ঢাকা, শনিবার,২৫ মার্চ ২০১৭

দেশ মহাদেশ

সৌদি বাদশাহর এশিয়া সফর

আলফাজ আনাম

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
সৌদি বাদশাহর এই সফরে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্কের দিকটি গুরুত্ব পাচ্ছে

সৌদি বাদশাহর এই সফরে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্কের দিকটি গুরুত্ব পাচ্ছে

মাসব্যাপী এশিয়া সফরে বেড়িয়েছেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। রাজপরিবারের সদস্য, মন্ত্রী ও বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ প্রায় ১৫০০ সদস্য আছেন এই সফরে। এশিয়ার মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করা বাদশাহর এই সফরের মূল লক্ষ্য। একই সাথে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন ও আরেক প্রভাবশালী দেশ জাপানও সফর করবেন। সৌদি বাদশাহ মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে এশিয়া সফর শুরু করেন। এরপর ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই, জাপান, চীন ও মালদ্বীপ সফর করবেন।
সৌদি বাদশাহর এশিয়া সফর দেশটির অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে সৌদি আরবের বিনিয়োগের পরিমাণ আগামী দিনে আরো বাড়বে। পশ্চিমা বিশ^ বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। নতুন বাদশাহ ক্ষমতা গ্রহণের পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তেলের দাম কমে যাওয়ার কারণে সৌদি অর্থনীতি এখন বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও পুরোপুরি মার্কিননির্ভরতা কাটিয়ে ভারসাম্যমূলক অবস্থান নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। বাদশাহর এশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এই সফরের জ¦ালানি ও বিনিয়োগের দিকটি বেশি গুরুত্ব পেলেও একই সাথে ভূকৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে এশিয়ায় অর্থনৈতিক উত্থানে সৌদি আরব বিশেষ স্থান করে নিতে চায়। এশিয়াতে মুসলিমপ্রধান দেশগুলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে এসব দেশের সাথে সৌদি আরবের আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক আরো জোরদার করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে এই দেশ দু’টি তিনি সফর শেষ করেছেন এবং সৌদি বাদশাহর সফর সফল হয়েছে বলে উভয় পক্ষে দাবি করা হয়েছে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো সৌদি আরবের জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা। ২০১৫ সালের শেষ দিক থেকে সৌদি আরব জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সৌদি ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরমাকো বেসরকারি খাতে শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স জাপান ও চীনা নেতাদের সাথে এর আগে বৈঠক করেন। সৌদি আরবে বিনিয়োগের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। গত বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সৌদি আরব সফর করেন। চীন ও জাপান উভয় দেশই সৌদি জ্বালানি তেলের বড় ক্রেতা। ২০১৬ সালে চীন জ্বালানি তেল আমদানি ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি নীতি ছাড়াও এই সফরে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্কের দিকটি গুরুত্ব পাচ্ছে। সৌদি আরবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে চীনের। একই সাথে সৌদি আরবের সাথেও চীন ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে চলছে। সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরান প্রশ্নে চীনকে নিরপেক্ষ অবস্থানে দেখতে চায়।
সৌদি বাদশাহর এই সফরে এশিয়ার চারটি মুসলিম দেশ রয়েছে। এই চারটি দেশ সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপ ও ব্রনেইয়ের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। ইন্দোনেশিয়া বিশে^র বৃহত্তম মুসলিম দেশ। সবগুলো দেশ ইসলামি সম্মেলন সংস্থা ওআইসির সদস্য।
সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গত বছর সৌদি আরবের উদ্যোগে ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স গঠন করা হয়েছে। সৌদি ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স সালমান এই জোট গঠনের উদ্যোক্তা। গত বছরের জানুয়ারিতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা অংশ নেন। মালদ্বীপও এই জোটে অংশ নিয়েছে। এই জোটকে কার্যকর সামরিক জোটে পরিণত করার ইচ্ছা সৌদি আরবের রয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাছে পেতে চায় সৌদি আরব। মুসলিম দেশগুলো সফরে এই বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা যায়।
এ ছাড়া এশিয়ার দুই শক্ত অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় সৌদি বিনিয়োগ আরো বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ৪৭ বছর পর সৌদি বাদশাহ ইন্দোনেশিয়া সফর করলেন। জাকার্তা আশা করছে এই সফরের মধ্যদিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে।
সৌদি বাদশাহর সফর শুরু হয়েছিল মালয়েশিয়া দিয়ে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাক তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দেশটি সফরে সৌদি তেল জায়ান্ট সৌদি আরমাকো এবং মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোনাসের মধ্যে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এরমধ্যে মালয়েশিয়ায় একটি তেল শোধনাগার নির্মাণসহ একাধিক প্রটোকেমিক্যাল প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে সৌদি আরব। তেলের দাম কমে যাওয়ায় পেট্রোনাস কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে ছিল। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রাণ সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সৌদি বাদশাহর এশিয়া সফরের একেবারে শেষ দিকে রয়েছে দ্বীপদেশ মালদ্বীপ। সৌদি আরবের সাথে মালদ্বীপের পর্যটননির্ভর সম্পর্ক অনেক নিবিড়। ভারত মহাসাগরের বুকে মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে সৌদি আরব বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে। সৌদি বাদশাহ মালদ্বীপের একটি দ্বীপ কিনতে যাচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এর কৌশলগত গুরুত্ব যাই থাকুক না কেন এর প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। এ নিয়ে এশিয়ার আরেক প্রভাবশালী দেশ ভারত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো মালদ্বীপের সাথেও ভারতের সম্পর্ক কখনো স্থিতিশীল নয়। এসব দেশে মুসলিম প্রভাব নিয়ে ভারত সব সময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে। সৌদি বাদশাহর মালদ্বীপ সফরে এর ব্যতিক্রম হয়নি।
সৌদি বাদশাহর এশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে দেশটি পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে দৃষ্টি দিতে যাচ্ছে। আগামী দিনে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিতে পূর্ব এশিয়া যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে, তা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫