ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

চট্টলা সংবাদ

বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ফিশিং ভেসেল নির্মাণ করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

কয়েক বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার জাহাজ নির্মাণ শিল্প। দেশের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে নরওয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির হাইটেক ফিশিং ভেসেল নির্মাণের চুক্তির মধ্য দিয়ে এই সম্ভাবনা আরো জোরদার হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাহাজ নির্মাণ শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশী শিপইয়ার্ডগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চ মানসম্পন্ন জাহাজ রফতানি করছে। এখানে ১০০টিরও বেশি শিপইয়ার্ড অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলের জন্য নৌযান নির্মাণ ও সরবরাহ করে চলেছে এবং পান্তরে এ দেশে বিদেশী ক্রেতার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণে দ শিপইয়ার্ডেরও উন্মেষ ঘটেছে। ১০টিরও বেশি শিপইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ জাহাজ নির্মাণে সম।
ভারী ও উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প হওয়ায় এ েেত্র মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমনÑ চীন, কোরিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের জাহাজ নির্মাতারা তাদের মূলধন বিনিয়োগে সরকারের কাছ থেকে অত্যন্ত কম সুদে ঋণসুবিধা, ভর্তুকি ও বিশেষ রফতানি সহায়তা লাভ করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশী জাহাজ নির্মাতারা এসব সুবিধা পর্যাপ্ত ও প্রত্যাশিত মাত্রায় না পাওয়ায় নির্মাণব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বিদেশী জাহাজ মালিক ও ক্রেতাদের ফরমায়েশপ্রাপ্তির জন্য অত্যন্ত কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বমন্দা, অতি উচ্চহার সুদে মূলধন সংগ্রহের ফলে বিদেশী শিপইয়ার্ডের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হওয়ায় দেশীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অগ্রযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তা ছাড়া এই শিল্পের বিপুল মূলধনে গড়ে ওঠা শিপইয়ার্ডগুলো কয়েক বছর ধরে বিদেশী অর্ডার সঙ্কটে ভুগছিল।
এমনি পরিস্থিতিতে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ও নরওয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গত বছরের জুনে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় নির্মিতব্য একটি ৮০ মিটার দীর্ঘ বিশ্বের সর্বাধুনিক পার্সে সিনার প্রযু্িক্তর হাইটেক ফিশিং ভেসেল নির্মাণের কিক অফ মিটিং এবং সম্মেলন গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম কাবে অনুষ্ঠিত হয়। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মন্দা ভাবের মাঝে এ ধরনের একটি উন্নত জাহাজ নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টিকে এই শিল্পের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতি উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজটির ধারণমতা ২০০০ মেট্রিক টন যেখানে বাংলাদেশের ফিশিং ভেসেলে সর্বোচ্চ ধারণমতা ৩০০ টন এবং ফিশিং ভেসেলের মেইন ইঞ্জিনের মতা ৬০০০ কিলোওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাহাজটি এ দেশে নির্মিত প্রথম হাইটেক প্রযুক্তির ফিশিং ভেসেলের। প্রকল্প মূল্য ২৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশের ফিশিং ভেসেল নির্মাণের একক সর্বোচ্চ মূল্যের চুক্তি। জাহাজটির যন্ত্রাংশ যেমন হাইড্রোলিক ডেক মেশিনারি, নেভিগেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ইনটেরিয়র আউট ফিটিং, ফার্নিচার, অটোমেশন সিস্টেম, ফিশ ওয়াটার হ্যান্ডেলিং এবং রেফ্রিজারেটেড সি ওয়াটার সিস্টেম আমদানি করা হবে নরওয়ে থেকে, যার মূল্য প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় আট মিলিয়ন ডলারের যন্ত্রপাতি আমদানি করা হবে, বাংলাদেশী সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের মূল্যসংযোজন হবে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার এবং আগমী দুই বছরের জন্য প্রত্য ও পরোক্ষভাবে ১০০ লোকের কর্মসংস্থান হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ওয়েস্টার্ন মেরিন নরওয়ের জাহাজটির নির্মাণের অর্ডারপ্রাপ্তি বাংলাদেশের শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য গৌরবের ও মর্যাদার। এটি নির্মাণের ফলে নরওয়ের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো সম্প্রসারিত হবে।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরী পোশাক শিল্পের মতো আরো একটি প্রধান রফতানি খাতে পরিণত হয়েছে। অতি স্বল্প সময়ে বিশ্ববাজারে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন অংশে গুণগত মানসম্মত পণ্য রফতানির মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রি মোট ২৫টি জাহাজ রফতানির মাধ্যমে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে। এর মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড এককভাবে রফতানি করেছে ১৩টি জাহাজ। বিশ্ব অথনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও দেশের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ২১টি জাহাজ বিশ্বের ছয়টি দেশে রফতানির জন্য নির্মাণ করছে যার মধ্যে নরওয়ে, ডেনমার্ক, কেনিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গামবিয়া ও ভারত অন্যতম। এরই মধ্যে ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু দেশ তাদের নতুন জাহাজ নির্মাণের জন্য যোগাযোগ করছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরো বলেন, বিগত চার-পাঁচ বছরে বিশ্বের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মন্দা ভাব পেছনে ফেলে বর্তমানে এই শিল্পে আশানুরূপ উন্নতি সাধিত হচ্ছে। কিন্তু বর্ণিত আশাপ্রদ ফলাফল সত্ত্বেও বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আর্থিক সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যারা অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছেন, তারা সবাই এখন সমস্যায় রয়েছেন।
সরকার ভর্তুকি না দিলে এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা কঠিন হবে উল্লেখ করে তিনি বলেনÑ অবকাঠামোগত বিনিয়োগের েেত্র ব্যাংকঋণ সুদের হার ৪ শতাংশে এবং ২০ বছর মেয়াদে দেয়া হলে এ শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমন চীন, কোরিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের জাহাজ নির্মাতারা তাদের মূলধন বিনিয়োগে সরকারের কাছ থেকে অত্যন্ত স্বল্পসুদে ঋণসুবিধা, ভর্তুকি ও বিশেষ রফতানি সহায়তা লাভ করে থাকে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেনÑ জাপান, কোরিয়া, চীনে প্রায় ২৫ বছর মেয়াদে ঋণসুবিধা দেয়া হয় এবং ভারত ১০ বছর মেয়াদে ২০% সাবসিডি প্রদান করছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫