ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

নারী

পলিসি মেকিংয়ে এগিয়ে আসতে হবে নারীদের : নাজমুন নাহার

নয়া দিগন্ত অনলাইন

০৫ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৩:৫৭


প্রিন্ট

আমার ছোটবেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমকালো এক কনসার্ট হবে। আমার পছন্দের সব শিল্পীরা গান করবেন। ছোটবেলায় মনের ভেতর দারুণ উত্তেজনা কনসার্ট দেখতে যাব, খুব আনন্দ আর আব্দার নিয়ে বড় ভাইকে বললাম- ‘ভাইয়া তোমার ভার্সিটির কনসার্টে নিয়ে যাবে?’ ভাইয়া এক রকম মোটা গলায় বললেন- ‘আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার মতো যোগ্যতা অর্জন করো, তারপর যত ইচ্ছে কনসার্ট দেখো।’ আমি সেই ছোটবেলার জেদটা মনে পুষে রেখে, শেষ পর্যন্ত আমার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য দিন রাত খেটে খুটে অবশেষে মেধা তালিকায় ২০তম হয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়াশোনা করি বিবিএ ও এমবিএতে। কথার শুরুতেই এভাবেই তার উঠে আসার গল্পটা বলেন নাজমুন নাহার। তিনি আরো বলেন, আমি আজিমপুর গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ইউনিভার্সিটি উইমেন্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি এবং সেই সময়ে বোর্ডে মেধা তালিকায় ১৫তম হয়েছিলাম। তাই বাবা চেয়েছিলেন, আমি যেন ডাক্তারি পড়ি মেডিক্যাল সায়েন্সে। কিন্তু মেডিক্যালে পড়াশোনা, কাটা ছেঁড়া, রক্ত এসব একদম পছন্দ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে প্রথম দুই বছর আমি সিটি কলেজে লেকচারার হিসেবে কাজ করি। তারপর মাথায় ভূত চাপল সিএ পড়ব। বাবার এক রকম ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি আইসিএবি থেকে সিএ শেষ করে সিএমএবি থেকে সিএমএও কমপ্লিট করি। সিএ পড়া যে কি পরিশ্রমের কাজ যা বলে শেষ করা যাবে না। আমি বাংলাদেশের তৃতীয় নারী যে নাকি সিএ ও সিএমএ করা সেই সময়ের। সেটা ২০০৭ সালের কথা। এখন অবশ্য আরো কিছু নারী করেছে ডাবল এমএ ও সিএমএ। আমার সিএ করার সময়ে বড় বোন, মা ও ঘরের সবাই এত সহযোগিতা করেছেন যা শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাদের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তবে আমার আজকের অবস্থান দেখলে আমার স্বর্গীয় বাবা যে খুব খুশি হতেন সেটা বলতে পারি। দুঃখ একটাই- বাবাকে আমার এই সাফল্যমণ্ডিত সুন্দর সময়টা দেখাতে পারলাম না।
ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র বলে খ্যাত আজিমপুর কলোনি। সেই সময় সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের বসবাস ছিল সেখানে। সেই কলোনিতেই জন্ম নিয়েছেন নাজমুন নাহার, যার শৈশব-কৈশোরের সোনাঝরা দিনগুলো কেটে গেছে সমবয়সী, ছোট-বড় খেলার সাথীদের সাথে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় নাজমুন নাহার। ছোট্টবেলা থেকেই খুব মেধাবী ও পড়–য়া বলে বাবা-মা তাকে খুব আদর করতেন। নাজমুন নাহারের বাবা মল্লিক আবদুল খালেক ছিলেন একজন সৎ সরকারি চাকরীজীবী। তিনি ‘যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের’ সহকারী সচিব ছিলেন। ভীষণ রাশভারী মানুষ। ছেলেমেয়ের পড়াশোনাটাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন। মা তার সব সন্তানকে আগলে রাখতেন এবং পড়াশোনার ব্যাপারে ছিলেন খুব কড়া।
ছোটবেলায় শখ করেও যদি কখনো রান্না করতে যেতে চেয়েছি মা আমাকে সরিয়ে দিয়ে বলেছেন- ‘সারাজীবন রান্না করার জন্য প্রচুর সময় পাবে কিন্তু পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করার সময় কিন্তু আর ফিরে আসবে না।’ কি অসীম ধৈর্য নিয়ে মা আমার চার ভাইবোনসহ আমার আত্মীয়স্বজনদের অনেককেই বাড়িতে রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন। বাবার সৎ উপার্জনের সব টাকা পয়সা কখনো উল্টাপাল্টা খরচ করেননি বরং আমাদের পেছনেই খরচ করেছেন আমাদের মানুষ করার জন্য।
একজন নারী হিসেবে জীবনের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে আপনার প্রাপ্তি, ব্যর্থতা, স্বাধীনতা কতটা অর্জিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুন নাহার জানান, ‘আমি নিজে কাজ করতে গিয়ে কতগুলো বিষয় নিজের মধ্যে ধারণ করি, যেখানে মুক্তির চেতনা পাই। আমি বদ্ধ বা রুদ্ধ থাকতে চাই না। আমার জীবনে স্বাধীনতা বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বাধীনতার অপচয় নিজেকে বিবেকের কাছে পরাধীন করে। একটা বয়সের পর নিজের স্বাধীনতাকে আত্মস্থ করতে হয়। ন্যায়বোধ থাকলে সে স্বাধীনতার যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ পায়। স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না। এটা জন্মগত অধিকার। এটা অর্জন করতে হয়। দুর্বল চিত্তের মানুষেরা পরাধীন। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করে আপনার স্বামী আপনাকে এত স্বাধীনতা দেয়? আমি তাদের বলি, কেউ কাউকে স্বাধীনতা দেয় না। মানুষ হিসেবে আমি স্বাধীন। সুতরাং চিত্তকে ভয়শূন্য রাখতে পারলে স্বাধীনতা উপভোগ করা যায়। তবে উচ্ছৃঙ্খলতা স্বাধীনতা নয়।’
নাজমুন নাহার এক রকম গর্ববোধ করে বললেন, ‘আমার ভাগ্যটা হয়তো ভালো- আমি ভালো একটা শ্বশুরবাড়ি পেয়েছি। আমি সারাদিন অফিসে থাকি অথচ আমার দুই সন্তানকে আমার শাশুড়ি মা-ই দেখাশোন করেন। তাছাড়া একই বিল্ডিংয়ের অন্যান্য ফ্ল্যাটে দেবর-ননদও আছে। আমার শ্বশুরবাড়ির কোনো নারী সদস্যই কিন্তু চাকরিজীবী নন অথচ তারা কিন্তু আমাকে শ্রদ্ধা করে সম্মান দেয়। এটা আমাকে কাজের ব্যাপারে অনেক উৎসাহ যোগায়। আমার স্বামী মো: টিপু সুলতান বর্তমানে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের (সিইও)। তিনি সব সময়ই আমার পেশাগত জীবনে হস্তক্ষেপ করেননি, বরং উৎসাহ দিয়েছেন। বলেছেন, শিশুদের কথা ভেবে তুমি তোমার ক্যারিয়ার নষ্ট করবে কেন? বরং ভালো একটা কাজের মানুষ রাখলে তারা স্বাধীনভাবে দাদা-দাদী, চাচা-চাচী, ফুপু, ও কাজিনদের সাথে মিশে নিজের মতো বড় হবে। এটাতে সাময়িক কিছু সমস্যা হলেও একটা সময় কিন্তু ওরা সেলফডিপেন্ডেট হয়ে বড় হবে। আমার স্বামী সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না দেখালে আমি হয়তো কাজের ক্ষেত্রে এতটা সাবলীল হতে পারতাম না।
চাকরি জীবনে প্রথমে আমি নোভার্টিতে কাজ করেছি। তারপর ‘রবি’তে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে সরাসরি জয়েন্ট করেছি- আজ সাত বছর। আমার বস আমাকে সবসময়ই আমার কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমরা আরো মেয়ে এমপ্লয়ই বাড়াব- মেয়েরা গুছিয়ে কাজ করতে পারে। মেয়েদের দায়িত্ববোধ অনেক বেশি কারণ মেয়েরা সন্তান ধারণ ও লালন পালন করে।
নারী-পুরুষ আলাদা অস্তিত্ব এ প্রসঙ্গে কি বলেন! নাজমুন আরা এ প্রসেঙ্গ বলেন- ছোট্ট বেলায় সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছেই নারী-পুরুষ সমতার শিক্ষা ও নারীর প্রতি শ্রদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা পেতে পারে। এখানে নারী মা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
তিনি আরো জানান- পলিসি মেকিংয়ে নারীদেরকে আসতে হবে কারণ নারীরাই তাদের নিজেদের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবে বুঝতে পারে। পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য রকম। বলা যায়, পুরুষরা নারীর সমতায় ভরসা করতে পারে না। হয়তো তারা আমাদের (পুরুষ) ছাড়িয়েও যেতে পারে। নারী-পুরুষ পরস্পরকে কমবেশি ভাবলে হবে না। নারীদেরকে সরকারি ও বেসরকারি বড় চাকরিতে যেতে হবে। কর্মজীবী নারীকে পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝেই কখনো পরিবারকে, আবার কখনো পোশাকে বেশি প্রায়োরিটি দিতে হবে। তবে মেয়েদের মধ্যে যারা বড় কিছু করতে চায় তাদের জন্য পরিবারকে এবং নিজেকেও কিছু বিষয় ছাড় দিতে হয় বা স্যাক্রিফাইস করতে হয়। স্ত্রী বড় পদে যাবে বাংলাদেশের অনেক স্বামীরাই মেনে নেয়ার মতো অত বড় মন হয়নি। বর্তমানে ভবিষ্যাৎ প্রজন্মের নারীদের এসব মাথায় রেখে চলতে হবে।
বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের নারীদের উদ্দেশ্য কি বলবেন। এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-
নারীরকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবনে এমন কিছু নেই যা পারি না। বা পারবো না। পারার জন্য চেষ্টা করতে হবে। সেলফ রেসপেক্ট থাকতে হবে। আল্লাহও বলেন, নিজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে চলতে। নিজেকে দুর্বল ভাবলে নিজেরই ক্ষতি, সবল ভাবতে হবে, কম্পিটেন্ট ভাবতে হবে। নতুন প্রজন্মের এনার্জি আছে। তাদের এনার্জি সঠিক কাজে লাগাতে হবে। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই প্রফেশনাল। এসব বলেই বিয়ে করি। আমাদের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল, আছে। আমি যদি স্বামীকে সম্মান না করি, কেন সম্মান প্রত্যাশা করব? সর্বক্ষেত্রে আমাদের বোঝাপড়াটা বিশেষভাবে কাজ করে, অ্যামবিশন ও প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে। তার অ্যামবিশনকে অর্জনের জন্য আমি কোঅপারেট করি। আমার ক্ষেত্রেও তিনি কোঅপারেট করেন।
সাক্ষাৎকার : আঞ্জুমান রুমা
নাজমুন নাহার : জেনারেল ম্যানেজার, রবি এক্সটা লিমিটেড
ইনস্টিটিউট অফ কষ্ট অ্যান্ড ম্যানেজম্যান্ট একাউন্টস

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫