ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ মার্চ ২০১৭

গল্প

হিদু মামা ও কানযুক্ত গাল থাপ্পড়

রুহুল আমিন বাচ্চু

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:১৬


প্রিন্ট

‘কালকে গেলে দেখতে পাবে দুধের কৌটা’। একটা কড়কড়ে বিশুদ্ধ ভাষার ঢাকাইয়া অঙ্গভঙ্গিযুক্ত আমন্ত্রণ। বিষয়টা আমার মতো গেরাম্যা ছেলেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করলো।
নানাবাড়ির কাছেই উত্তরজয়পুর স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র আমি। খালাতো ভাই খোকন একই ক্লাসে ঢাকার পিলখানা স্কুলে পড়ে। ওদের স্কুল বিল্ডিং, ক্লাস রুমে সিলিং ফ্যান, দেয়াল ঘেরা বিরাট মাঠ ইত্যাদির বর্ণনা অবাক করে আমাকে।
সত্তর দশকের প্রথম দিকের কথা। আমাদের স্কুলে উদোম মাঠে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। কয়েকটা গরু চরছে মাঠে। গরুর লেদা পড়ে আছে এখানে সেখানে। ক্লাসরুমের উপরে মরচে ধরা টিন, নিচে পাটখড়ির বেড়া। বাঁশের খুঁটিগুলিও নড়বড়ে। ক্লাসরুমের দক্ষিণে দরজা, উত্তরে পুরনো বেড়ার নি¤œাংশে বড় বড় বিসর্গ হয়ে আছে। সে বিসর্গ দিয়ে দেখা যায় আদু ভাই খ্যাত কাশেমের শণক্ষেত। কাশেমের চায়ের দোকানের একাংশও দেখা যায় সে ফাঁক দিয়ে।
খোকন এদিক সেদিক তাকিয়ে বলে তোমাদের স্কুলে গেট নেই, মছুয়া দারোয়ানও নেই। আর আমাদের স্কুলের গেটে রয়েছে এক বিরাট মছুয়া দারোয়ান। নাম আকবর খান। লাল লাল দুটো চোখ তার। খাকি পোশাক আর বুট জুতা পরে লাঠি হাতে সারাক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। স্কুল ড্রেস ছাড়া কোন ছেলেপিলে গেট দিয়ে ঢুকবেতো কড়া ধমক। স্যাররা যখন গেট দিয়ে ঢোকে তখন তার বুট জুতার দড়াম মার্কা স্যালুট দেখতে বুড়োরাও গেটে ভিড় করে। আর ভিড় কমাবার জন্য ‘হঠ যাও’ বলতেই লোকজন ভয়ে সরে পড়ে।
খোকনকে নিয়ে আমার ক্লাসরুমে ঢুকতেই দেখি দুটো ছাগল ছানা বেঞ্চে লাফালাফি করছে। হাতের বই দিয়ে টেবিলে আঘাত করতেই ওগুলো বিসর্গ দিয়ে ছুটে পালাল। ছাগলের বড়িগুলো দেখে খোকন নাক চিপি দিয়ে সরে দাঁড়ায়। আমি বেঞ্চ ঝেড়ে বল্লাম, এবার বসো। ও বেরিয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে বল্লো ভাই, বাহিরেই ভাল। তখনো ক্লাসে কোন ছাত্র আসেনি। ক্লাস শুরু হবে বেলা এগারটায়। স্কুলে বা আশপাশে কারো হাতে ঘড়ি না থাকলেও বেলা দেখে আন্দাজে ধরে নেই ক্লাস শুরু হতে আরো আধা ঘণ্টা দেরি। আজ স্কুলে আগে আসার উদ্দেশ্য খালাতো ভাইকে নিজেদের স্কুল দেখানো। আপন খালাতো ভাই হলেও তার সাথে জীবনে এ প্রথম দেখা। খালাম্মাসহ ওরা দেশে বেড়াতে এসেছে বহু বছর পর। ওদের স্কুলের ছাত্রদের বিনিপয়সায় টিনের কৌটা ভর্তি দুধ দেয়, পায়েস করে খাবার জন্য ভাঙা গমও দেয়।
বল্লাম, তোমরাতো গরিব না, তোমাদের বিনিপয়সায় ওসব দেয় কেন? খোকন বল্লো, ও মা তুমি জান না, শহুরে ছাত্রদের স্বাস্থ্য ভাল রাখার দায়িত্ব নিয়েছে বিদেশীরা। নিজের হাতের মাসল দেখিয়ে বলে, আমার গায়ের রংটা কিন্তু খুব পরিষ্কার না। এই দুধ আর গমের পায়েস খেয়ে রংটা সাদা হয়ে আসছে। দেখবে বড় হলে একদম বিদেশী হয়ে যাব। ও বোঝালো, বিদেশীরা বেশি বেশি দুধ-গম খায় বলে ওদের রং ফর্সা। আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে, দেখ না চাল আর আর গমের রং কি এক?
খোকন প্রশ্ন করলো, তোমার সাবজেক্ট কি কি ? প্রশ্নটায় একটা ধাক্কা খেলাম। ‘সাবজেক্ট’ শব্দটার সাথে তখনো পরিচিতি ঘটেনি। ইংরেজি স্যার তো শুধু পড়ায় এন এ-না, এস আই-সি, এম এ-মা অর্থাৎ নাসিমা। বড়জোর নাসিমা ইজ স্লিপিং। খালাতো ভাইর কাছে হার মানা যবে না। উপায় খুঁজলাম কি জবাব দেই।
তখনই দেখলাম বিনোদপুরের অঙ্ক স্যার মাঠ পেরিয়ে আসছেন। স্যারের বাম বগলে ছাতার সাথে নতুন একটা বেত দেখা যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। স্কুলের মাঠে ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে যায়। আমিও খোকনকে ইশারা করে ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ি।
বল্লাম, অঙ্ক স্যার খুব বেতায়। খোকন প্রশ্ন করলো, কোথায় বেতায়? বল্লাম পাছাতেই বেশি, তবে মাঝে মধ্যে পিঠেও। স্যারের বেতানি খায়নি এমন ছাত্র স্কুলে একজনও নেই। খালাতো ভাই বুদ্ধি দিল লুঙ্গি না পরে মোটা হাফ প্যান্ট পরতে, তা হলে বেতানিটা কম লাগবে। বল্লাম, আমাদের গ্রামের স্কুলে কেউ প্যান্ট পরে না।
স্যারের বগলে নতুন বেত দেখে নিজেই স্তিমিত হয়ে গেছি। আজ থার্ড পিরিয়ডে অঙ্ক। খালাতো ভাইটির সামনে আজ প্যাঁদানি খেলে ইজ্জত থাকবে না। মনে মনে অঙ্ক কষলাম ওকে নিয়ে সেকেন্ড পিরিয়ড শেষে পালাবো! ধোলাই না হয় কালই খাব, তবুতো ইজ্জত বাঁচবে।
আমাকে ভাবতে দেখে ও এগিয়ে এলো। বল্লো, ভেবো না আমি যাবার আগে তোমাকে মোটা কাপড়ের একটা প্যান্ট দিয়ে যাব। জান, আমাদের ইংরেজি স্যারও মাঝে মধ্যে প্যাঁদায়। আমিতো আন্ডারওয়্যার পরে ভেতরে প্যাড লাগাই। তাতে হিটটা একটু হলেও কম লাগে।
ওর ইংরেজি শব্দগুলোর মানে না বুঝলেও প্রয়োগটা ধারণা করে নেই। তবে ও নিজেও যে প্যাঁদানি খায় শুনে আরাম পেলাম। খোকন আবার বল্লো, একবার পাছায় দশ নম্বরি খাতা বেঁধেছিলাম, স্যারতো দিল প্যাদানি। খট্ খট্ শব্দ হতেই স্যার বুঝতে পারে। এরপরের কথা বলার না। পাকা তিন দিন জ্বরে ভুগলাম সে ধোলাই খেয়ে। জানতো দুধ-গম বেশি খাই বলে আমার শরীরটা একদম নরম তুলতুলে। ধরেই দেখ না, বলে ওর হাতের বাহু আমাকে দিয়ে টিপিয়ে ছাড়ল। এবার দরদি কণ্ঠে উপদেশ দিল, সব সময় পড়া শিখে যেয়ো, তা হলে রিস্ক থাকবে না।
ওর ‘রিস্ক’ শব্দটায় আবার ধাক্কা খেলাম। গ্রাম্য স্কুলে পড়ে এবং নিজের অজ্ঞতায় হীনতার ছায়া আমার মনটাকে সঙ্কুচিত করে দিল। শুরু থেকেই ওর মোড়লীপনায় ওকে শায়েস্তা করার একটা ভাব মনে পয়দা করে আসছি, কিন্তু কিছুতেই বাগে পাচ্ছি না। বারবার মনে হচ্ছে ওর সচেতনতার কাছে নিজেই হেরে যাচ্ছি। আগামীকাল ওদের বাড়ি গেলে দুধের কৌটা দেখাবে, পায়েস করে খাওয়াবে, এসব বলতে বলতে আমার জিহ্বার লোল ঝরিয়ে ছাড়লো। বিকেলে মামাদের বাড়ির সামনে বারিপুকুর পাড়ে ওকে প্রস্তাব দেই কুস্তি খেলার। প্রথমে রাজি হলেও আমার অঙ্গভঙ্গি দেখে সে পিছুটান দেয়। বলে না ভাই, ওসব কাদাকাদির খেলা। ঢাকায় ওসব খেলে না আমরা হকি, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন একটু থেমে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে জান, আমি টেবিল টেনিস খেলি। এবার একটা আত্মগৌরবের ভঙ্গিমা নিয়ে বলে তোমাকে তো বলাই হয়নি এইবার আমি রানার আপ হয়েছি।
ইংরেজি শব্দটা কাঁটার মতো যেন গলায় বিঁধল। মনের মধ্যে গোস্বা পয়দা করলাম। আমাদের কুস্তি খেলাকে ও কাদাকাদির খেলা বল্লো! কি করে তাকে মজা দেখাই ভাবতে লাগলাম। বৈশাখের শেষ। বারিপুকুরের উত্তরপাড়ে মামাদের বড় আমগাছটা ওকে দেখাতে নিয়ে গেলাম। গাছের থোকা থোকা আম দেখে ওর চক্ষুস্থির। বল্লো, এত আম কে খায়?
বল্লাম, আজ আমরা খাব। চল গাছে চড়ি। ও তিন হাত পিছিয়ে গিয়ে বলে, না বাবা আমি গাছে চড়তে পারি না। ওসব আমার কাজ না। আমি দুটি ডাল বেয়ে উঠে তার মাথার উপর অবস্থান করি। বল্লাম, গাছে ওঠার মধ্যে একটা অন্য রকম ভাব আছে। তা ছাড়া কাউকে বলতেও পারবে গাছে চড়তে পারি। একটা বিজয় বিজয় অনুভূতি। আমন্ত্রণ এবার কাজে লাগলো। ওকে টেনে তুল্লাম উপরে। ও গাছের নিচে তাকিয়ে কাঁপতে থাকে। বল্লাম, ডাল ধরে দাঁড়াও। ও কিছুতেই আমার হাত ছাড়বে না। মাথায় দুষ্টবুদ্ধি এসে যোগ দিল। ওর কাঁপাকাঁপি দেহটা নামাতে গিয়ে হাত ছেড়ে দিলাম। ও পড়লো একদম কাদা-পানিতে।
ওর ভ্যা ভ্যা কান্না শুনে আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। তখুনি পাশের রাস্তা দিয়ে ফিরছিলেন হিদু মামা। আমাদের দু বছরের বড়। মামা খোকাদের বাড়ি থেকেই ফিরছিলেন। হাতের মুষ্টিতে বোনের দেয়া চকোলেট, মুখের দেয়ালে দুধালো স্নোর প্রলেপ আর কাঁধে তিব্বত পাউডার দৃশ্যমান। মেজবোনের ছেলের কর্দমাক্ত চেহারা দেখে মামা তেড়ে এলেন। মামাকে আসতে দেখে খোকনও উচ্চৈঃস্বরে ভেউ ভেউ জুড়ে দিল।
মামা দাঁত কিড়মিড় করে এগুচ্ছেন। দেখলাম মামার দাঁতের মাড়িতে তখানো সেঁটে আছে খোকনের কৌটার দুধ। খোকনের অভিযোগ পুরোটা শোনার আগেই মামা ঠাস করে একটা কানযুক্ত গাল থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন আমাকে। পুরো তের ঘণ্টা আমি ডান কানে কিছুই শুনিনি। খোকনের খিক খিক হাসি আমার জ্বালা আরো বাড়িয়ে দিল। মামা তার আদুরে ভাগ্নেকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। আমি দুঃখে অভিমানে দিনের বাকি অংশ কাটালাম বারিপুকুরের কালো জল দেখে।
রাতে কাউকে কিছু না বলে ভাবতে থাকি কি করে প্রতিশোধ নেই। যথারীতি হ্যারিকেনের চিমনি মেজে তেল ভরে পড়ার টেবিলে বসলাম। কানের ব্যথায় মাথা কাত হয়ে পড়ছে বারবার। ছাপানো অক্ষরগুলো যেন দুর্ভেদ্য প্রতীক। অন্য দিকে ভাবছি দুদিন পরতো খোকনরা চলে যাবে, এরি মধ্যেই প্রতিশোধ নিতে হবে।
ভাবছি আর বুদ্ধি আঁটছি। শাস্তি ওকে ঠিকই দেব তার খক খক হাসির জন্য, কিন্তু ঘটনার নেপথ্যে আমাকে থাকতে হবে। ধরা পড়া যাবে না কিছুতেই। তার হাসিটা আমাকে পীড়া দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। হিদু মামার ওপরও আমার অনেক দিনের রাগ। অনেক বার থাপ্পড় খেয়েছি তার চওড়া হাতের। কিন্তু করবো কি? মামা বলেই তো কথা। মামারাতো ভাগ্নের ওপর খবরদারি করতেই পারে। মাঝে মধ্যে নানীও মামাকে বকতেন, বলতেন ভাগ্নের গায়ে হাত তুল্লে বউ পালকি ভেঙে পড়ে যায়।
রাতের খাবার শেষে খোকনরা তাদের বাড়ি চলে যায়। নানাবাড়ি থেকে ওদের বাড়ির দূরত্ব আধ মাইলও হবে না। মিজি বাড়ি আর লদের বাড়ি মাঝখানে ধোপাবাড়ি।
ওরা সকালে আবার এ বাড়ি আসবে। পরদিন বিকেলে ঢাকায় চলে যাবে। আমার ভাবনার কোন কূলকিনারা পেলাম না। ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালেই খালাম্মাসহ খোকন আসে। খোকনের সাথে খুব ভাল ব্যবহার করলাম। ওর কাঁধে হাত রেখে কাচারির আশপাশে ঘুরলাম। ওরা চলে যাবে শুনে খুব দুঃখিত হলাম। আমার মনের দুরভিসন্ধি যাতে টের না পায় সে জন্য ঠোঁট-নাক ফুলিয়ে ওদের বিদায়ী কান্না কাঁদলাম।
হিদু মামা লুঙ্গি কাঁধে পুকুর পাড়ের দিকে যেতেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৈরি হলাম। খোকনের নিচের ঠোঁটটি ছিল মোটা এবং নিচের পাটি দাঁত প্রায় ঢাকনাবিহীন থাকতো। ওর ঠোঁটের, দাঁতের, নাকের সৌন্দর্যের প্রশংসা করলাম। সে তার হাফপ্যান্টের পকেট থেকে একটা চকোলেট আমাকে দিয়ে কি মনে করে আমার গলা জড়িয়ে কয়েক কদম হেঁটে দুঃখিত হয়ে জানালো কাল চলে যেতে খুব কষ্ট হবে। আবার পকেটে হাত দিয়ে শেষ চকোলেটা দিয়ে বল্লো, কালকে খেয়ো। সকাল বেলাটা ওর সাথে ভালই জমে উঠলো। তখনকার দিনে দেয়াল বা হাতঘড়ি মামাবাড়িতে কারোই ছিল না। শুধু মাস্টার নানার ছিল একটা পকেটঘড়ি। তিনি ছিলেন উত্তরজয়পুর স্কুলে ফোর্থ টিচার। সূর্যের অবস্থান ধরে খোকনকে বল্লাম, চল, বারিপুকুরে সাঁতার কাটবো। আবার স্কুলেও যেতে হবে। কাজেই দেরি করা যাবে না। সাঁতার না জানলেও সে তাতে সায় দিল। তার আগে সেজো মামা তাকে সাঁতার শিখাবেন বলে পুকুর ঘাটে যেতে বলেছেন। মামাদের ঘরের উত্তর পার্শ্বে শামসুদের ঘরের ভিটির সাথে একটা বিরাট জামরুল গাছ। গাছের ডাল দু ঘরের চাল ঢেকে আছে। গাছের দু কাণ্ডের মাঝখানে একটা ফোকরে দীর্ঘ দিন থেকে মৌমাছির চাক। সাধারণের চলাচলেও ওরা বাধা না পেলে কখনো কাউকে আক্রমণ করেনি।
খোকনকে আসতে বলে মামাদের উঠানোর পর্দার বেড়া থেকে একটা পাটশোলা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলাম। খোকন একটা গামছা মাথায় বেঁধে সিনেমার উর্দু গানের সুর তুলতে তুলতে এগিয়ে আসছে। সে বেড়ার আড়ালে থাকতেই আমি পাটশোলা দিয়ে মৌচাকে দিলাম গুঁতো। তারপর ছুটে গিয়ে পুকুরে দেই লাফ। খোঁচা খেয়ে চাক থেকে বেরিয়ে এলো শত শত মৌমাছি। বিক্ষুব্ধ মৌমাছি তাকেই ঘিরে ফেল্ল। ছুটতে গিয়ে খোকন কাছারির বেড়াতে বাড়ি খেয়ে পুকুরে না পড়লে বোধ হয় বড় বিপদ হতে পারতো। হিদু মামা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন বাড়িতে। আমিতো আনন্দে সাঁতার কাটছি বারিপুকুরে। মাঝে মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করছি হুসেন আর শামসুর সাথে। ঘণ্টা খানেক এরি মধ্যে গত হয়ে যায়। রহস্য সময় অধ্যায়ের কাক্সিক্ষত দৃশ্য স্বচোখে দেখার জন্য বাড়ি ফিরলাম। মনের মধ্যে ভয় সেঁটে আছে। বুক ঢিব ঢিব করছে। একটু দূরত্বে থেকে বাড়ির অবস্থা আঁচ করার চেষ্টা করছি। ধারণা হলো এরি মধ্যে অনেক দৃশ্যের যবনিকা পড়েছে। ঘরের লোকজন সব বড় ঘরের সামনে। নানীর কথা কানে এলো, কতবার বলেছি মৌচাকটা ভেঙে দে, কেউ শোনে না।
একটু স্বস্তি এলো মনের মধ্যে। কাঁধের লুঙ্গি ঝেড়ে উঠানের বাঁশে মেলে দিতে দিতে খোকনের দিকে তাকালাম। বেচারার চোখ মুখ ফুলে আছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গোটা গোটা হয়ে আছে। খালাম্মা চোখের পানি ফেলছেন আর মৌমাছির হুল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। নানী আর সেজো মামা ওর গায়ে পড়া তেল মাখছেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। খোকনের কান্না শেষে এখন হেচকি আসছে। তার নিচের ঠোঁট ফুলে এমন মোটা হয়েছে যে ওর নিচের পাটি দাঁত একদম ঢাকনাবিহীন। হাসিটা গোপন রাখতে পারলাম না। হিদু মামা তখন থেকে যে আমাকে তাক করে আছেন বুঝতে পারিনি। মামা দৌড়ে এলেন এবং ঘটনাস্থলে নিয়ে পাটশোলাটা দেখিয়ে বল্লেন, ‘তোর কাজ’। আবার কানযুক্ত গাল থাপ্পড়। কোন মতে হজম করে নিলাম, দেখলাম কোন দর্শক আছে কি না! ঘটনার পর থেকে ক’দিন মামার সাথে কথা বলিনি, ডাকলেও জবাব দেইনি। খোকনরা চলে গেল।
হাইস্কুলের ছাত্র হিসেবে হিদু মামার অহঙ্কারটা আগেই ছিল। প্রাইমারিতে পড়–য়াদের নিকট বড় ভাইর আচরণ। সহপাঠীরাই আসল বন্ধু। প্রাইমারি পড়–য়াদের প্রতি আদেশ-নির্দেশের ভাব। পথ চলায় এক কদম আগে থাকেন।
এলো রমজান মাস। স্কুল বন্ধ। মাওলানা নানার পুত্রের নতুন দায়িত্ব বাড়লো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দিতে হবে। কাছারির হুজুরের কাছে জবাবদিহিতা বেড়ে গেছে। এক ঘরের পাতিলের শব্দ শুনে অন্য ঘরে সেহরি খাওয়া। মাঝে মধ্যে হাফেজ নানার ভোররাতের আহ্বান ‘সেহরির সময় হয়েছে, উঠে যান।’ দু একবারতো এমন হয়েছে যে সেহরি খাবার আগেই ভোর হয়ে যায় যায়।
সত্তর দশকে রেডিওতে আজান প্রচার হতো না। নানাবাড়ির আট-দশ ঘরের মধ্যে কারো কাছে ঘড়িও ছিল না। মাস্টার নানার পকেটঘড়িটা কারো কাজে আসতো না। তিনি চলতেন নীরবে নিভৃতে, যার জন্য বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ ছিল না তেমন।
রোজার শেষ প্রায়। কেউ ক্লান্তিতে ধুঁকছেন। কেউ কেউ পুণ্যের মহাসময় পার হওয়ার জন্য কাতর। এরি মধ্যে এক বিকেলে ঝড়বৃষ্টিতে ঝেঁপে থাকলো সারা আকাশ। সন্ধ্যার আকাশে ঘন কালো মেঘ। অন্ধকারে ছেয়ে গেছে ছায়াময় গ্রাম। হুসেনের সাথে দেখা হলো হিদু মামার বারিপুকুরের ঘাটে। হুসেন তাড়া দিল, হিদু এখনো আজান দিস নাই?
হিদু মামা তড়াক করে উঠলেন। দৌড়ে এসে কাছারির সামনে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ দিলেন। বাড়ির সবাই আজান শুনে ইফতার সেরে নিল। কারি সাহেব মাগরিবের নামাজ পড়ালেন জামাতের সাথে। নামাজ শেষে কাছারি হতে বের হতেই দেখা গেল পশ্চিমাকাশে মেঘের ফাঁকে সূর্য উঁকি মেরেছে। হাফেজ নানা ক্ষেপে গেলেন। এক আজানের কারণে বরবাদ হয়ে গেল সবার ফরজ রোজা। এ নাফরমানের বিচার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন।
বড়মামা ছিলেন ঘরে। আগের দিন তিনি করাচি থেকে এসেছেন ঈদের ছুটিতে। সব দোষ পড়লো হিদু মামার ওপর। বড় মামা তেড়ে গিয়ে হিদু মামাকে প্রচণ্ডভাবে একটা কানযুক্ত গাল থাপ্পড় মারলেন। মামা কাছারির বেড়ার সাথে ঠোক্কর খেয়ে পড়লো নিচে। নানী দৌড়ে এসে হিদু মামাকে কোলে তুলে নিলেন। সারা বাড়িতে কান্নাকাটি। রাত এগারোটায় মামার হুঁশ ফিরে আসে। আল্লাহর শোকর করে নানী বল্লেন, কাল আর তোকে আজান দিতে হবে না বাবা।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫