ঢাকা, রবিবার,২৩ এপ্রিল ২০১৭

নারী

আমার কাছে নারী পুরুষ বলে আলাদা কিছু নেই : রূপালী চৌধুরী

০৫ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৪:৩২


প্রিন্ট

রূপালী চৌধুরী বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। আজকের এই বিশাল প্রাপ্তি একজন নারীর জীবনে সহজ কোনো গল্প নয়। রূপালী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন এবং রসায়নে অনার্স করেন চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনের শুরুটা করেন ‘সিবা গেইগি বাংলাদেশ’-এ যোগ দেয়ার মাধ্যমে। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল ৬ বছর ওখানে থাকার পর যোগ দেন বার্জার পেইন্টসে। তিনি ছিলেন সিবা গেইগির ব্র্যান্ড ম্যানেজার। ‘বার্জার পেইন্টসে’ ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল দীর্ঘ ১৮ বছর চাকরি জীবনে মার্কেটিং, সেলস, পরিকল্পনা বিভাগসহ নানা অংশের দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কাজের দক্ষতা, দায়িত্বপরায়ণ, কর্মনিষ্ঠ দূরদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে আজ অবধি একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৭ সালে তিনি করপোরেট ম্যানেজমেন্টের জন্য অনন্যা টপ টেন পুরস্কার পেয়েছেন। তা ছাড়া এত বছরে আরো বহু প্রশংসা জমা হয়েছে তার ঝুলিতে, তার কর্মদক্ষতার গুণেই।
ছায়া সুনিবিড় চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানাধীন পটিয়া শহরতলি গ্রামে রূপালী চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা ডা: প্রিয় দর্শন চৌধুরী ও মা শালিনতা চৌধুরীর চতুর্থ সন্তান হলেও মা-বাবা ও বড় ভাই-বোনদের আদরে-স্নেহে বড় হয়েছেন তিনি। বাবা সেই সময়ে ওই এলাকার বিখ্যাত ও খুবই ব্যস্ত একজন ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও ছেলে-মেয়েদের সুস্থ, সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে সুযোগ দিয়েছেন নানা কর্মকাণ্ডে সন্তানদের জড়িত থাকার মাধ্যমে। ছোট বেলায় ঘরের পরিবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বললেন- ‘ছোট্ট বেলায় আমি আমার ঘরে বাইরে যা কিছুই করেছি কোনো কিছুতেই কোনো রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। আমার বাবা ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। তিনি জানতেন এবং বুঝতেন মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে বড় হতে গেলে শিশু-কিশোরদের বোঝাতে হবে তোমার এই পৃথিবীতে জানার, বোঝার আর শেখার অনেক কিছু আছে। তুমি শুধু তোমার আগ্রহ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দের জায়গাগুলো খুঁজে নাও। তাই বাবা আমাদের গান-নাচ, ডিবেট, খেলাধুলা কোনো কিছুতেই বাধা দিতেন না। আমি শুধু আমার ভালো লাগাটুকু থেকে সব কিছুই করেছি। আর এ থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি একটু একটু করে। যা আমার আজকের এ অবস্থানে আসার নেপথ্যে কাজ করেছে। তিনি আরো বললেন- ‘ছোট্ট বেলায় দেখাতাম বাবা ঘরে নানা ধরনের দেশী-বিদেশী ম্যাগাজিন ও জার্নাল আনতেন, ডাইজেস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘উদয়ন’ পত্রিকা তো থাকতই। তা ছাড়া বড় বড় মণীষীর জীবনীসহ কতরকম জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইপত্র থাকত, যেগুলো পড়ার ব্যাপারে বাবা-মায়ের সমান উৎসাহ আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যেত।
এমবিএ পাস করার পর প্রথম আমি ‘সিবা গেইগিতে’ চাকরি পাই তারপর ১৯৮৯ সালে বন্ধু আব্দুল হককে জীবন সাথী হিসেবে পেয়ে পারিবারিক জীবনে পথ চলতে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি অত্যন্ত সহমর্মী, সাহায্যকারী, সহযাত্রী হিসেবে আমাকে আজও মানসিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে এই জীবনে কখনো মনেই হয়নি নারী হিসেবে জন্ম নিয়ে আমার ভুল হয়েছে। সন্তান জন্মাবার পর সব কিছু ম্যানেজ করতে একটুতো অসুবিধা হতোই। তবে সে ক্ষেত্রে আমার বর্তমান অফিস আমাকে সেই অসুবিধা ওভারকাম করার সুযোগ দিয়েছেন। তাই তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
আপনি একজন মহিলা হয়ে প্রথম যখন সিবা গেইগিতে জয়েন করলেন তখন কী মনে হয়েছে? বা কোনো রকম অসুবিধা ফিল করেছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চাকরিতে যোগদান করার পর আপনার মতো অনেকেই এই ধরনের প্রশ্ন আমায় করত, তখন আমি তাদের বলতাম- ‘আমার কাছে কাজ করার ক্ষেত্রে পুরুষ বা নারী বলে আলাদা কোনো অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না, আসলে আমরাই সমাজের কিছু মানুষ এই পুরুষ-নারী শব্দ দুটোকে আলাদা করে নারীদের অস্তিত্বকে ছোট করে তুলি। কারণ সৃষ্টিকর্তা কিছু শারীরিক গঠনগত পার্থক্য ছাড়া, মন, মানসিকতা, মেধা, মনন ও জ্ঞানে, নারীদের অনেক সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। আর বাবা ও বড় ভাইয়ের উপদেশ নিয়ে যেহেতু আমার ছেলে বেলাটায় বেড়ে উঠেছি সুতরাং আমার ভেতরের বোধগুলো আমাকে পুরুষ সহকর্মীদের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সঙ্কোচের মুখাপেক্ষী হতে দেয়নি।
আমি প্রথম যখন বার্জারে জয়েন করি তখন আমার ইন্টারভিউ বোর্ডে জিজ্ঞেস করা হয় আমি কাজটা পারি কি না, আমার পার্সোনালিটি কেমন! এখানে ছেলে-মেয়ে কোনো ফ্যাক্টর নয়। কাজের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে আলাদা কোনো ব্যাপার আছে বলে আমার কোনো দিনই মনে হয়নি। আর পারিবারিক জীবনের কথা বলতে গেলে বলা যায়- আমরা যদি আমাদের পারিবারিক সুবিধা পেতে পাই তাহলে নিজের এতটুকু লাভের জন্য আমি আমার অধীনস্ত মানুষ টিকে তার যোগ্যপ্রাপ্তটুকু দিতে পারি তাহলে সে তার সর্বোচ্চ শ্রম ও বিশ্বাস দিয়েই কাজটা করবে। এটা ঘরের গৃহপরিচারিকা থেকে অফিসকর্মীও হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। এতে তার পরিবারও খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে, অন্য দিকে আমাদের মতো চাকরিজীবী নারীরাও। আমার একজন গৃহপরিচারিকা ছিল সে দীর্ঘদিন থেকে আমার সন্তান দুটোকে বড় করে দিয়ে গেছেন। মেয়েটি ছাড়া আমি হয়তো চলতেই পারতাম না। মা হিসেবে একজন নারীর দায়িত্ব কর্তব্য তো থাকেই সেটাতো অন্য কারো সহযোগিতা ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, যা আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। তারপরও ভালো একজন বিশ্বাসী গৃহপরিচারিকা একটা পরিবারের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয় এর বিকল্প নেই।
সামনে ৮ মার্চ নারী দিবস এই দিনটিকে আপনি কিভাবে দেখেন? এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জানান, ‘আমার মায়ের লাইফটা দেখেছি তিনি সারাজীবনই সবাইকে দিয়ে গেছেন। প্রচণ্ড সেক্রিফাইজিং ছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত লাভের কথা কখনো ভাবেনইনি, আমরা তার সন্তানরা বড় হবো এটাই তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল। তার পরের প্রজন্মে আমরা পেশাগত জীবন ও সংসার দুটোকে ব্যালেন্স করে এসেছি অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো সংসার কখনো অফিসকে প্রাধান্য দিয়েছি। তো একটা মেয়ে যদি তার নিজের ও পরিবারের জন্য আশীর্বাদ হয় এটা মন্দ কি। এই সমাজে পরিবারে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অনেক তো একটা মেয়ে সে নিজে শিক্ষিত হয়ে কাজ করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করতে পারে- নিজের স্বনির্ভর থেকে এতে সমাজ অনেকটা ব্যালেন্সন্ড হবে। বস্তুত অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হলে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। আত্মবিশ্বাসী নারী তার পুরো পরিবারকে ওপরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে দৈনন্দিন জীবনে নারীকে ঘরে বাইরে অফিস আদালতে শুধু নারী হওয়ার কারণে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা নারীসমাজের অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
ব্যক্তিগত জীবনে রূপালী চৌধুরী স্বামী আব্দুল হক ও দুই সন্তান রাহুল ও পূর্ণাকে নিয়ে সুখে আছেন। বর্তমানে সন্তানরা কানাডায় পড়াশোনা করছেন।
সাক্ষাৎকার : আঞ্জুমান আরা বেগম
রূপালী চৌধুরী : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫