ঢাকা, সোমবার,২৪ জুলাই ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার

রাজু আহমেদ

০৬ মার্চ ২০১৭,সোমবার, ১৮:৪৯


প্রিন্ট

অন্যায়ভাবে প্রাণ সংহার করতে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রকে বৈধ বলার সাধ্য নেই, হোক সে লাইসেন্সধারী। এমন দিন অতিবাহিত হয় না, যেখানে অবৈধভাবে বৈধ-অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সংঘর্ষ ছাড়াও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এক পক্ষের ওপর অন্য পক্ষের প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে মারণাস্ত্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীতে সমমনা রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাকর্মীদের ওপর অস্ত্র তাক করার দৃষ্টান্ত বিরল। অথচ বর্তমানে ভিন্নদলের সাথে সংঘর্ষে অস্ত্র দিয়ে যত প্রাণ কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি জীবন কেড়ে নেয়ার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে নিজ দলের হানাহানি থেকে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় ও দলীয় স্বার্থের ওপরে ব্যক্তিস্বার্থ ভর করার ফলেই এ দুর্গতি সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের কিছু এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের একশ্রেণীর নেতা নামধারীরা অস্ত্রের জোরে নিজেদের বিপক্ষ ফোরামকে দমনে রত। তেমনি সাধারণ মানুুষকে জিম্মি করে ব্যাপক চাঁদাবাজি ও দখলবাণিজ্যের রাজত্ব কায়েম করেছে। ক্ষমতার পালাবদলে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাদের মদদপুষ্টরা অস্ত্র নিয়ে যে মারণ খেলায় মেতেছে, তা খুব বেশি রোধ করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান নয়। পুলিশের সামনে এ দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের বিরাগভাজন গ্রুপ কিংবা বিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের তাণ্ডব চালালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। মাঝখান থেকে হারিয়ে যায় কতগুলো তাজা প্রাণ। এদের কেউ শিশু, কেউ পথচারী, কেউ নারী এবং তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ। অথচ ঘৃণ্য অপরাধীরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
বৈধ অস্ত্রের অবৈধ চালনায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ২ ফেব্রুয়ারি খুন হলেন দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখিয়ে বিগত কয়েক বছরে বহু নেতাকর্মী অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন। তাদের সেই বৈধ অস্ত্র দিয়ে অবৈধ কার্যকলাপের বেশ কিছু খবর জাতি মিডিয়া সূত্রে জানতে পেরেছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলায় পৌরমেয়র সমর্থক এবং উপজেলা চেয়ারম্যান সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব বিরাজ করছে। দুই দলের সংঘর্ষে সেখানে আগেই একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
গত সাত বছরে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১০ হাজার অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, দেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা দুই লাখ। এর মধ্যে ২০ হাজারের কোনো হদিস নেই। ২০০৮ সালের ২৩ মে রাজধানীর ওয়ারীতে আশিকুর রহমান অপু হত্যাকাণ্ডে চারটি বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছিল বলে পুলিশি তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। সিরাজগঞ্জের আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা হেনরির বাসায় তার লাইসেন্সকৃত শটগানের গুলিতে আহত হন তিন নেতা। ২০১২ সালের এপ্রিলে নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা রবিন তার বৈধ অস্ত্র দিয়ে হামলা চালান বিদ্যুৎ অফিসে। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডারে প্রধান অভিযুক্ত ও ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের নামে ৯টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স আছে।
গত বছরের ৩১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের গোলাগুলি, ২৭ অক্টোবরে রাজধানীর গুলিস্তানে ব্যবসায়ী ও হকারদের ওপর ছাত্রলীগের দুই নেতার প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরা কিংবা কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গহিন অরণ্যে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের অস্ত্রচালনার চিত্র পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশে যেসব অবৈধ অস্ত্রের কারণে হুমকি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, তার বেশির ভাগ আসে ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোরের বেনাপোল ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়েই বেশি অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ ছাড়া কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তপথ দিয়েও কিছু আসে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে কিছু অস্ত্র ধরা পড়লেও বিপুলসংখ্যক অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে যায় দেশের সর্বত্র। অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি কমানো এবং বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের লাগাম টানতে সংশ্লিষ্ট আইন আরো যুগোপযোগী করা আবশ্যক। আর কোনো শিমুলের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমরা চাই না।

raju69alive@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫