ঢাকা, সোমবার,০১ মে ২০১৭

দেশ মহাদেশ

বার্লিন-আঙ্কারা টানাপড়েন

আহমেদ বায়েজীদ

০৯ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
গণভোটে কোনো রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হলে আঙ্কারা বার্লিনকে ছেড়ে কথা বলবে না

গণভোটে কোনো রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হলে আঙ্কারা বার্লিনকে ছেড়ে কথা বলবে না

অবনতি হচ্ছে তুরস্ক-জার্মানি সম্পর্ক। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান জার্মানির শাসনব্যবস্থাকে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন। এক দিকে ইউরোপের প্রভাশালী দেশ জার্মানি, অন্য দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভের আশায় অপেক্ষমাণ তুরস্ক। বেশ কিছু দিন ধরেই সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না দেশ দু’টির। তার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট এরদোগান সরাসরি জার্মানিকে একহাত নিলেন। অতীতে জার্মানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন তুর্কি রাজনীতিকেরা। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে দোষারোপ এই প্রথম।
দীর্ঘ কয়েক দশকের পশ্চিমানির্ভরতা কাটিয়ে উঠে তুরস্কের এরদোগান সরকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে পশ্চিমা বলয়ের বাইরে রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে একে পার্টির সরকার। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে ইস্তাম্বুলের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রভাবশালী দেশ জার্মানিও ব্যতিক্রম নয়। বার্লিনের বিরুদ্ধে অনেকবারই অসহযোগিতা ও অবন্ধুসুলভ আচরণের অভিযোগ এনেছে আঙ্কারা।
গত বছর জুলাইয়ে তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টার পরই বিষয়টি ফুটে উঠেছে। অভ্যুত্থানচেষ্টার বিষয়ে অ্যাঞ্জেলা মারকেল সরকারের ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট নন এরদোগান ও তার দল। তুরস্ক অভিযোগ করেছে, অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের ‘যথাযথ নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে’ জার্মানি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় জার্মানির বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ এনেছেন তুর্কি রাজনীতিকেরা।
এরই মধ্যে গত মাসে একজন জার্মান-তুর্কি সাংবাদিককে আটক করে তুর্কি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে কুর্দিদের সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। এ নিয়ে আঙ্কারার সাথে বার্লিনের বাগ্যুদ্ধও হয়েছে বিভিন্নপর্যায়ে। সে ঘটনার রেশ না কাটতেই জার্মানিতে একজন তুর্কি মন্ত্রীর অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করা হলেও বিষয়টি গড়িয়েছে অনেক দূর। তুরস্কের আসন্ন গণভোট নিয়ে জার্মানিতে বসবাসরত তুর্কি নাগরিকদের মাঝে প্রচারণা চালানোর জন্য ওই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের একক নির্বাহী ক্ষমতার বিষয়ে জনগণের সম্মতির জন্য আয়োজিত গণভোটের প্রচারণায় বাধা দানের বিষয়টি ভালোভাবে নিতে পারছে না আঙ্কারা। হঠাৎ করেই জার্মানির এমন সিদ্ধান্তের পেছনে দু’টি কারণ থাকতে পারেÑ এক. জার্মান সাংবাদিকের গ্রেফতারের প্রতিবাদ বা প্রতিশোধ। দুই. প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোগানের নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে অসন্তুষ্টি। প্রথম কারণটি একান্তই জার্মানির নিজস্ব হলেও দ্বিতীয় কারণটির সাথে জড়িয়ে আছে পশ্চিমা বলয়ের ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এরদোগানের উত্থান, তার ওপর জনগণের প্রবল আস্থা এবং এ দুয়ের সমন্বয়ে তুরস্কের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তরতর করে এগিয়ে চলা নিয়ে পশ্চিমাদের কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। আর এসব কারণে গণভোটের প্রচারণায় জার্মানির অসহযোগিতা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সংবিধান পরিবর্তন করে একক নির্বাহী ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় সবগুলো পর্যায় পার হয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। গত মাসে পার্লামেন্টে বিষয়টি পাস হওয়ার পর জনগণের মতামত জানতে আয়োজন করা হয় গণভোটের। জনগণ যদি প্রেসিডেন্টের এই নির্বাহী ক্ষমতাকে অনুমোদন দেয় তবেই তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের দফতর বলছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত ও জটিলতামুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োজন। আর প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ওপর তুর্কিদের যে আস্থা, তাতে এই বিলে তারা সম্মতি দেবে বলেই মনে হচ্ছে। কারণ একজন সাহসী ও কর্মোদ্যমী রাষ্ট্রনায়ক দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারেন তার ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে বিশ্বে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তুরস্কের বিশ্ব শক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করার বিষয়টি কে কিভাবে দেখবে, এ ক্ষেত্রে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানিতে প্রায় ১৫ লাখ তুর্কি ভোটারের বসবাস। গণভোটে তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তুরস্ক মনে করছে, গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতেই জার্মানি প্রচারণার কাজে বাধা দিচ্ছে। আর হয়তো এই আশঙ্কা থেকেই প্রেসিডেন্ট এরদোগান সরাসরি জার্মানিকে নাৎসিদের সাথে তুলনা করেছেন। প্রবাসীদের মাঝে গণভোটের প্রচারণা চালাতে জার্মানি যাওয়ার কথা রয়েছে এরদোগানের। এ বিষয়ে জার্মানি কোনো হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এরদোগানের এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জার্মানি। কূটনৈতিক রীতি মেনে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল ও তার মুখপাত্র বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন। এ নিয়ে দেশে মারকেল সরকারের সমালোচনাও কম হচ্ছে না। অনেক জার্মান বিশ্লেষক মনে করছেন, উদ্বাস্তু সঙ্কট নিয়ে জার্মানি অনেকভাবেই তুরস্কের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপমুখী উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের স্রোত ঠেকাতে হলে তুরস্কের সহযোগিতা দরকার জার্মানিসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর। কাজেই আঙ্কারাকে চটাতে চাইছে না তারা। গত সোমবার জার্মানির দের স্পাইজেল (দ্য মিরর) পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, উদ্বাস্তু সঙ্কটের কারণে জার্মানি তুরস্কের ওপর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে আরো বলা হয়েছে, তুরস্ক ইস্যুতে মারকেল ‘দুঃখজনকভাবে বাধাগ্রস্ত ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভয়ের’ শিকার হচ্ছেন।
তুরস্কের বিষয়ে জার্মানি কেন নমনীয় তা স্পষ্ট না হলেও গণভোটে কোনো রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হলে আঙ্কারা যে বার্লিনকে ছেড়ে কথা বলবে না, তা বোঝাই যাচ্ছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫