ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৯ জুন ২০১৭

আলোচনা

রঙ্গভরা বঙ্গ

আশা জাগানো রঙ্গরসের ছড়াগ্রন্থ

মুজতাহিদ ফারুকী

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:০৩


প্রিন্ট

রঙ্গভরা বঙ্গ। বইটির নাম দেখেই মনে হয়েছিল শ’ দেড়েক বছর পর কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের আরেক উত্তরসূরির হয়তো দেখা মিলবে। ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘আমাদের এই বঙ্গ, কোন ক্রমে নহে ভঙ্গ/নানা রাগ-রঙ্গ রসভরা।’ ধারণা একেবারে অমূলক হয়ে দেখা দেয়নি। রফিক হাসানের ছড়ায় রঙ্গ আছে। ব্যঙ্গও আছে। রসও যে আছে তা বলা যেতেই পারে। গুপ্ত কবির মতোই রফিকের ছড়ায় ছড়িয়ে আছে সমাজের অসঙ্গতি, সামাজিক-রাজনৈতিক অসততা, দেশপ্রেমের অভাব, সাধুবেশে প্রতারণা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, কটাক্ষ এবং সমালোচনার কশাঘাত। মোটামুটি সুখপাঠ্য ২৬টি ছড়ায় তিনি তুলে ধরেছেন বর্তমান বাংলাদেশেরই সমাজ-বাস্তবতার ভিন্ন এক চিত্র।
রফিক হাসান নিজে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র জগতে কী সব উল্টোপাল্টা কাজকারবার হচ্ছে তা তিনি ভাল জানেন। সে জন্যই তিন-তিনটি ছড়ায় উঠে এসেছে সাংবাদিকতার নামে এক শ্রেণীর মানুষের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ। ‘সম্পাদক’, ‘মিডিয়াম্যান’ ও ‘পরামর্শক’ নামের তিনটি ছড়ায় তিনি তথাকথিত সম্পাদক ও গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোশ উন্মোচন করেন। লিখেছেন, “দিনের বেলায় ধর্মকর্ম রাতে ঢোকেন সাকুরা/চিনের থেকে মাল আনতে সঙ্গে থাকেন কাকুরা।”
অথবা, “দেশের কথা বলতে গিয়ে নিজের কথা ভাবেন/মেষের দলে ভিড়লে পরে অর্থ কত পাবেন।” রফিক হাসান কবি। কবিদের মধ্যে কারো কারো অতি বাগাড়ম্বর, আত্মপ্রচার ইত্যাদি তিনি দেখেছেন। তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ওই ধরনের কবিদের তীক্ষè খোঁচা দিয়েছেন। ‘মহান কবি’ শীর্ষক ছড়ায় লিখেছেন,
“নাব্য নদী সাঁতরে করেন পার/কাব্যকথার থোড়াই ধারেন ধার/যথায় তথায় ধুলাবালি ছিটান/কথায় কথায় নিজের ঢোলই পিটান।”
দেশভাবনামূলক ছড়াও আছে। রফিক দাবি করেছেন তিনি ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন। আলোচ্য বইটিতে তিনি সেই নিরীক্ষার পরিচয় রেখেছেন। কেবল অন্ত্যমিল নয়, দু’টি চরণের প্রথম দুই শব্দেও মিল তৈরি করেছেন এবং এটিকে তিনি বলছেন দ্বৈত মিলের ছড়া। বিষয়টি অভিনব বটে। কিন্তু তার ছড়ায় বেশ কিছু ছন্দপতন লক্ষ করা গেছে। যেমন দ্বৈত মিলের ক্ষেত্রে তেমনই অন্ত্যমিলের ক্ষেত্রেও। ‘প্রগলভা রমণী’র শেষ দুই চরণের প্রথম চরণের শেষ শব্দ ‘প্রগলভা’, এর সঙ্গে পরের চরণের শেষ শব্দ ‘প্রশংসা’ কী মিলল? ছন্দের কান পুরোপুরি প্রস্তুত
হওয়ার আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যাওয়া শুধু কাব্যের জন্য নয়, কবির জন্যও বিপজ্জনক। কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনে সাধুরীতির শব্দ প্রয়োগে ছন্দ বা মিল ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু ছড়ায় শব্দের ভুল প্রয়োগ কষ্টদায়ক। চানখাঁর পুলের সঙ্গে পাঙ্খার মিল দিতে গিয়ে চাংখার পুল লেখা (ঢাকা) কিংবা লঞ্চ-এর সঙ্গে মিল দেয়ার সুবিধার্থে স্পঞ্জকে ‘পঞ্চ’ লেখা (লঞ্চডুবি) কাক্সিক্ষত নয়। পঞ্চ মানে পাঁচ। এর সঙ্গে স্পঞ্জ-এর পাদুকা বা চপ্পলের কোনো সম্পর্ক নেই।
যা হোক রফিক হাসান বাংলার রঙ্গরসের ছড়ার ঐতিহ্য নতুন করে ছড়িয়ে দেয়ার আশা জাগিয়েছেন। এটি একটি বড় পাওয়া। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিন্তার অসামঞ্জস্য, শব্দের আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠে অধিকতর অলঙ্করণের দিকে মনোনিবেশ করলে রফিকের হাতে একসময় উৎকৃষ্ট ছড়ার সৃষ্টি হবে এমন আশা করা বাহুল্য হবে না। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫