ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

বিবিধ

ভাষা ও সংস্কৃতিপ্রেম

প্রাচ্য পলাশ

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৯


প্রিন্ট

দেশপ্রেমের পূর্বশর্ত মাতৃভাষা প্রেম- মাতৃভাষাবাহিত সংস্কৃতিপ্রেম। বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত ও আত্মত্যাগ করে বাঙালি তার দেশপ্রেমে দৃঢ় সত্তার পরিচয় দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই আত্মত্যাগের মহিমায় বাঙালি বিশ্ববিবেকের কাছে শ্রদ্ধেয় ও পূজনীয়। আর তাই বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির এই মাহাত্ম্যকে চির অম্লান করতে ব্যক্তিপর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয়পর্যায় পর্যন্ত আমাদের করণীয়গুলো নিরূপণ ও তার বাস্তবায়নে সময়োচিত পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত ও সফল সমাপ্তির পর বাঙালিকে মগ্ন হতে হয়েছিল মুক্তির আন্দোলনে। পরিণতিতে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ বিশ্বমানচিত্রে স্থান লাভ করে। ইতঃপূর্বে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ও ২০০৭ সালে জাতিসঙ্ঘ আমাদের অমর একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। চলছে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ। বায়ান্নর পরে ৬৫ বছর ও একাত্তরের পর ৪৬ বছর অতিক্রম করেছি আমরা। দীর্ঘ পঁয়ষট্টি বছরে জহির রায়হান নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মিত ‘বাঙলা’ শীর্ষক দু’টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, অল্প কিছু গান-কবিতা-সাহিত্য-ইতিহাস ইত্যাদির মধ্যে অতি ক্ষুদ্রকায় উপস্থিতি বাঙালির মাতৃভাষা সংগ্রামের। এ নিয়ে যৎসামান্য হাহাকার বুদ্ধিজীবী-কলামিস্ট-সাংবাদিকদের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ। বাঙালির মাতৃভাষা সংগ্রামের গৌরবগাথা নিয়ে রাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কোনো উদ্যোগ নেই। অর্থাৎ যেটুকু না করলেই নয়, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিপ্রেমে চলমান দীনতায় বাঙালি ক্রমেই বিপথে (বুঝে বা না বুঝে) ধাবিত হচ্ছে, যার পরিণামে বাঙালি জাতি বিশ্বব্যাপী নিশ্চিতভাবে কলঙ্কিত হবে। কিন্তু আমরা ঘৃণ্য জাতিতে পরিণত হতে চাই না। সংস্কৃতিতে দৈন্য নয়- সমৃদ্ধ বাঙালি জাতি বিশ্বদরবারে চির অটুট থাকতে চায় ‘চির উন্নত মম শির’ হয়ে। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় নির্ধারণে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ও কর্মকাণ্ড বিবেচনার দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার গুরুত্ব দিনদিন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে নয়, মেলার বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ আয়োজন, প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ও মান, দেশী-বিদেশী দর্শনার্থী, বইয়ের কাটতি ইত্যাদির গুণবিচারে বাংলা একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা বর্তমানে এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বইমেলা। কিন্তু একুশে বইমেলাকে পুঁজি করে কিছু মুনাফালোভী প্রকাশক ও প্রকাশনী সংস্থা তড়িঘড়ি করে সরকারের গুণগ্রাহিতায় নি¤œমানের বই প্রকাশ করছে। বইমেলায় এগুলো খুব একটা বিক্রি হয় না, প্রকাশের উদ্দেশ্যও এগুলো বইমেলায় বিক্রি করা নয়। এগুলো প্রকাশ হয় শুধু সরকারি তালিকাভুক্ত হয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বিক্রির উদ্দেশ্যে। সরকারি অর্থে মানহীন এসব বই ক্রয় কি একুশের চেতনা সমর্থন করে?
আশির দশকে সরকারি অফিসসহ সর্বত্র মাতৃভাষার প্রচলনে প্রণীত আইনে রাষ্ট্রের সব কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু আইনটি কার্যত কাগুজে বিধানে পরিণত হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপি-আমলাদের কেউ মানছেন না এ আইন। প্রসঙ্গটি কখনো মাথাচাড়া দিলেই আইনটি না জানার অভিনয় শুরু করেন। সম্প্রতি একটি সেমিনারে এমন নজির পাওয়া গেছে। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও বিদেশী দাতা সংস্থার প্রতিনিধি। অনুষ্ঠান শুরু হলো ইংরেজি স্পিচ দিয়ে। কিন্তু বিদেশী দাতা সংস্থার প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে বাংলায় বক্তৃতা দেয়া শুরু করলেন। সবশেষে মন্ত্রী তার বক্তৃতা দেয়ার সময় বললেন, প্রকল্পের কাগজপত্র, সাইনবোর্ডগুলো ইংরেজিতে করার কোনো যৌক্তিকতা আমি দেখি না; ভবিষ্যতে এগুলো অবশ্যই বাংলায় করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ যেকোনো প্রকল্প গৃহীত হওয়ার আগে তা নিয়ে একাধিক সভা ও ফাইল তৈরি হয়, যার মূল নথিতে মন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকে।
এবারও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হয়। কলকাতার নন্দন মিলনায়তনে ২১-২৪ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসব’ যৌথভাবে আয়োজন করে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব ইন্ডিয়া ও নন্দন। বাংলাদেশের নয়জন নির্মাতার ১০টি চলচ্চিত্র স্থান পায় এ উৎসবে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের মাতৃভাষার সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও ‘বাঙলা’ চলচ্চিত্র দু’টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এ উৎসবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চলচ্চিত্র উৎসবে মাতৃভাষা সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র না রাখার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে কী ফোকাস করছি? আয়োজনকারী সংস্থা দু’টি ভারতীয় কিন্তু উৎসবে স্থান পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোর নয়জন নির্মাতাই বাংলাদেশী ও তাদের মাতৃভাষা বাংলা। তবে নির্মাতারা কেন ভাষাসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র দু’টি উৎসবে অন্তর্ভুক্ত করতে ভূমিকা রাখলেন না? নির্মাতাদের কি মাতৃভাষাসেবী হতে বারণ?
বিশ্বের বহু ভাষার শব্দ ধারণকারী সমৃদ্ধ ভাষা বাংলা। বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। সমৃদ্ধি ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা- এই দুই দিক দিয়ে বিশ্বের সেরা ভাষার তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে আছে বাংলা ভাষা। মাতৃভাষা বাংলার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে বাংলা একাডেমি ও মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কাজ করলেও শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার, শব্দপ্রয়োগ ও বানানে অদক্ষতা ও উদাসীনতা বিরাজমান। বাংলা ভাষার অত্যন্ত সহজ বানানরীতি থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিপর্যায়ে তো বটেই, গণমাধ্যমও তা অনুসরণ করছে না। দেশের শীর্ষপর্যায়ের গণমাধ্যমগুলো সরকারি বানানরীতির পরিবর্তে নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করছে। একেক স্থানে একেক রকম বানান দেখে বানানরীতির প্রতি কোনো আগ্রহ ও সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে না। এর সাথে যুক্ত রয়েছে বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করার ব্যাপারে বুদ্ধিজীবী মহলে অভিন্ন মত সুদৃঢ় হলেও এর প্রতিরোধপ্রক্রিয়া নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। মতপার্থক্য যতই প্রকট হোক না কেন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে বাংলা চলচ্চিত্রের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিশ্বব্যাপী ৩০ কোটি বাঙালির কাছে তা পৌঁছে দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, গদ্য-পদ্য, গান, নৃত্য বা টিভি অনুষ্ঠান বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে সহায়ক মাত্র; মুখ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম কেবলই বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনাসমৃদ্ধ আধুনিক রুচিশীল উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন বাংলা চলচ্চিত্র।
বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাবোধ ধ্বংস করতে বিস্তর আগ্রাসন অব্যাহত। অমর একুশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনদিন জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এ আগ্রাসনে নতুন মাত্রা যোগ করছে। পশ্চিমের দেশগুলোর গবেষকেরা হয়তো বিপরীতগামী না-ও হতে পারেন। তবে বাঙালির ভাষাসংগ্রাম নিয়ে হলিউড, বলিউড চলচ্চিত্র নির্মাণে তাগিদ সৃষ্টি করবে এবং একপর্যায়ে নিজেদের মতো করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিশ্বব্যাপী মুক্তি দেবে। হলিউড নির্মিত চলচ্চিত্রে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক মর্মগাথা বিকৃত-মূল্যবোধহীন ও অপমানজনকভাবে উপস্থাপিত হবে। আমাদের ভাবতে হবে- বাংলাদেশ হলিউড ও বলিউড থেকে নির্মিত এমন চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কি গড়ে তুলতে পারবে? বাংলাদেশ কি শক্তি-সামর্থ্যে আমেরিকা বা ভারতের সমতুল্য? না, বাংলাদেশ শক্তি প্রদর্শনমূলক প্রতিরোধের পথে সফল হতে পারবে না। তবে আমাদের আবারো বিজয় অর্জনের বিকল্প পথ খোলা রয়েছে।
অমর একুশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতির এক দশক অতিক্রম করেছি আমরা। তাই আর বিলম্ব না করে বাঙালির মাতৃভাষা আন্দোলন, বিশ্বের সব মাতৃভাষার মূল্যবোধ ও এসব ভাষাবাহিত সংস্কৃতিগত চেতনা সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে- এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে প্রকল্প গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। শুধু নির্মাণ করে বসে থাকলে চলবে না, এটিকে বিশ্ববাসীর নাগালের মধ্যে পৌঁছে দিতে বিশ্বের সব জাতির সব দেশের রাষ্ট্রভাষা তথা মাতৃভাষায় পৃথক পৃথক সংস্করণ তৈরি করা এবং প্রত্যেক দেশে সরকারিভাবে জনসাধারণের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা দরকার। এসব কাজ এশিয়াটিক সোসাইটি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বা এমন কোনো সংস্থার হাতে ছেড়ে দিলে হবে না। বরং এর যাবতীয় আয়োজন সরকারি উদ্যোগেই করতে হবে।
বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন প্রতিহত করতে বাংলা চলচ্চিত্রকে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে আধুনিক রুচিশীল উচ্চমানে উন্নীত করতে হবে। বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে ভাস্বর বাংলা চলচ্চিত্র হবে বিশ্বের তাবৎ বাঙালির ঐক্যের ছত্র।
এত দিনেও এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ দু’টির উদ্যোগ কেন গৃহীত হয়নি- তা নিয়ে সময় ক্ষেপণ না করে দরকার এগুলো বাস্তবায়নে মনোনিবেশ ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। সরকারি অফিসে-উচ্চশিক্ষায়-অনলাইনে-সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার স্বার্থক ব্যবহার, প্রভাতফেরি, বইমেলা আয়োজন বা একুশে পদক প্রদান করে বহুমাত্রিক ও কঠিনতর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলা করা সহজ হবে না। আমরা পরাজিত হতে চাই না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫