ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

অবকাশ

মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর, মানিকগঞ্জ

০৫ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনারটি পড়ে থাকে অযতœ  আর অবহেলায়। কেউ তার খোঁজ নেয় না; মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে জায়গা দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন যিনি, সেই সাহারা খাতুনের কবর

মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনারটি পড়ে থাকে অযতœ আর অবহেলায়। কেউ তার খোঁজ নেয় না; মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে জায়গা দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন যিনি, সেই সাহারা খাতুনের কবর

ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিকের জন্ম মানিকগঞ্জে। এই বীর ভাষা যোদ্ধার জেলায় প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এই ইতিহাসের যিনি নির্মাতা তিনি হলেন উম্মে সাহেরা খাতুন। তার পেছনে রয়েছে আরেক ইতিহাস। এই শহীদ মিনারের মতো কালগর্ভে তিনিও হারিয়ে গেছেন। অনেকেই জানেন না তার সেই অবদানের কথা।
১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। তৎকালীন ছাত্র-জনতা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য। নির্মিতও হয়ে যায় বেশ কিছু শহীদ মিনার; কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে সেগুলোর একটিও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। ভেঙে ফেলা হয় সব শহীদ মিনার। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে গিয়ে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর স্বপ্ন অধরা রয়ে যাওয়ার শঙ্কা জেগে ওঠে; কিন্তু ছাত্র নেতারা ছিলেন তাদের মননে অনড়। শহীদ মিনার হবেই। শুরু হলো জায়গার সন্ধান। অবশেষে মিলেও গেল। এগিয়ে এলেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের সহধর্মিণী উম্মে সাহেরা খাতুন।
মানিকগঞ্জ শহরের এস কে গার্লস স্কুলের সামনেই সাহেরা খাতুনের বাড়ি। ছাত্র নেতারা তার বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় রাস্তা ঘেঁষে শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাবনা সাহেরা খাতুনের কাছে উত্থাপন করেন। সরকারের সেই মুহূর্তের অগ্নিদৃষ্টির কথা সাহেরা খাতুন ভালোই জানতেন। তার পরও কোনো রকম ইতস্তত না করে অনুমতি দিলেন শহীদ মিনার হবে।
দিনটি ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি। পরদিনই শহীদ দিবস। যে করেই হোক যত ছোটই হোক শহীদ মিনার হবে। ছাত্র নেতারা বুলেটগতিতে ইট, বালু, সিমেন্ট জোগাড় করে ছোট্ট একটি ইটের স্তম্ভের আকারে শহীদ মিনার তৈরি করলেন সেই দিনের মধ্যেই। মানিকগঞ্জ শহরে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে এ খবর পৌঁছাতে দেরি হয়নি প্রশাসনের কাছে। সে সময়ের এসডিও ছিলেন এ কে দত্ত চৌধুরী। তিনি বিপুল পুলিশ নিয়ে হাজির হলেন শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য। তবে এসবের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন সাহেরা খাতুন। অসীম সাহসে সেই পুলিশ বাহিনী ও শহীদ মিনারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেন; তেজদীপ্ত কণ্ঠে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘আমার জায়গায় আমি শহীদ মিনার বানিয়েছি। কার সাহস তা ভাঙে?’ তার এ হুঙ্কার ও যৌক্তিক কথায় থেমে গেলেন এসডিও এবং পুলিশ বাহিনী। তারা আর সাহেরা খাতুনকে অতিক্রম করে শহীদ মিনার ভাঙার সাহস পেলেন না।
১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ছাত্র-জনতার ঢল নেমেছিল এই শহীদ মিনারের বেদিতে। ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে গিয়েছিল শহীদ মিনারের বেদি; কিন্তু ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের পর এ শহীদ মিনারটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় পাক হানাদারবাহিনী।
১৯৭২ সাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঠিক একই স্থানে একই অবয়বে আবার গড়ে তোলা হয় শহীদ মিনারটি। এটিই মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভাষা দিবসের মূল অনুষ্ঠানমালা, শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন সবই হয়েছে এই শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করেই। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেরণারও উৎসও ছিল এই শহীদ মিনার; কিন্তু ২০০৭ সালে মানিকগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠের পাশে প্রশাসনের উদ্যোগে মানিকগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হলে প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায় প্রথম তৈরি সাহেরা খাতুনের শহীদ মিনারটি। অযতœ আর অবহেলায় ভেঙে যায় ইটের ছোট্ট শহীদ মিনার। যদিও সাংস্কৃতিককর্মী-সংগঠকদের দাবির মুখে মানিকগঞ্জ পৌরসভা মূল শহীদ মিনারটির আদল বদলে দিয়ে সিরামিক টাইলস লাগিয়ে নতুন করে এটাকে গড়া হয়।
পরিতাপের কথা হলো, প্রথম শহীদ মিনারের সম্মানটুকু তাকে আর ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি আশপাশের পাড়ার ছেলেমেয়েরা ছাড়া কেউ খোঁজ রাখে না মিনারটির, ফুলশূন্য বেদিটি পড়ে থাকে। সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয়, মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের পেছনে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা অসীম সাহসী নারী সেই উম্মে সাহেরা খাতুনকে ভাষার দিবস কেন কোনো উপলক্ষেই স্মরণ করে না কেউ গত পাঁচ যুগেরও বেশি সময়। তার স্মরণে একটি স্মরণসভাও হয়নি মানিকগঞ্জে।
শহীদ রফিক যেমন তার তাজা রক্ত ঢেলে নিজেকে দিয়েছিলেন ভাষার তরে আর সেই রক্তিম আভাকে জমিনে শ্রদ্ধা জানাতে সাহেরা খাতুনের অবদানও তেমন চিরকাল অমলিন। এ শহীদ মিনারের পাশেই বাঁধানো কবরে শায়িত আছেন শ্রদ্ধেয় উম্মে সাহেরা খাতুন এবং তার স্বামী আবদুল লতিফ বিশ্বাস।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫