ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

‘ইসলামি জঙ্গি একটি প্রবঞ্চনা’

আলমগীর মহিউদ্দিন

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:১৩


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রিন্ট

‘এসকো ভুজেত মুসলম প্রাকতিক’। অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসা মহিলা জিজ্ঞেস করলেন। আশির দশকে প্যারিসে এক কোর্সে যোগদানের ভূমিকা অনুষ্ঠানের জন্য আমরা অনেকগুলো দেশের সাংবাদিক একত্র হয়েছিলাম। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্নই আমায় চমকে দিলো। ফরাসি ভাষার এই প্রশ্ন ইংরেজি করলে হবে, আর ইউ এ প্র্যাকটিসিং মুসলিম এবং বাংলায় সম্ভবত ‘তুমি কি চর্চাকারী মুসলমান’ বলা যায়।
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের বক্তব্য ও অন্যান্য আন্তরিক আনুষ্ঠানিকতা প্রশ্নটির বিষয় ভুলিয়েই দিয়েছিল। কিন্তু ব্রেকের পর নাশতা খাওয়ার সময় ফ্রাঁসোয়া আমার পাশে বসতেই বিষয়টি মনে এলো। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার প্রশ্নে মনে হলো মুসলমানরা দুই রকমের। তার সাথে আলোচনার পরে বুঝলাম তিনি বলতে চেয়েছেন, তারাই প্র্যাকটিসিং মুসলমান যারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, নারীদের বোরখায় রাখতে চায়, পশ্চিমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস যেমন- মদ খাওয়া, নারীদের সাথে শারীরিক ও মানসিক খোলামেলা সম্পর্ককে অগ্রহণীয় মনে করে, ইত্যাদি। ফ্রাঁসোয়া বললেন, ‘এমন মুসলমানদের ফরাসিরা সন্দেহের চোখে দেখে।’
আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এমনভাবে চেয়ে আছো কেন?
বললাম, আমি অবাক হলাম এ জন্য যে, মুসলমানদের এমন বিভাজনের বিষয় এই প্রথম শুনলাম বলে। তোমরা, যে মুসলমানরা তাদের ধর্ম মেনে চলে, সুন্দর-শুদ্ধ জীবনযাপন করতে চায়, তাদের ভালো মনে করো না। এটা আমায় অবাক করেছে। তাকে বললাম, আমাদের দেশে ব্যাপারটি উল্টো। যারা ধার্মিক, ধর্মের অনুশাসন মেনে চলেন, সমাজের সবাই তাদের বিপদ ও সমস্যার সমাধানের জন্য এদের কাছে যান। ফ্রাঁসোয়া জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তোমাদের সবাই কি ধর্মের রীতিনীতি অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করে? বললাম, না অবস্থা তোমাদের মতোই। সবাই দৈনন্দিনের আচারগুলো পালন করে না। তবে তোমাদের অভ্যাসগুলো তারা এড়িয়ে চলে। যেমন মদ খাওয়া, নারীদের সাথে খোলামেলা ব্যবহারগুলো সামাজিক দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। তোমরা বন্ধুদের সাথে দেখা হলে, হ্যান্ডশেক করো। এটা আমাদের পুরুষেরা করে। তবে তোমরা মেয়েদের প্রকাশ্যে চুমু খাও, এটা কেউ গ্রহণ করে না। বললাম, তোমাদের এ অভ্যাসগুলো মুসলমানেরা গ্রহণ না করলে কেন তাদের ভালো মনে করো না? এমনটি আমাদের দেশে হয় না। তোমরা, অর্থাৎ পশ্চিমারা, প্রায়ই উপাসনার বেদিতে অবস্থান করো। এরপর প্রায়ই নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং বিশ্বাসভিত্তিক। একদিন তার লাঞ্চের দাওয়াত কবুল করতে, খেতে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার দুপুরের প্রেয়ার (জোহর) সেরে খাবে, না পরে?’ আমি অবাক হলাম, তার জবাব শুনে। হেসে জবাব দিলাম, ‘তুমি কি এখনো আমায় ভয় পাও।’ সাথে সাথে মনে হলো, ফ্রাঁসোয়া তার পুরনো পশ্চিমা আচরণ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাকে আমি দোষ দিই না এ জন্য যে ফরাসিরা তাদের কলোনির জনগণের (বেশির ভাগই মুসলমান) সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, তার প্রতিফলন ছিল তার প্রশ্নে। তবে বাইরের একজন মুসলমানের সংস্পর্শে এসে তারা তাদের সংস্কারগুলোকে অনেকাংশে এড়াতে পারে।
অবশ্য এবার ফ্রাঁসেয়ার কথা মনে এলো চার যুগ পরে একটি বইয়ের জন্য। জার্মানিস্থ লেখক এস এম ফারুক তার লেখা ‘ইসলামি জঙ্গি একটি প্রবঞ্চনা’ নামের বইটি উপহার দিয়ে বললেন, ‘বিষয়টি আপনার নিকট নতুন নয়’। পাতা উল্টাতেই তার সত্যতা উপলব্ধি করলাম। তিনি পশ্চিমা পত্রপত্রিকা, অলটারনেটিভ প্রেস থেকে প্রভূত মেদহীন উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বর্তমানের পশ্চিমা প্রচার যে মুসলমান মাত্রই সন্ত্রাসী জঙ্গি এটা শুধু মিথ্যাই নয়, প্রবঞ্চনাও। আমার বহু লেখাতেও এসব উদ্ধৃতি আছে। এবং একই মত অন্য আবরণে প্রকাশ করেছি। তবে সাহস করে এটাকে প্রবঞ্চনা বলতে পারিনি। ফারুককে অবশ্যই সাহসী বলা যায় সত্য বলার জন্য। তিনি অবলীলায় সত্য বলতে পেরেছেন এ জন্য, বিষয়গুলো একেবারে কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাই সত্য বলতে দ্বিধা করেননি।
এটা সত্য যে এখনকার প্রচারণায় সন্ত্রাসনামীয় কর্মকাণ্ডগুলো মানব ইতিহাসের সাথে জড়িত। যেমন প্রথম মানবের দু’টি সন্তানের- হাবিল ও কাবিল- কথা সবার জানা। তারা এক নারীর দখল নিয়ে মারামারি করে একজন মারাই গেল। এখন যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে পশ্চিমা প্রচারণা প্রয়োজন অনুসারে এটাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলবে। দেখা গেছে, এমন সামাজিক অপরাধ যদি কোনো মুসলমান করে এবং কোনোভাবে পশ্চিমা স্বার্থকে স্পর্শ করে, তখন এটাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলা হচ্ছে। যেহেতু বিশ্বমিডিয়া এখন পরিপূর্ণভাবে তারা নিয়ন্ত্রণ করে, এমন প্রচারণা চলে নিরবচ্ছিন্ন। আর এর প্রতিবাদ বা সম্যক সত্য বিশ্লেষণ প্রচারে স্থান পায় না। হাবিল-কাবিলের মারামারিকে সন্ত্রাস বললে, এর ধারাবাহিকতায় কখনো ছেদ পড়েনি।
‘শুধু মুসলমানরাই সন্ত্রাসী-জঙ্গি-মৌলবাদী’- এই স্লোগান শক্তিশালী প্রচারের কল্যাণে বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে শক্ত ভিত গেড়ে বসেছে। তবে এমনটি কেমন করে হলো তার বিস্তীর্ণ, বিশদ দীর্ঘ অনুসন্ধান ও আলোচনাও চলমান। এ আলোচনা ও অনুসন্ধানের মাঝে ‘মৌলবাদী’, ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘জঙ্গি’ শব্দ তিনটির চুলচেরা হিসাব স্মর্তব্য। তবে দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার ২০০০ সালের প্রথম সংখ্যার এক সম্পাদকীয়ের মন্তব্য চমৎকার। ‘মৌলবাদী (ফান্ডামেন্টালিস্ট) শব্দটি মুসলমানদের নিন্দা করার বর্ণনা হিসেবে ষোল নম্বর শব্দ বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করে। উল্লেখ্য, ইকোনমিস্ট বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মুসলমানদের জঙ্গি হিসেবে প্রচারের সঙ্গীও বটে। পত্রিকাটি লিখেছিল, পশ্চিমা প্রচারবিদগণ একটি শব্দ বহুল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের চিত্রকে কালিমালিপ্ত এবং নিন্দনীয় করে তোলে। এ প্রয়াসের অঙ্গ হিসেবে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি মুসলমানদের সম্পর্কে ব্যবহার করতে থাকে। অবশেষে এর আকর্ষণ ফিকে হয়ে পড়লে একই পথে এলো ‘সন্ত্রাসী’। বিশ্বমিডিয়ায় এর উপস্থিতি অত্যন্ত সরব। সাথে সাথে ‘সাবসেক্ট’ হিসেবে জঙ্গি চালু আছে।
এই প্রচার ও তার আনুষঙ্গিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে আকারে ও আবরণে পৃথক। উন্নত রাষ্ট্রে এটি অত্যন্ত কৌশলী ও বুদ্ধিবৃত্তিক তাদের নিজেদের নাগরিকদের জন্য (অবশ্য রঙের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ) এবং বেশ ক্রুর অপরদের জন্য। একই অপরাধ কোনো ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গরা করলে, তা শুধু অপরাধ। কিন্তু কোনো অশ্বেতাঙ্গ বা মুসলমান করলে, তা হবে সন্ত্রাস-জঙ্গি-মৌলবাদী কর্মকাণ্ড যা লক্ষবার পুনরাবৃত্তি হবে।
প্রশ্ন হতে পারে, অন্যায়-অবিচার-অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে কেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলা হবে? এর সহজ জবাব- এর ইতিহাস। জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলোর উৎপত্তি পশ্চিমা বিশ্বে। যখন তারা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করল, তখন সব প্রতিবাদকে সন্ত্রাস বলে প্রচার শুরু করল। তাদের একজন বিখ্যাত লেখক-দার্শনিক সত্য বললেন, ‘এসব কর্মকাণ্ড নিপীড়িত ও অত্যাচারিতের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলন আর সাম্রাজ্যবাদী-নিপীড়কদের কাছে সন্ত্রাস-মৌলবাদী কর্মকাণ্ড।’
ফারুক তার বইয়ে জঙ্গিবাদের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, সব সংজ্ঞাই বিতর্কিত অথবা একপেশে। তিনি বারটি উল্লেখযোগ্য বলেছেন। এর মাঝে রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বলেছেন। উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। যেমন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অবৈধভাবে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া আক্রমণ ও দখল, ভারতের বিএসএফের দৈনন্দিন আক্রমণ, প্যালেস্টাইনে হত্যাযজ্ঞ। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসে শক্তিশালী দেশগুলো অন্য দেশের ওপর নানা ছুতোয় বোমাবর্ষণ ও আক্রমণের কথাও বলেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালিত যুদ্ধে (অভ্যন্তরীণ দমননীতির কারণে হত্যা, ধ্বংস) অগণিত নর-নারীর মৃত্যু ঘটে, সেই হিসেবে রাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক। কারণ একমাত্র রাষ্ট্রই সুগঠিতভাবে গণহত্যা পরিচালনা করার উপযুক্ত এবং পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি ধারণ করে, যা ক্ষুদ্র দলসমূহের কাছে সহজলভ্য নয়। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক, প্রচারমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীরা সরকার পরিচালিত গণহত্যাকে আইনসিদ্ধ বলে সমর্থন করেন অথচ ক্ষুদ্র বিদ্রোহী দলগুলোকে, ব্যক্তিবিশেষকে হত্যার জন্য দোষারোপ করেন।’
এভাবে ফারুক চমৎকারভাবে বর্তমান বিশ্বের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী এবং তার আগের কর্মকাণ্ডগুলোর সাথে বর্তমানে পরিচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলোর তুলনামূলক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এগুলোর কোনোটিতেই মুসলমানরা সম্পৃক্ত নয়।
অথচ প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে ক্ষমতাবানদের বক্তব্যে জনগণকে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ প্রতিহত করার কথা বলে প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একমাত্র উদ্দেশ্য প্রতিবাদ, ভিন্ন মতকে নির্মূল বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা। প্রচার সফল হচ্ছে কারণ বিশ্বপ্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করে শক্তিশালী পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ও শক্তি। তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাবানেরা এদের ক্রীড়নক। পশ্চিমা এজেন্ডার সাথে নিজেদের স্বার্থ সম্পৃক্ত করে অনাচার-অবিচারের রাজত্ব কায়েম করছে।
তবে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, প্রচারণা শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে কেন? জবাব দিয়েছেন জার্মানির হিটলার। তিনি বলেছেন, ‘সংগঠিত ন্যায়পরায়ণ ছোট্ট গোষ্ঠীকে অপবাদ দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তীব্র অত্যাচারের রোলার চালাও এবং কোনো প্রতিবাদ-ভিন্নমতের অনুমতি দেবে না, দেখবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা তোমার সাথে।’ এই প্রচারণা ও কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। যেকোনো মুসলিম কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশাল প্রচার হচ্ছে। যেমন নিউ ইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে মসজিদ নির্মাণের বিষয়টির বিরুদ্ধে বিশাল প্রচারণা করে কাজটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ‘বলির পাঁঠা হিসেবে মুসলিম সমাজ’ অধ্যায়ে ফারুক পশ্চিমা সূত্র উল্লেখ করে দেখানÑ সাতটি দাতব্য সংস্থা কেমনভাবে ইসলামবিরোধী প্রচার এবং লেখালেখির জন্য সাতটি বছরে ৪২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এদের মধ্যে রিচার্ড মেলন ফাউন্ডেশন, নিউটন চ্যারিটেবল, ফেয়ারব্রুক ফাউন্ডেশনসহ সব বিখ্যাত সংস্থা।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাসের বিস্তৃত আলোচনার আগে এর চমৎকার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। যেমন ওয়াল্টার এল শিপম্যানের বিখ্যাত নিবন্ধ ‘ইহুদিরাই সত্যিকারের সন্ত্রাসী’ উল্লেখ করে বলেছেন ইহুদিরা মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ কায়েম করে তার জন্য দায়ী করছে মুসলমানসহ অন্যদের। ইহুদি গ্রুপ ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড ময়েনের হত্যার মাধ্যমে সন্ত্রাসের রাজত্বের সূচনা করে। পরের বছর তারা জেরুসালেমে কিং ডেভিড হোটেল আক্রমণ করে ৯১ জনকে হত্যা করে। এই একই গোষ্ঠী ইয়াসিন গ্রামে আক্রমণ করে ২৫০ জন ফিলিস্তিনি নর-নারী হত্যা করে।
তাদের প্ররোচনায় মধ্যপ্রাচ্যে যে হত্যাযজ্ঞ চলছে তা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারী শাসকদের উৎখাতের নামে। জর্জ ক্যাপাসিও কাউন্টার কারেন্টে উল্লেখ করেছেন, এরই ধারাবাহিকতায় ন্যাটো-পশ্চিমা শক্তির সামরিক কর্মকাণ্ডের ফলে ইরাকে (১৯৯০-২০১১) পাঁচ বছরে শিশুর মৃত্যু ঘটেছে ২০ লাখ, আফগানিস্তানে ২৯ লাখ, সোমালিয়ায় ১৩ লাখসহ মোট ৬৬ লাখ। অপর পক্ষে বোমা বর্ষণে বিখ্যাত ল্যানসেটের মতে, ২০০৩-২০০৬ সময়ে ৬০১,০২৭ জন মানুষ কেবল ইরাকেই নিহত হয়। এই ধ্বংসযজ্ঞ এখনো চলমান। বিশ্বমিডিয়ায় এসব সার্ভে ও অনুসন্ধানের বিবরণ কদাচিৎ ভগ্নাংশ আসে।
ফারুকের সাথে সবাই একমত যে, ‘যারা দাবি করেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করে মানবসমাজ থেকে সন্ত্রাস চিরতরে নির্মূল করতে সক্ষম হবেন, তারা সম্ভবত সন্ত্রাসের ইতিহাস সম্বন্ধে অজ্ঞ। আসলে এটা হলো সেই ‘বাঘ এলো’ বলে ভয়ের গল্প। যারা সন্ত্রাস ও অনাচারে নিমগ্ন, তারাই প্রথমে এই শোরগোল তুলছে। অত্যাচারিত ও নিপীড়িতদের দোষারোপ করে তাদের লুণ্ঠন ও নির্মূলে ব্যস্ত।
মুসলিমদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী বানানোর চেষ্টার কারণ একটাই- এ দেশগুলোর সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং দেশগুলোকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত করা। নিয়ন্ত্রিত বিশ্বসংবাদমাধ্যম নজিরবিহীন বেগে এই অপপ্রচারে লিপ্ত। শুধু তা-ই নয়, তাদের তাঁবেদার রাষ্ট্রশক্তিগুলোকে এই লক্ষ্যে আইন তৈরি থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করছে এবং তার সাথে যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণতান্ত্রিক সভ্য রাষ্ট্র, এনজিও ও বুদ্ধিজীবীরা।
ফারুকের এ কথাও প্রণিধানযোগ্য, ‘বাস্তবে ইসলামি জঙ্গি’ নামক স্লোগান হচ্ছে কতিপয় রাষ্ট্রসৃষ্ট বৈশ্বিক ভূ-কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন একটি প্রবঞ্চনা বা ধোঁকা মাত্র। আসলে ধর্মকে গালি দিয়ে অন্যায় কাজ করা অত্যন্ত সহজ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫