ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

থেরাপি

পাত্রী দেখা

শরীফ বিল্লাহ

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আমার ভাব একটু বেশি। এই ভাবই যে আমার জন্য অভাব হয়ে দাঁড়াবে তা কোনো দিন কল্পনাও করিনি। আরে ভাই... জগতে একটু ভাব ধরে চললে এত কি ক্ষতি? তাই বলে বিয়ে করার সময় এত ধরা খামু তা কি কখনো ভাবতে পেরেছি? ভাবের জন্য এখনো একটাও বিয়ে করতে পারিনি। আমার বন্ধু-বান্ধবেরা এক- একজন তিন-চারটা পর্যন্ত বিয়ে করেছে। আর আমি মাত্র একটা বিয়ে করতে চাইছি তাতেই এত বাধা। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। মেনে নিতে না পারলে যে বসে থাকব তা তো হতে পারে না। আমার আবার একটা প্রেস্টিজ আছে।
এই সহ এক শ’ বিশটা মেয়ে আমি দেখে ফেললাম। কোনো মেয়ে আমার পছন্দ হলো না। একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। রাস্তাঘাটে যেসব মেয়ে দেখি সব মেয়ে আমার পছন্দ হয়। কিন্তু বিয়ের জন্য যে মেয়ে দেখি ওই মেয়েটি আমার পছন্দ হয় না। নিজের প্রতি নিজের কেন জানি সন্দেহ দেখা দিলো। এ পর্যন্ত মেয়ে দেখতে গিয়ে আমার শত শত টাকা খরচ হয়েছে। ক্যালকুলেটরে একটা কোপ মেরে বুঝতে পারলাম এই টাকায় আমি কয়েকটা বাড়ি তৈরি করতে পারতাম। বাড়ি তৈরি করতে পারলেও একটা বউ তৈরি করা যে কত কষ্ট তা বুঝতে বাকি রইল না।
আজ একটা মেয়ে দেখতে যাবো। আমাদের পাশের গ্রামের। আমার দেখা থেকে এই মেয়েটা কিভাবে যেন বাদ পড়ে গেল। আমার একমাত্র ঘটক দুলাভাই। মেয়েটির বাড়ির দিকে আমরা রওনা দিলাম। হাতে কয়েক কেজি মিষ্টি। মিষ্টির কথা বলাতে আমার মুখে রস চলে আসে। এই মিষ্টির টাকা দিতে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গিয়েছিল। তবুও বিয়ে বলে কথা। একটু-আধটু টাকা তো খরচ করতেই হবে। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।
যাওয়ার সময় একটা কঠিন সাজ মারলাম। আজ মেয়ে পক্ষদের বুঝিয়ে দেবো আমি কত ধানে কত গোল আলু। মানে আমি কী রকম ছেলে। পছন্দ এবার ঠেকায় কে? একটা জিন্সের প্যান্ট কয়লা দিয়ে কড়া করে ইস্ত্রি করলাম। চোখে সানগ্লাস পরলাম। একমাত্র লাল শার্ট আলমারির চিপা থেকে উদ্ধার করলাম। এক জোড়া কেডস কিনলাম। কেডস এখন কিনেছি ভেবে ভুল করবেন না। আগের পাত্রীগুলো দেখতেও এই জুতা চালিয়ে দিয়েছিলাম। হে...হে...হে...। কত চালাক আমি। প্যান্টের সাথে শার্ট মাঞ্জা মেরে এদিক-ওদিক কড়া পারফিউম মারলাম। অনেক দিন না পরার কারণে প্যান্টটা একটু চিপা চিপা লাগল। মনে মনে এটা নিজেকে বুঝাতে সক্ষম হলাম ‘আরে ব্যাটা, এটাই স্টাইল।’
মেয়েদের বাড়ির সামনে আসা মাত্র প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির পানিতে আমার স্টাইল ধুয়ে যেতে শুরু করল। মানে আমার শার্টের লাল রঙ সব বেরিয়ে যেতে লাগল। অবস্থা যে দিকে যাচ্ছে, মনে হয় না শার্টের সাথে আর কোনো রঙ থাকবে। আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে চেষ্টা করলাম। এরই মধ্যে লাল রঙে আমার পুরো শরীর লাল হয়ে যাচ্ছে। আমি ছেলে হিসেবে যে লাল, মেয়ে পক্ষ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাবে।
মেয়েদের ঘরে যাওয়ার সময় একটা উঠোন পার হতে হয়। যেই না আমি পার হতে গেলাম অমনি ধপাস। আমি পিছলা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। চোখ থেকে কালো চশমাটা পড়ে গেল। আমার স্টাইল মারাত্মকভাবে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু আমি তা কোনোভাবেই যেতে দেবো না। তাড়াতাড়ি চশমাটা কুড়িয়ে চোখে লাগালাম। এদিক-ওদিক তাকালাম। কেউ দেখেছে কিনা সন্দেহ। নাহ, মনে হয় দেখেনি। যাক মানির মান আল্লাহ বাঁচাইছে। পকেটের একটা বোতাম পড়ে গেল। কোথাও খুঁজে পেলাম না। ছেঁড়া বোতাম যেন কেউ দেখতে না পায় হাত দিয়ে তা সিস্টেম করে ঢেকে রাখলাম। দূর থেকে একটা হাসির শব্দ কানে ভেসে এলো। না... মনে হচ্ছে ছেলের কণ্ঠ। মেয়েরা কেউ দেখেনি। পাত্রীর ঘরে গিয়ে প্যান্টের কাদা যেন কেউ দেখতে না পায় তার জন্য কোনার একটা চেয়ারে গিয়ে বসলাম।
কয়েক রকমের নাশতা এলো। আড়চোখে নাশতার দিকে তাকালাম। মুখে রস চলে এলো। আমার আবার যা দেখি তাই খেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু খেলাম না ভাবের কারণে। দুয়েকটা পিঠা পকেটে নিতে মন চাইছিল। কিন্তু আমি যেহেতু পাত্র সে কারণেই নিলাম না। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে একটু মুখে হাসি রাখলাম। পকেট থেকে একটা রুমাল মুখে দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আজ যেহেতু পাত্রী দেখছি এটি দেয়ার কোনো দরকার মনে করলাম না।
পাত্রী আমাদের সামনে এসে বসল। অনেকটা মারদাঙ্গা স্টাইলের মনে হলো। এসেই বলল, ‘হাই’। আমি একটা হাই তুললাম। আমার দিকে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে তাকালো। আমি মাঝারি মানের ভয় পেয়ে গেলাম। তবে দমে গেলাম না। কারণ আমি দমার পাত্র নই। পাত্ররা দমে না।
পাত্রীকে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগে সেই আমাকে বলল, ‘আপনি কী করেন?’
‘আমি কাজ করি।’
‘কী কাজ করেন?’
হঠাৎ আমি খেই হারিয়ে ফেললাম। আমি কী করি তা মুখ দিয়ে বের হলো না। বের হবে কেমনে? যে অগ্নিমূর্তি চেহারা।
‘না... না... মা... নে... ’
পাত্রী আমার দুলাভাইকে বলে উঠলো, ‘ছেলে তো দেখি তোতলায়...’
আমি মুখ দিয়ে কথা বের করতে চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুতেই কথা আসছে না। পাত্রী বলেই চলছে, ‘কী ছেলে নিয়ে আসলেন সারা গায়ে কাদা... একদম ক্ষ্যাত।’
ক্ষেতের কথা বলাতে আমার কাছে সরিষার ক্ষেতের কথা মনে হলো। যেন চোখে সরিষার ফুল দেখছি। হঠাৎ পাত্রী আমাকে বলে উঠল, ‘আঙ্কেল, এবার আসতে পারেন।’
‘আসতে পারেন’ আর ‘যেতে পারেন’ যে একই শব্দ আমি বুঝে উঠতে পারলাম না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫