ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

বায়ুদূষণ ও বাংলাদেশ

হারুন-আর-রশিদ

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:২৫ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৩৯


হারুন-আর-রশিদ

হারুন-আর-রশিদ

প্রিন্ট

ঢাকা এখন যেন দূষণের গ্যাস চেম্বার। অন্য দিকে বিটিভি অন করলে মনে হয়, ঢাকা উন্নয়নের সেরা শহর। ক্ষমতাসীনদের চোখে কখনোই ঢাকার যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যগুলো চোখে পড়ে না। একটি দৈনিক গত ১৭ ফেব্রুয়ারি লিখেছে, ঢাকা শহরের উন্নয়নের আসল চেহারা কী এটাই? বিশ্বে বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান তৃতীয় স্থান থেকে উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে। ২০১৪ সালে চতুর্থ, ২০১৬ সালে তৃতীয় ও ২০১৭ সালে দ্বিতীয় হওয়া ধারাবাহিক উন্নতির নমুনা বটে। ভয়ানক দূষণের এ উন্নতির অপর পিঠে রয়েছে স্থায়ী বসবাসের অযোগ্য শহরের শিরোপা অর্জন এবং হাজারো মানুষের বায়ুদূষণে মৃত্যুর ভয়াবহ রেকর্ড। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলেছে, এক কথায় ধোঁয়া আর ধুলার শহর ঢাকা। সারা বছর সড়ক মেরামত, নির্মাণসামগ্রী, ইটভাটার ধোঁয়া আর ধুলা এর মূল কারণ। এ ছাড়া ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ১৩ দিনে প্রাণ গেছে ১৫১ জন মানুষের। আমার খালু ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। বন্য প্রাণীর চেয়েও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এখন অনেক কম। নানাভাবে মানুষ মরছে। Life security now is in danger সম্প্রতি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের লিড নিউজ ছিল এটি।
দুবাই যেতে লাগে সাড়ে ৩ ঘণ্টা আর মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল মাত্র ৭ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে ডিজিটাল বাংলাদেশে সময় লাগে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা। কষ্ট কাকে বলে সেটা ভুক্তভোগীরই উপলব্ধি সম্ভব। বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে বাসার পথে হাঁটি। বায়ুদূষণের বহুমাত্রিক যন্ত্রণায় ইনহেলার ব্যবহার করি শ্বাসযন্ত্রটা ঠিক রাখার জন্য। অনেকের পকেটে থাকে এ বিশেষ যন্ত্রটি। বছরে তিন-চারবার একই সড়ক কেন এত খোঁড়াখুঁড়ি সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না যন্ত্রণায় আক্রান্ত নগরবাসীর। আয়-রোজগার দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা- যার নাম ফুটপাথ-বাণিজ্য। মাঝে মধ্যে হকার উচ্ছেদ লোকদেখানো- বোঝা যায় কয়েক দিন পর তাদের আবার সচল অবস্থায় দেখা যাবে। ‘বাণিজ্যের অঙ্ক’ বাড়ানোর জন্যই নাকি মাঝে মধ্যে এ অভিযান চালানো হয়। হকার উচ্ছেদ এখন বিভাগীয় শহরগুলোয়ও চলছে। বরিশালে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশের বেদম প্রহারের দৃশ্য দেখলাম। আহত অর্ধশতাধিক মানুষ। গণমাধ্যমের একজন কর্মীকেও গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জাতীয় স্বার্থে এসব করা হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে বলা হলেও এর পেছনের খবর ‘বাণিজ্য’। ঘুরেফিরে একই অবস্থায় ফিরে আসার অর্থ অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ভাষায় ‘রেন্ট সিকিং’-এ শব্দযুগলের মানে হলো ব্যক্তিগতভাবে লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রভাবিত করা।
বাংলাদেশের আবহাওয়া জলবায়ু তথা প্রকৃতির যে পরিবর্তন তা মানবসৃষ্ট। ছয় ঋতু বইপুস্তকে আছে বাস্তবে পলাতক মানুষের আচরণের কারণে। জীবন্ত প্রবাহমান খাল চোখে পড়ে না রাজধানীতে। খাল-নদী-পুকুর-জলাশয় না থাকলে ধুলোবালি বাড়বে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড যত বেশি চলতে থাকবে, তত বেশি প্রকৃতি ‘বিদ্রোহ’ করবে অর্থাৎ বিরূপ হবে। পানির স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করায় বর্ষা মওসুমে শহর বন্দর নগর ডুবিয়ে দেয়। নদী ছোট হচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে, দখল হয়ে যাচ্ছে মাটি ভরাট করে দিয়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে আমার ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে সময় অতিবাহিত হয়েছে। ষাট দশকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এত দূষণ ছিল না। মাটি, বায়ু, পানি, শব্দ, বর্জ্যদূষণ তথা সব উপাদানই দূষণে আক্রান্ত। অনেকে বলে থাকেন- মানুষ বাড়ছে তাই দূষণ বাড়ছে। পৃথিবীর সব দেশেই মানুষ বাড়ছে; কিন্তু পরিবেশ তেমন নষ্ট হয়নি। কারণ হলো সব কিছুই পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। আমরা নিয়ম ভঙ্গ করব- নিয়ম মতো চলব না- তাহলে বায়ুদূষণ শুধু নয়; সব কিছুই দূষণের পথে হাঁটবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার লিড নিউজ ছিল নকলে আর ভেজালে দিশেহারা ক্রেতা। নকল আর ভেজাল দিয়ে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা মানুষই পৃথিবীকে নরকে পরিণত করেছে। আমরা নৈতিকতার পথে হাঁটছি না, বেশি হাঁটছি অনৈতিক পথে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর সরাসরি কারণ বায়ুদূষণ। শ্বাসতন্ত্র, ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের হার বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণও দূষিত বায়ুতে নিঃশ্বাস নেয়ার অভিশাপ।
২০১৫ সালে নাসা বলেছিল, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে ঢাকার বাতাসে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে। এ সময় ৭৯ শতাংশ বিষাক্ত এ গ্যাস বাতাসে প্রবহমান ছিল। রাজধানী ঘিরে থাকা কয়েক হাজার কয়লা পোড়ানো ইটভাটার ধোঁয়া এবং যানবাহনের পোড়া ধোঁয়া ঢাকাকে দূষণের চরমপর্যায়ে নিয়ে গেছে। ঢাকার বাতাসে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ উপাদান পিএম ২ দশমিক ৫ এর মাত্রাও রয়েছে, যা ভারত ও চীনের পরের অবস্থানেই। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছে ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানভায়রনমেন্ট। দিল্লিতে বেশ ক’টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকায় ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের তালিকায় দিল্লি প্রথম অবস্থানে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। দূষণ কমাতে হলে লক্কড় ঝক্কড় মার্কা যান চলাচল কমিয়ে আধুনিক মেট্রো ও পাতাল রেলের বিকল্প নেই। আমরা এ কারণেই সুন্দরবনসংলগ্ন রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করছি। বায়ুদূষণ দিল্লি ও ঢাকার মানুষকে যেভাবে ভোগাচ্ছে একইভাবে খুলনা, বাগেরহাট, রামপালসহ দক্ষিণাঞ্চলের আট জেলার মানুষকে ভবিষ্যতে চরমভাবে ভোগাবে। ভারতের সুন্দরবন এলাকায় তারা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ পরিবেশবিধ্বংসী কোনো স্থাপনা নির্মাণের ঘোরবিরোধী। বায়ুদূষণ মানবদেহের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। এ ব্যাপারে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি- তার বড় উদাহরণ হলো ভারতের সুন্দরবন অংশে বাঘের সংখ্যা আমাদের দেশের চেয়ে চার গুণ বেশি। সুন্দরবনের বড় অংশ বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় আমরা জীববৈচিত্র্যের সংখ্যানুপাতে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে কেন? সুন্দরবন খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ভারতের অংশে আছে চার শতাধিক। অন্য দিকে বাংলাদেশে আছে ১১০টি মাত্র (সূত্র : জাতীয় বন অধিদফতরের সর্বশেষ রিপোর্ট)। ঢাকার চেহারা ৫০ বছর আগে এ রকম দূষণীয় অবস্থায় ছিল না- রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ স্থাপনা নির্মাণের পর এলাকায় যখন কয়েক শতাধিক মিল কারখানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে তখন শুধু সুন্দরবন নয়, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১০টি জেলা ঢাকার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হবে। রামপালকে কেন্দ্র করে জমি কেনা শুরু হয়ে গেছে প্রায় তিন শতাধিক শিল্প কারখানার জন্য, কাজও শুরু হয়ে গেছে। সরকারি দলের লোকজনই ভূমি ক্রয়ে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এসব খবর জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশটাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য আমরা এমন কোনো কাজ নেই যা করছি না। বিশেষ করে প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ডে বিশ্বে এখন আমরা এক নম্বরে। পরিবেশে অনিয়ম যত বেশি থাকবে, রাষ্ট্র তত বেশি পিছিয়ে যাবে।
বৃক্ষনিধন বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। পার্কে গাছ নেই- আছে ইমারত আর স্মৃতিস্তম্ভ, অডিটোরিয়াম, চায়নিজ রেস্তোরাঁ, ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও বহুতল ইমারত নির্মাণের সাইন বোর্ড। খেলার মাঠ অবলুপ্ত- গাছবিহীন পার্কগুলো ক্রন্দনরত। বাঙালিরা আজ অর্থকে এতই প্রাধান্য দিচ্ছে যে, গাছপালা, বন, নদ-নদী এগুলো বিনাশ না করলে বিত্তশালী হওয়া যায় না। স্বাস্থ্য না অর্থ- কোনটা চাই? গাছ হলো অক্সিজেন ফ্যাক্টরি; সেই বৃক্ষ কেটে আবাসন নির্মাণের রেসে অবতীর্ণ হয়েছি। বাড়ি তৈরির নিয়ম না মেনেই অনেকে ঢাকা শহরে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে, স্থাপন করছে অপরিকল্পিত শিল্প কারখানা। ঢাকা শহরে গাড়ির সংখ্যা সড়কের অনুপাতে চার গুণ বেশি। ফলে জ্বালানি বেশি পুড়ছে, ধোঁয়া-ধুলা এসব বাড়ছে। এ কারণে ঢাকার বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে, যা শরীরের জন্য চরম ক্ষতিকর। ঢাকার আশপাশের নদী সঙ্কুচিত হচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে, গাছ না লাগিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে কল কারখানা ও বাড়িঘর। ফলে নদীর পানি যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি দূষিত হচ্ছে বাতাস, নদীভাঙন এ কারণে হচ্ছে। ঢাকার নদীতে অক্সিজেন নেই বললেই চলে। এসব নদী মৎস্যশূন্য হয়ে পড়েছে এ কারণে। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কার্বন মনো-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয় রান্নার চুলায় প্রাকৃতিক গ্যাস বা কাঠ পোড়ানোর সময়। গাড়ির ধোঁয়া থেকেও এ গ্যাস উৎপন্ন হয়- যা বাতাসের সাথে মিশে মানবদেহে শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে প্রবেশ করে এতে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলেছেন। বাতাসের সাহায্যে যক্ষ্মার জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে এ রোগটি ছড়ায়। বাতাসে সালফার অক্সাইড বেড়ে গেলে এসিড-বৃষ্টি হয়। কালো ধোঁয়া উৎপাদন করে এমন যানবাহন নিষিদ্ধ করলে বায়ুদূষণ রোধ করা সম্ভব। হাঁপানি ও ডাস্ট অ্যালার্জি রোগটি বিস্তার লাভ করছে এসব মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে। ঘন ঘন রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে ধুলোবালি বাতাসে মিশে রোগ জীবাণু ছড়ায় এবং ঘরবাড়িও ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বাসগৃহে বসবাস করাও শিশু ও বয়ষ্ক মানুষের জন্য অনিরাপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ ছাড়া প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য, কোনোটিই নিরাপদ নয়। সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে আবাসন প্রকল্পকে সবুজে ঘিরে রাখতে হবে। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাসের জন্য প্রযোজন সমগ্র ঢাকা শহরে সবুজের সমারোহ।

লেখক : গ্রন্থকার ও কলামিস্ট
harunrashid@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫