ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

অসিয়তের জায়েজ পন্থা

মাওলানা মুহাম্মদ ওয়াছেক বিল্লাহ

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩২


প্রিন্ট

অসিয়ত শব্দের অর্থ হলো- একে অন্যের সাথে মিশ্রণ করা, কল্যাণ কামনা করা। আর শরিয়তের পারিভাষিক অর্থ- মৃত্যুর পরের জন্য নিজের মালিকানা কিছু অংশ বিনিময় ব্যতিরেকে কাউকে দিয়ে দেয়া। (মেশকাত) শাব্দিক অর্থে যেকোনো কাজ করার নির্দেশ প্রদানকে অসিয়ত বলা হয়। পারিভাষায় ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যুর পরে সম্পাদন করার জন্য মৃত্যুকালে যে নির্দেশ দেয়া হয় তাকেই অসিয়ত বলা হয়। (তা: মা: কুরআন)
ইসলামের প্রাথমিক যুগে যতদিন পর্যন্ত ওয়ারিশের অংশ কুরআনের আয়াত দ্বারা নির্ধারিত হয়নি, ততদিন পর্যন্ত মৃত্যুপথযাত্রী তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের জন্য অসিয়ত করে যেতেন। অবশিষ্ট সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। মিরাছের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর যেসব ওয়ারিশের নাম সম্পদ নির্ধারিত হয়েছে, তাদের নামে অসিয়ত করা বাতিল হয়ে গিয়েছে। নির্ধারিত ব্যক্তিবর্গ অসিয়তকৃত সম্পদ ফেরত দিলো। যেমন সুদের কঠোর বিধান অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে আব্বাস বিন আবদুল মোতালেব সর্বপ্রথম অমুসলিমদের কাছে বিরাট অঙ্কের পাওনা ছিল তা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের আদেশমতো চলে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে স্রোতসিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এগুলো বিরাট সাফল্য যে কেউ আল্লাহর ও রাসূলের অবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (সূরা নিসা ১৩, ১৪)
কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করলে তা কার্যকর হবে না। যদি কেউ পুত্র, কন্যা, স্বামী অথবা স্ত্রীর জন্য কিংবা এমন কোনো ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করে, যে ত্যাজ্য সম্পত্তি অংশীদার তবে এ অসিয়তের কোনো মূল্য নেই। ওয়ারিশেরা শুধু ওয়ারিশি স্বত্বের অংশ পাবে। এর অতিরিক্ত তারা কোনো কিছুর অধিকারী নয়, রাসূল সা: বিদায় হজের ভাষণে বলেন : আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারকে তার হক দান করেছেন।
অতএব কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত চলবে না। ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারের হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং এখন থেকে কোনো ওয়ারিশের পক্ষে অসিয়ত করা জায়েজ নয়।’ (তিরমিজি) কোনো ওয়ারিশের জন্য যে পর্যন্ত অসিয়ত জায়েজ হবে না। যে পর্যন্ত অন্য ওয়ারিশগণ অনুমতি না দেয়, (জেসসাস) হজরত আবু উমামা রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন আমি রাসূল সা:-কে বিদায় হজের ভাষণে বলতে শুনেছি, আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকেই তার হক দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো ওয়ারিসের জন্যই কোনো অসিয়ত নেই। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা) হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি (অধিক পরিমাণ) অসিয়ত দ্বারা তার ওয়ারিসদের মিরাছের অংশ কমিয়ে ফেলেছে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা তার বেহেশতের মিরাছের অংশ কমিয়ে দেবেন। (ইবনে মাজা)। হজরত আবু ওমামা রা: থেকে বর্ণিত আমি আল্লাহর রাসূল সা:-কে এরূপ বলতে শুনেছি। নিশ্চয় আল্লাহ সব হকদারের জন্য তার হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কাজেই ওয়ারিশের জন্য কোনোরূপ অসিয়ত করা যাবে না, (আবু দাউদ) ‘যদি সে উত্তম অসিয়ত রেখে, মা-বাবা ও নিকটআত্মীয়দের জন্য, মিরাছের আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গিয়েছে।’ (কুরআন) (কেননা মিরাছের আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে)।
হজরত আমর ইবন খারিজা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সা: খুতবায় বলেন। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারের হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত জায়েজ নয়’ (নাসাই শরিফ)। হজরত ইবন খারিজা রা: বর্ণিত যে, তিনি আল্লাহর রাসূল সা:-এর নিকট উপস্থিত হয়ে দেখলেন যে, তিনি নিজের সওয়ারির উপর থেকে লোকদের খুতবা দিচ্ছেন। তখন ওই সওয়ারি জাবর কাটছিল এবং তার মুখ থেকে ফেনা বেয়ে পড়ছিল। তিনি তার খুতবায় বললেন, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক লোকের মিরাছের হিস্যা ভাগ করে দিয়েছেন, কাজেই ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত জায়েজ হবে না।’ (নাসাই শরিফে)। হজরত আমর ইবনে খারিজা রা: থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারের অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, এখন তার ওয়ারিশের জন্য অসিয়তের সুযোগ নেই।’ (নাসাই শরিফ)। আপনি আপনার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন। (কুরআন) এ আয়াত নাজিল হলে আল্লাহর রাসূল সা: কোরাইশদের ডাকলেন, তারা জমায়েত হলে প্রথমে সাধারণ লোকদের পরে নিজের আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে বললেন, কুরআনের নির্ধারিত আদেশ অমান্য করলে কেউ শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে না। আমিও তাকে রক্ষা করতে পারব না।
হজরত আনাস বিন মালেক রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, যে তার ওয়ারিশকে মিরাছ দেয়া থেকে মাহরুম করে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে জান্নাতের মিরাছ থেকে মাহরুম রাখবেন। (ইবনে মাজা) হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, কোনো লোক তার ৭০ বছরব্যাপী ভালো কাজ করে অতঃপর যখন অসিয়ত করে, তখন সে তার অসিয়ত জুলুম করে। এতে তার জীবন শেষ হয় খারাপ কাজের সাথে। পরিণামে সে জাহান্নামে যায়। কোনো লোক ৭০ বছর যাবৎ খারাপ কাজ করে, অতঃপর সে তার অসিয়তের বেলায় ইনসাফ করে। এতে তার জীবন শেষ হয় ভালো কাজের সাথে, ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে।’ (ইবন মাজা)। হজরত কুবরা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন. ‘যার মৃত্যু এসে যাবে, তখন সে অসিয়ত করবে, আর তার অসিয়ত আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী হবে, তাহলে তা সে তার জীবনে সে জাকাত ছেড়ে দিয়েছে তার কাফফারা হয়ে যাবে।’ (ইবনে মাজা)
কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করলে তা কার্যকর হবে না। যদি কেউ পুত্র, কন্যা, স্বামী অথবা স্ত্রীর জন্য কিংবা এমন কোনো ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করে যে ত্যাজ্য সম্পত্তিতে অংশীদার, তবে অসিয়তের কোনো মূল্য নেই। ওয়ারিশরা শুধু ওয়ারিশি স্বত্বের অংশ পাবে। এর অতিরিক্ত তারা কোনো কিছুর অধিকারী নয়, রাসূল সা: বিদায় হজের ভাষণে বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারকে তার হক দান করেছেন। অতএব ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত চলবে না।’ (অত: মা: কুরআন)
কুরআন পাক কন্যাদেরকে অংশ দেয়ার প্রতি এতটুকু গুরুত্বারোপ করেছে যে, কন্যাদের অংশকে আসল ভিত্তি সাব্যস্ত করে এর অনুপাতে পুত্রদের অংশ ব্যক্ত করেছে এবং দুই কন্যার অংশ এক পুত্রের সমপরিমাণ বলার পরিবর্তে এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমপরিমাণ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। অনেকেই বোনদেরকে অংশ দেয় না এবং বোনেরা এ কথা চিন্তা করে অনিচ্ছাকৃত সত্ত্বেও চক্ষুলজ্জার খাতিরে ক্ষমা করে দেয় যে, পাওয়া যখন যাবেই না, তখন ভাইদের সাথে মন কষাকষির দরকার কি। এরূপ ক্ষমা শরিয়তের আইনে ক্ষমাই নয়। ভাইদের জিম্মায় তাদের হক পাওয়া থেকে যায়। যারা এভাবে ওয়ারিশি স্বত্ব আত্মসাৎ করে তারা কঠোর গোনাহগার। (আ: মা: কুরআন)
অনেকে বৃদ্ধ পিতার জীবিত অবস্থায় বোনদেরকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে মাহরুম করার জন্য ফন্দি-ফিকির করে। যেমনÑ পিতাকে শিখায় আমার সম্পত্তি যা আছে তা ছেলেদের টাকায় খরিদ করা হয়েছে। এখন অসিয়তের মাধ্যমে ছেলেদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে যাচাই-বাছাই করলে দেখা যায়, সম্পত্তি যখন খরিদ করা হয় তখন ছেলেরা উপার্জন তো দূরের কথা লেখাপড়াও শুরু করেনি বা কেউ লেখাপড়া শুরু করেছে মাত্র। অথচ পিতার অবৈধ অসিয়তকৃত সম্পত্তি পেয়ে আনন্দিত। তাতে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতলা ভবন। অপর দিকে বোনদের কেউ থাকে নির্মাণাধীন ভবনসংলগ্ন মাঠের পাশে ভাড়া বাসায়। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বোনেরা বলে যেহেতু আমরা মেয়ে সেহেতু পিতার সম্পত্তিতে ভবন নির্মাণ তো দূরে থাকুক পা রাখার অধিকারও আমাদের নেই।
যারা ইহকালের সাময়িক সুখের জন্য লোভের বশীভূত হয়ে ছলে বলে কৌশলে, ফন্দি-ফিকির করে অবৈধ অসিয়ত বা হেবার মাধ্যমে বোনদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে মাহরুম করে তাদের বোঝা উচিত ইহকাল ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু পরকাল চিরস্থায়ী।

লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫