ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বাংলাদেশ বিমান : সঙ্কটমোচনে দক্ষ জনবল

মো: আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়

০৮ মার্চ ২০১৭,বুধবার, ১৮:১০


প্রিন্ট

এমিরেটস এয়ারলাইন্স, কাতার এয়ারওয়েজ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের মতো রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রকদের নীতিসহায়তা নিয়ে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেছে; নিজ নিজ দেশের ব্র্যান্ডিংয়ে রেখেছে ও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতীক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এখনো অনেক পিছিয়ে। জাতীয় সংস্থাটি লক্ষ্য অর্জন না করার অনেক কারণ রয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশার, প্রথম মহিলা পাইলট রোকসানা, নৌ অধিদফতরের চিফ মেরিনার শুকুর মাহমুদসহ জানা-অজানা বহু জানমালের ক্ষতি হয়েছে দুই শতাধিক বিমান দুর্ঘটনায়। গত বছর কক্সবাজারে এক বিমান দুর্ঘটনায় বিশ্বের এক নম্বর ক্রিকেট খেলোয়াড় সাকিব আল হাসান অল্পের জন্য রক্ষা পান।
এ দিকে গত ২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি সফরে হাঙ্গেরি যাচ্ছিলেন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তার বিমানটি তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশগাবাদে জরুরি অবতরণ করে। ওই দিনই ব্রিটেনের ডেইলি টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে বিশ্বের নিকৃষ্টতম ২১টি বিমান সংস্থার নাম প্রকাশ করেছে। লজ্জার বিষয়, তাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নামটিও ‘জ্বলজ্বল করছে’। শিরোনাম ছিল ‘দ্য টোয়েন্টি ওয়ান ওয়ার্স্ট এয়ারলাইন্স ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের তালিকায় এ দেশের নাম উঠেছে অনেক আগেই, এবার নাম উঠল বিমানের। তালিকায় আরো আছে, নাসাউয়ের ‘বাহামাসএয়ার’, উত্তর কোরিয়ার ‘কোরিয়ান এয়ার’, সুদানের ‘এয়ারওয়েজ’, নেপালের ‘নেপাল এয়ারলাইন্স’, ইরানের ‘মাহান এয়ার’, ইয়েয়েমেনের ‘ইয়েমেনিয়া’ প্রভৃতি।
গত নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ার পর বিমানের আরো কয়েকটি ফ্লাইটে বিপত্তি দেখা দেয়। ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে চট্টগ্রামগামী বিমানের বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের পরই এর চাকার একটি অংশ খুলে পড়ে রানওয়েতে।
প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরিগামী ফ্লাইটে উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের নাকি একটি নাট ঢিলা ছিল, যে কারণে ইঞ্জিনে জ্বালানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছিল। ফলে ক্যাপ্টেন আশগাবাদে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হন। ঝুঁকি না নিয়ে পাইলট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। সে ঘটনার পরপরই কাঠমান্ডুগামী বিমানের একটি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ায় তা ঘুরিয়ে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করানো হয়। ওই ফ্লাইটে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
বাংলাদেশে বেসরকারি এভিয়েশনের দুই দশকের অভিযাত্রা। এ ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পাল্লা বেশি ভারী। যাত্রার শুরুতে আমরা যে সমস্যায় নিমজ্জিত ছিলাম, দুই দশক পরও একই সমস্যার চোরাবালিতে নিমজ্জিত। বিষয়গুলো বিভিন্ন প্রোগ্রামে অনেক আলোচিত। আন্তরিক উদ্যোগের অভাবে যে তিমিরে আমরা ছিলাম, এখনো সেখানেই। আমাদের দেশীয় এয়ারলাইন্সের সমস্যা বহুমুখী। কিন্তু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এর সমাধান জরুরি।
আমাদের দেশের এয়ারলাইন পরিচালনার ক্ষেত্রে ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যা প্রকট। এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণের হ্যাঙ্গার নেই। এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণের সাথে যাত্রী নিরাপত্তা সম্পর্কিত। কিন্তু এটাই ‘বাংলাদেশ বিমান’ ব্যতীত বাংলাদেশের কোনো এয়ারলাইন্সের নেই। ফলে সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রী নিরাপত্তা পড়ছে হুমকির মুখে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধুনিক বিমানবহরের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হাঙ্গেরিগামী উড়োজাহাজের নাট ঢিলা হওয়ার ঘটনা নিয়ে এ পর্যন্ত দায়িত্বশীলদের মুখ থেকে অন্তত ১১-১২ রকমের বক্তব্য শোনা গেছে। ব্যক্তি বা জাতি দুইভাবে অন্যের চোখে হেয় হয়- বোকামির জন্য এবং অতি চালাকির কারণে। প্রবাদ রয়েছে- অতি চালাকের গলায় দড়ি। বাংলাদেশীদের একটি গোত্র অতি চালাক হতে গিয়ে নিজের গলায় নিজে ফাঁস লাগায়, অথবা দোকান থেকে কুড়াল কিনে নিজের পায়ে নিজেই মারে। ইতিহাসে যতবার বাঙালি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, ততবার সে দড়ি ও কুড়ালের সদ্ব্যবহার করেছে। আগে থেকেই এ বদনাম ছিল। যা হোক, গত কিছু দিনে বিমানের ভাবমর্যাদা এতটা কমে গেছে যে, কোনো বিদেশী বিমান দেখলেই দৌড় দেবে ভয়ে। বিমানের যখন সর্বনাশ, তখন অন্যান্য দেশের এয়ারলাইনগুলোর ‘পৌষ মাস’। বিমানের ভাগ্যবিপর্যয়ের কারণে সৌভাগ্যের দরজা খুলে গেছে তাদের।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশে এখনো ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেনি বাংলাদেশ বিমান। এটা ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতা বৈকি। নিঃসন্দেহে বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হলে রাষ্ট্র্রীয় সংস্থাটির সার্বিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উন্নতির আশায় বহরে বাড়তি উড়োজাহাজ সংযোজন করা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কেনা হয় চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ। তদুপরি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদের ভিত্তিতে সংযোজন করা হয় দু’টি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর। এসব উড়োজাহাজ আনার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বড় দূরত্বে ফ্লাইট পরিচালনা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সুফল মেলেনি। সংশ্লিষ্টরা বড় দূরত্বে বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারার মূলে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে না পারা। কারণ বেসিক ক্যাটাগরি-২-এ থাকায় সংস্থাটি থেকে অনুমোদন নেয়া উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্র্র ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পাচ্ছে না।
বিমানের উন্নয়ন করতে হলে কেবল উড়োজাহাজ সংযোজনই যথেষ্ট নয়, দক্ষ জনবলের সংযুক্তিও ঘটাতে হবে। বিমানের পূর্ণাঙ্গ জনবলকাঠামো এখনো তৈরি করতে পারেনি সরকার। এটাও বিমানের উন্নতির অন্যতম প্রধান অন্তরায়। যে দেশের এক কোটি মানুষ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রবাসী শ্রমিক, যাদের কষ্টার্জিত টাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিন্দুক বৈদেশিক মুদ্রায় ঠাসা, সে দেশের জাতীয় বিমান সংস্থা প্রতি বছর বিপুল লোকসান দেয়, এ কথা কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। বিমানের টিকিট কিনতে গেলে কাউন্টার থেকে ধমকের সুরে বলা হয় ‘টিকিট নেই’। অথচ বিমানে উঠে দেখা যায়, সিট খালি। তা ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের আধিক্য তো রয়েছেই। যেকোনো অনিয়ম ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে শুধু দ্রুত গতিতে এক দল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রিমান্ডে নিলেই সংস্থার উন্নতি ঘটানো যায় না।
মধ্যম আয়ের দেশের তকমা লাগানো জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা নিকৃষ্ট মানের, যে সংস্থার উড়োজাহাজে চড়তে মানুষ ভয় পায়। এমন মধ্যম আয়ের দেশ নিয়ে গর্ব করা যায় না। বদনাম শুধু বিমানেরই নয়, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনায় যে অদক্ষতা ও দুর্নীতি, তা সারা দুনিয়া জানে। বিমানবন্দর ও বিমানের সব নাটবল্টু টাইট দিতে হলে সরকারকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিয়ে কঠোর হতে হবে। বিমানকে কার্যকর সংস্থায় পরিণত করতে এর কর্মীবাহিনীকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। চালু করতে হবে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি কোর্স-কারিকুলাম। যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার যে স্বপ্ন আর কল্পনা, তার সাথে বিমানকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিমান পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রভৃতি ক্ষেত্রেও স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ রাখতে হবে। লক্ষ্য হোক মহাকাশ অভিযানও।
বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণা ও শিক্ষাকার্যক্রমের সাথে চালু করতে হবে মধ্যম মানের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং। বিমান ও হেলিকপ্টার ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনস্ট্রুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট, পাইলটিং, এয়ারহোস্টেস অ্যারোনটিক্যাল, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, সিকিউরিটি ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বসহকারে চালু করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫