেন। অপর দিকে, ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা ক্ষুব্ধ থাকেন নানা কারণে। তাদের যে সম্মানী দেয়া হয় তা সামান্য। ইন্টার্ন শেষ হওয়ার পরই তারা বেকার হয়ে পড়বেন। কোথায় চাকরি পাবেন, কবে চাকরি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত কিভাবে জীবনটা চলবে তা নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকেন তারা। ফলে অসন্তুষ্ট রোগী ও বিক্ষুব্ধ ইন্টার্ন চিকিৎসক একসাথে হলেই সামান্য কারণেও রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে অপ্রীতিকর ঘটনায়। অন্য দিকে একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে মেডিক্যাল পড়ার সুযোগ দেয়া হয়; কিন্তু দেখা হয় না, চিকিৎসক হওয়ার মানসিকতা তার মধ্যে আছে কি না। চিকিৎসক হওয়ার মানসিকতা কারো মধ্যে না থাকলে তিনি রোগীর সাথে ভালো আচরণ করতে পারবেন না, ভালো চিকিৎসাও দিতে পারবেন না। (নয়া দিগন্ত, ৬ মার্চ ২০১৭)
এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, কর্মস্থলে চিকিৎসকেরা নানা ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। কোনো রোগীর স্বজন যদি চিকিৎসকদের গালাগালি করে থাকে তা গর্হিত অপরাধ। এ ব্যাপারে তারা প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষানবিস চিকিৎসকেরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে রোগীর স্বজনকে মারধর করেছেন। আবার এ কারণে যখন দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তখন ধর্মঘট ডেকে চিকিৎসাসেবা প্রদান থেকে বিরত থাকলেন। শিক্ষানবিস চিকিৎসকদের এমন আচরণ এ পেশার শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতার পরিপন্থী। পেশাগত ঝামেলা সব পেশায়ই থাকে। চিকিৎসকেরাও এর বাইরে নন; কিন্তু রোগীর স্বজনকে মারধর করা কিংবা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ায় ধর্মঘট ডাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, চিকিৎসা পেশার জন্য যে মানসিকতা গড়ে ওঠা দরকার, আমাদের তরুণদের মধ্যে তা কতটা গড়ে উঠছে? অবশ্যই এর ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক ও পরিচালনার সাথে যারা জড়িত রয়েছেন তাদের এখন এ দিকগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে শুধু মেডিক্যালে পড়লে হবে না, চিকিৎসকদের সেবা ও সহিষ্ণুতার মনোভাব জাগাতে হবে। তদুপরি, মেধাবী এসব ছাত্র যদি মেডিক্যাল কলেজে লেখাপড়া শেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকে, স্বাভাবিকভাবে তাদের মানসিকতার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। চিকিৎসকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের একটা বড় দায়িত্ব। কিন্তু এ নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
এ ছাড়া সঙ্ঘশক্তি দিয়ে দাবি আদায়ের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে তা দেশের জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠী বা পেশাজীবী সংগঠন যদি শক্তি দিয়ে রাষ্ট্র, আইন, বিচারকে নতজানু করাতে চায় তাহলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হবে। পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে। দুঃখজনকভাবে এ পন্থায় অনেক ক্ষেত্রে সফল হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে।

alfazanambd@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.