ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৭ জুলাই ২০১৭

আলোচনা

বসন্তের পঙ্ক্তিমালায় সাজানো ডালি

জাফরুল আহসান

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:০৪


প্রিন্ট

ধূসর বিবর্ণ শীতের শেষে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা নীলাকাশের নিচে বর্ণ, গন্ধ, রঙের বৈচিত্র্য ছড়িয়ে বসন্ত আসে নবাবের বেশে; ঋতুরাজ পদবি নিয়ে। কুয়াশা মোড়ানো উত্তরীয় হাওয়া বিদায়ের সাথে শীতের আড়ষ্টতা ভেঙে জেগে ওঠে প্রকৃতি।
দক্ষিণের মৃদুমন্দ বাতাসে জীবজগৎ শিহরিত হয়ে ওঠে অরণ্য আর লতাগুল্মের শরীর হয় রোমাঞ্চিত, বন-বনান্তরে অশোক, পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম উল্লাসে বকুল, পারুল, চাঁপা ও করবীর সাথে আমের মুকুলের গন্ধে বিজয় পতাকা উড়িয়ে আসে বসন্ত।
বসন্ত আসে বর্ণিল প্রকৃতির চার পাশে মৌমাছির গুঞ্জরণে, ফড়িং আর প্রজাপতির ডানায় ভর করে, বসন্ত আসে পাখির কলকাকলিতে, দূর থেকে ভেসে আসা বিরহী কোকিলের কুহুতান মায়াময় স্বপ্নালোক মনে করিয়ে দেয়- বসন্ত এসে গেছে।
বসন্ত যেমন প্রকৃতিকে রূপে-গন্ধে সাজিয়ে তোলে, প্রেমিকহৃদয় করে উদ্বেলিত; তেমনি বাংলা সাহিত্যে বসন্ত নন্দিত হয়েছে অসংখ্য কবির কবিতায়। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের কবিদের কবিতায় বসন্ত যেভাবে চিত্রিত হয়েছে তারই একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব।
মহাকবি কালিদাস (৩৭০-৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে) বসন্তকে দেখেছেন নানা রঙে। পলাশের রঙে রাঙা পৃথিবীতে মাতাল কোকিল আবেগে-অনুরাগে কোকিলবধূকে কাছে টানে, পদ্মফুলে ভ্রমর প্রিয়াকে মধুর বাক্য শোনায়, এমনতরো নয়নাভিরাম চিত্রাবলি কবিকে আবেগাপ্লুত করে। কবি বসন্তকে আহ্বান করেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। কবি কালিদাস তার ‘ঋতুসংহার’ কাব্যগ্রন্থে বসন্তকাল প্রসঙ্গে লেখেন-
আম্রমুকুলের রসে মাতাল পুরুষ কোকিল অনুরাগের পুলকে কোকিলবধূকে চুম্বন করে। পদ্মের মাঝে কূজনরত ভ্রমরও প্রিয়ার কাছে মধুর চাটুবাক্য শোনায়।
.......
বাতাসে কম্পিত, ফুলভারে অবনত এবং জ্বলন্ত আগুনের মতো দীপ্তিমান পলাশের বনে সমাচ্ছন্ন এই পৃথিবী বসন্তে রক্তবসনা নববধূর মতো শোভা পায়।

মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে বড়– চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস বলরাম দাস ও গোবিন্দদাসসহ মধ্যযুগের কবিদের চিন্তা-ভাবনায় প্রকৃতির সাজ সাজ রব, ফুল-পাখি-নদী, ভ্রমর ও কোকিল কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে ধরা দিয়েছে; কবিতার শরীর নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বসন্ত ঋতুরাজ হয়ে পূজিত হয়েছে পদকর্তাদের কাব্যভাবনায়। বড়– চণ্ডীদাসের পদাবলি থেকে-
সরস বসন্ত ঋতু কোকিল রাএ।
অধিক বিরহশিখি হৃদয় জল এ।।
বসন্তকালে কোকিল রাএ।
মনে মনমথ সে বাণ তাএ।।
বিদ্যাপতির বিভিন্ন পদে বসন্তবন্দনা দেখি বিভিন্নভাবে। বিদ্যাপতির ‘মধু ঋতু মধুকর পাঁতি’ একটি উল্লেখযোগ্য গদাবলি। বিদ্যাপতির ভাষায়-
মধু ঋতু মধুকর পাঁতি।
মধুর কুসুম মধু-মাতি।।
মধুর বৃন্দাবন মাঝ।
মধুর মধুর রসরাজ।।
মধুর যুবতীগণ অঙ্গ।
মধুর মধুর রসরঙ্গ।।
.......
মধুর মধুর রসগান।
মধুর বিদ্যাপতি ভান।।
পাশাপাশি জ্ঞানদাসের সৃষ্টিতে বসন্তকে ঋতুরাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উদ্ধৃতাংশে তারই প্রমাণ মেলে-
আওত রে ঋতুরাজ বসন্ত
খেলত রাই কানু গুণবন্ত।
তরুকুল মুকুলিত অলিকুল ধাম
মদন মহোৎসব পিককুল রাব।
দিনে দিনে দিনকর ভেল কিশোর
শীত ভীত বহু শিখর কোর।
মলয়জ পবন সহিতে ভেল মিত
নিরখি নিশাকর যুবজন হিত।
সরোবর সরসিজ শ্যামর লেহা
জ্ঞানদাস কহে রস-নিরবাহা।
কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর (১৫৪০-১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) চণ্ডীমঙ্গল উল্লেখযোগ্য কাব্য। চণ্ডীমঙ্গলের ‘কালকেতু উপাখ্যানে’ বসন্তের বর্ণনা এসেছে এভাবে-
সহজে শীতল ঋতু ফাল্গুন যে মাসে।
পোড়ায় রমণীগণ বসন্ত বাতাসে।।
মধুমাসে মালয় মারুত বাহ্ মন্দ।
মালতীর মধুকর পিয়ে মকরন্দ।
বণিতা পুরুষ অঙ্গ পীড়য়ে মদনে।
ফুল্লরার অঙ্গ পুড়ে উদর দহনে।।

বসন্তকালে ফুল্লরার চালচিত্র এভাবেই বর্ণনা করেছেন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। রমণীগণ বসন্ত বাতাসে উতলা হয় বলেই মধুমাসে দুঃখের প্রভাবটাই কবির চোখে তীব্র হয়ে ধরা দিয়েছে। কবি মুকুন্দরামের উদ্ধৃতির পাশাপাশি কবি আলাওলের (১৬০৭-১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে) ‘পদ্মাবতী’ কাব্যগ্রন্থের ষড়ঋতু বর্ণনা খণ্ডে বসন্তের চিত্র এভাবেই চিত্রিত হয়েছে-
চৈত্রেতে বসন্ত আইল কাম সেনাপতি।
নানা অস্ত্র সঙ্গে করি বধিতে যুবতী।।
কোকিল ভ্রমর পুষ্প নবিন পল্লব।
অধিক দহয় প্রাণ সমীর সৌরভ।।

কবি আলাওলের পরে আধুনিক যুগের যাত্রারম্ভে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) কে পাই। ঈশ্বরচন্দ্র তার ‘বসন্ত বর্ণন’ কবিতায় ঋতুরাজ বসন্তের বন্দনা করেছেন কোকিলের বিরহ ধ্বনি, ফুলে ফুলে ভ্রমরের মধু আহরণ আর প্রকৃতির বর্ণিল সাজসজ্জার মাধ্যমে। বলেছেন জয় হোক বসন্তের।
কুহ কুহ কুহ কোকিল কুহরে।
শ্রবণে শ্রবণে বিয়োগীর প্রাণ হারে।।
তরুলতা মঞ্জুরে গুঞ্জরে অলিকুল।
সরবে কি রবে প্রাণ বিরহে ব্যাকুল।।
.......
ডাহুক ডাহুকি ডাকে খঞ্জনী খঞ্জন।
সারস-সারসী সব হৃদয়রঞ্জন।।
কুমুদ কমল ফুল ফাটিয়া বিস্তর।
মধুর মধুর আশে ছুটিল ভ্রমর।।
.......
হেন মনে জ্ঞান হয় সকলে মিলিয়া কয়
ঋতুরাজ বসন্তের জয়।

আধুনিক যুগের কবিদের কবিতায় বসন্ত কিভাবে বিধৃত হয়েছে, সে প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। শীতের রুক্ষতা আর পাতাঝরার পাশাপাশি মৃদু ফাল্গুনী হাওয়ায় নানা রকমের গাদা, ডালিয়া, জিনিয়া আর গোলাপের সাথে দোল খাওয়া দোপাটি, চন্দ্রমল্লিকা, মূর্যমুখী, মোরগঝুটি, টগর ও মায়াবি রঙ্গনার শরীর ছুঁয়ে ভ্রমরের আনাগোনা, বাতাস ভারী করা কোকিলের সুমধূর কুহুতান সরবে জানান দেয় বসন্ত এসে গেছে। প্রকৃতির দুয়ারে কড়া নাড়ছে বসন্ত। আধুনিক কবিতার শরীরে দোল খাওয়া বসন্তের রূপলাবণ্য পরখ করতে হলে যেতে হবে আধুনিক কবিতার বিশাল ভুবনে। বর্ণিল বসন্তের রূপবৈচিত্র্য কবিচিত্ত নেচে ওঠার এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতির পরিবর্তনের পাশাপাশি কবিচিত্তে ঘটে যায় ব্যাপক পরিবর্তন। আধুনিক যুগের কবিদের কবিতার উদ্ধৃতাংশ তারই প্রামাণ্য দলিল। ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ ১৭ বসন্তে মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখেন-
ফুটিল বকুল ফুল লো গোকুলে আজি
কহ তা স্বজনি?
আইলা কি ঋতুরাজ? ধরিলা কি ফুল সাজ
বিলাসে ধরণী?
মুছিয়া নয়ন জল চল গো সকলে চল
শুনিব তমাল তলে বেণুর সুরব
আইল বসন্ত যদি আসিবে মাধব।

তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে চতুর্থ সর্গে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বসন্ত প্রসঙ্গে লিখেন-
হেরি কামকেতু দূরে বসুধা সুন্দরী
আইলা বসন্ত জানি, কুসুম রতনে
সাজিলা; সবুক্ষশাখে সুখে পিকদল
আরম্ভিল কলস্বরে মদন কীর্ত্তন।
মঞ্জুরিল কুঞ্জবন, গুঞ্জরিল অলি
চারিদিকে; স্বনস্বনে মন্দ সমীরণ
ফুলকুল উপহার সৌরভ লইয়া
আসি সম্ভাষিল সুখে ঋতুবংশ রাজে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থে ঋতুবিষয়ক কবিতায় কোনো কমতি নেই। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত প্রতিটি ঋতুই রবীন্দ্রনাথকে নাড়া দিয়ে গেছে। বসন্ত ঋতুর কথাই ধরা যাক। রবীন্দ্রকাব্যে বসন্ত চিত্রিত হয়েছে নানাভাবে। বসন্তের ফুলের বিপুল সমারোহ দেখে কবি অজান্তেই বলে ওঠেন : ‘কে সাজাল রঙিন সাজে জানি না যে’, কিংবা ‘বসন্ত পাঠায় দূত’ অথবা মনের মাধুরী মিশিয়ে বলে ওঠেন- ‘ওগো মধুমাস’। বসন্ত নিয়ে এমনতরো অনেক কথাই রবীন্দ্রকাব্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্ধৃতাংশ তুলে ধরছি।
‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থে ‘উৎসব’ কবিতায় কবি বসন্ত এঁকেছেন যেভাবে-
মোর অঙ্গে অঙ্গে যেন আজি বসন্ত উদয়
কত পত্রপুষ্পময়
যেন মধুপের মেলা
গুঞ্জরিছে সারাবেলা
হেলাভরে করে খেলা
অলস মলয়।
ছায়া আলো অশ্রু হাসি
নৃত্য গীত বীণা বাঁশি
যেন মোর অঙ্গে আসি
বসন্ত উদয়।
কত পত্রপুষ্পময়।

‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থে ‘বসন্ত’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেন-
অযুত বৎসর আগে হে বসন্ত, প্রথম ফাল্গুনে
মত্ত কুতুহলী,
প্রথম যেদিন খুলি নন্দনের দক্ষিণ দুয়ার
মর্তে এলে চলি
অকস্মাৎ দাঁড়াইলে মানবের কুটির প্রাঙ্গণে
পীতাম্বর পরি।
বসন্তের সাজ সাজ রবে প্রকৃতি যেমন ফিরে পায় তার যৌবন, তেমনি মনের অজান্তেই দুলে ওঠে কবিমন। এ যেন প্রকৃতির মতোই যৌবনের উন্মাদনায় কবি ভেসে বেড়ান। এ পর্যায়ে প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলামের দৃষ্টিতে দেখব বসন্ত বন্দনা। ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থে ‘বাসন্তি’ কবিতায় নজরুল লিখেন-
কুহেলির দোলায় চড়ে,
এলো ঐ কে এলো রে?
মকরের কেতন ওড়ে
শিমুলের হিঙ্গুল বনে।
পলাশের গেলাস দোলা
কাননের রংমহলা,
ডালিমের ডাল উতলা
লালিমার আলিঙ্গনে।।
না যেতে শীত কুহেলি
ফাগুনের ফুল সেহেলি
এল কী? রক্ত চেলী
করেছে বন উজালা।

ফাল্গুনী কবিতায় কবি বসন্তকে দেখেছেন টক-ঝাল স্বাদ নিয়ে।
সখি মিষ্টি ও ঝাল মেশা এল একি বায়।
এ যে বুক যত জ্বালা করে মুখ তত চায়।
এ যে শরাবের মত নেশা
এ পোড়া মলয় মেশা,
ডাকে তাহে কুলনাশা
কালামুখো পিক।
যেন কাবাব করিতে বেঁধে কলিজাতে শিক।

বসন্তের সঞ্জীবনী সুধা পান শেষে কবি কতটা তৃপ্ত সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বলা যায়, ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতির বর্ণিল রূপে কবি মুগ্ধ।
বসন্ত এসেছে বলেই চেনা পথ অচেনা মনে হয়। আকাশে আজ এত খেলা বসন্তে ফুল ফুটবে বলেই কি? বসন্তকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন কবি তৃপ্ত হতে পারেন না। কবির মনে প্রশ্ন জাগে বসন্তকে কোকিল বলে ডাকবে? নাকি বলবে তাকে শহীদ মিনার।
‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থে ‘বসন্তের রাত’ কবিতায় কবি আল মাহমুদ লিখেন-
এলো ফিরে অন্ধকার যেন কোনো অপদেবতার
মোহনী কুহকে ঢাকা পড়ে আছে আমার নিবাস
গন্ধময় চারদিক, জানি না তো ছায়া পড়ে কার
বাসনার বেদীমূলে অপব্যয়ী কুসুমের মাস।
.....
যৌবনে আরাধ্য কারা? অসতীরা, এইটুকু জানি
বক্ষের বাগানে ডাকে রক্তচক্ষু বিরক্ত কোকিল
কামুক অন্ধ আমরা স্বর্গ থেকে যতটুকু আনি
সবই যেন ভাঙ্গাচুরা পরস্পর রয়েছে অমিল।
(কালের কলস/ বসন্তের রাত/ আল মাহমুদ)

বাতাস কেন, এমন এলোমেলো
আজ বুঝি সেই বসন্তরাত এলো?

ও সখি লো, ও আমার প্রাণ সখি লো
আজ বুঝি সেই বসন্ত দিন এলো?

আকাশে আজ কিসের এতো খেলা?
গাছে গাছে ফুল ফুটানোর বেলা

পথ যেন আজ অপথে যায় মিশে
তাই একাকার অমৃত আর বিষে।

আজ বুঝি ঐ বনের পাখি সখি
ভুল করে সে মনের পাখি হলো...
(এই বসন্তে/ নির্মলেন্দু গুণ)

এসো আমরা এখন আমাদের চোখের পাতায়
একটু স্পন্দন তুলি
আর সেই শব্দ ও স্বনন বসন্তের বাতাস হয়ে বয়ে যাক
অন্তত একটি বার বসন্ত বাতাস
বয়ে যাক আমাদের জীবনে
কারণ একদিন আমিও থাকব না
তুমিও থাকবে না
প্রিয়তমা
বসন্ত তো আমাদের জীবনে আসার কথা ছিল।
(বসন্ত বাতাস/ আল মুজাহিদী)

ফাগুন এলেই পাখি ডাকে
থেকে থেকেই ডাকে
তাকে তোমরা কোকিল বলবে? বলো
আমি তার নাম রেখেছি আশা
নাম দিয়েছি ভাষা।
.....
ফাগুন এলেই একটি পাখি শাখে
থেকে থেকেই ডাকে
কোকিল বলবে তাকে? বলো
ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে
কলিরা পায়ে লোটে,
বলবে তাকে শহীদ মিনার? বলো
(ফাগুন এলেই/ আসাদ চৌধুরী)

বসন্তের মাতাল হাওয়া কবিচিত্তকে যেভাবে দুলিয়েছে, অন্য কোনো ঋতু সেভাবে নয়। এই যে আনন্দবন্যা বিভিন্ন কবির দৃষ্টিকোণ থেকে বসন্তকে আবিষ্কারের প্রয়াস বোধ হয় ঋতুরাজ বলেই সম্ভব। সুভাষ মুখোপাধ্যায় যেভাবে বসন্তবন্দনা করেছেন তা যেন এক মন্ত্রমুগ্ধ উচ্চারণে পাঠকহৃদয়ে চিরস্থায়ীভাবে আসন গেড়ে নিয়েছে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত
শান বাঁধানো ফুটপাতে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।
(ফুল ফুটুক না ফুটুক/সুভাষ মুখোপাধ্যায়)

প্রাচীন যুগ-মধ্য যুগ এবং আধুনিক যুগের কবিদের কবিতার উদ্ধৃতাংশে বসন্তের উপস্থিতি দেখলাম। দেখলাম পঞ্চাশ ও ষাট দশকের ক’জন কবির কবিতা। চলুন এবার না হয় স্বাধীনতার দশক- সত্তর ও তার পরবর্তী দশকের কবিদের বিশাল কাব্যভুবন থেকে ঘুরে আসি।
ফাল্গুন বাঘের মতো লাফ দিয়ে পড়ে
রাস্তায়, গলির মোড়ে, বাসের ভিতরে
নারীর নিরবচ্ছিন্ন গ্রীবায়, শাড়ির
পাড়ে, পায়ের স্লিপারে, নতুন গাড়ির
বনেটে, পেট্রোল পোড়া গন্ধে চোখেমুখে
দালালদের ব্যথিত চিবুকে
শবযাত্রীর ভিড়ে, ঝলমলে কাদায়
আগরবাতির গন্ধে, মৃতের কাফনে
গোলাপজলের শোকে, আর্দ্র প্রস্রবণে
চিত্রা হরিণের মতো, শয্যার ভিতরে
ফাল্গুন বাঘের মতো লাফ দিয়ে পড়ে।
(ফাল্গুন/আবিদ আজাদ)

ফাল্গুনের বসন্ত বাতাসে
হেসে উঠল চরাচর পুষ্প ও পত্রাবলি
ঘরে ঘরে আনন্দ জাগ্রত
শুধু আমিই শীতার্ত এক বিবর্ণ হলুদ ঝরাপাতা
ঝরে যাই যেন তীব্র অদৃশ্য তুষার ঝড়ে।
(বৃক্ষমঙ্গল : ১৯/নাসির আহমেদ

কয়েকটি অনামী ফুলের গাছ আমার বারান্দা
জুড়ে আছে; আমি ভালোবাসি ফুল, কে না ভালোবাসে
খরতাপি চৈত্র যদিও বছরের সংরাগকান্দা
তবু বাসন্তি চুমোয় ভরে চৈত্রি বায়ু, আর ঘাসে
(কুড়ি পঙ্ক্তির ভোজ/মাহবুব হাসান)

হৃদয়ের ক্ষতগুলো মনের ভাঙ্গা হ্যারিকেনের আলোয়
যতোটা দৃশ্যমান, ততোধিক আলোকিত তুমি
আমার কবিতার খেরোখাতার নিবিড় পরিচর্যায়।
মন ভালো নেই মানলাম, তবুও বলি বসন্ত এসেছে দ্বারে
যৌবনের আমন্ত্রণ পাঠালাম বসন্ত বাতাসে
প্রকৃতির রঙ মেখে দীপ্ত চরণে দৃঢ় চিত্তে
তুমি এসো, তুমি এসো বসন্ত সন্ধ্যায়
(তুমি এসো বসন্ত সন্ধ্যায়/ জাফরুল আহসান)

এবার বসন্তে অনেক ফুল ফুটবে
গোলাপ কি চন্দ্রমল্লিকা
চম্পা, চামেলি, জুই হাস্নাহেনার শোভা বুকে নিয়ে
আনন্দে হাসবে কত সবুজ বাগান
বাগানের চারপাশ, পথঘাট, ঘরের অলিন্দে
এলোমেলো দোল খাবে অজস্র ফুল
বন্ধ্যা গাছের ঠোঁট রসে রসে ভরে যাবে
এবার বসন্তে অনেক ফুল ফুটবে।
(এবার বসন্তে/শাহাবুদ্দীন নাগরী)

ঋতুমতী কামগন্ধা নারী
শয্যা ছেড়ে বেরিয়েছে অভিসারে
না, তাহারা এখন বাহুডোরে
স্বপ্ন ও বাস্তবে খেলিতেছে
বসন্ত মচ্ছবে দল মেলিতেছে।
(মচ্ছব/ জাহাঙ্গীর ফিরোজ)

সুন্দরী গো তোমার রাঙা চক্ষু দেখা
জানি এবার ভাগ্যে আছে লেখা।
পাপড়িগুলো হচ্ছে কেন এলোমেলো
এবার তবে রাধারমণ নামটি হবে মিছে।
(এই বসন্তে/ ফজলুল কাশেম)
৮ পৃষ্ঠার পর

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে কবিদের কবিতায় ঋতুর প্রভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে কিভাবে দেখছেন। সত্তরের কবিদের কবিতা পাঠশেষে বলে দেয়া যায় আধুনিক যুগের অন্য সব কবির কবিতার বিশাল পটভূমি থেকে খানিকটা বাঁক নিয়েছে। পথটা সরল রেখায় ধাবিত না হয়ে এই যে বাঁক নেয়ার বিষয়টি হয়তো সময়ের প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক। ফাল্গুনের বিচরণ সর্বত্রই। ফাল্গুন বাঘের মতো লাগিয়ে পড়ে। বসন্তে প্রকৃতি যখন পত্রপুষ্পশোভিত, তখন কবি একধরনের একাকিত্বের যন্ত্রণায় কাতর; বিবর্ণ হলুদ ঝরাপাতা যেন। প্রেয়সীর মন ভালো নেই তাতে ক্ষতি কী, কবি বসন্তসন্ধ্যায় প্রেয়সীকে কাছে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। বসন্ত মচ্ছবে ব্যস্ত ঋতুমতী কামগন্ধা নারী অথবা প্রেয়সী যখন রংবাহারি ফুল হয়ে কবির চোখে ধরা দেয়, তখন তার রাঙা চোখ কবিকে মেনে নিতেই হয়, কেননা এ সবই তো বসন্ত ঋতুর প্রভাব। এবার সত্তরের পরবর্তী দশকের কবিতায় কবিরা কিভাবে বসন্তঋতু দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন তার কিছু কবিতার উদ্ধৃতাংশ তুলে ধরছি :
পঙ্গপালের ছায়াশব্দে মানুষ কি ভুলে যায় গোলাপের
প্রিয় চাষ; বহুকাল থেকে নদীভাঙ্গা রূপালি চরের বুকে
জেগে উঠছে দৃষ্টিনন্দন হরিৎ ঘাস
বজ্রপাত শেষে মানুষ দেখেছে খুব
আকাশের নীল প্রস্তুতি স্নিগ্ধ শিশিরের বৃষ্টিপাত
এবং একদিন ভাঙাবাড়ি হেসে ওঠে রোদ্দুর চোখে।
গভীর বসন্ত ঠোঁটে জেগে থাকা রূপসীর মতো
একটি ভাঙা বাড়ির গল্প শেষ হয় না কোনো দিন।
(একটি ভাঙা বাড়ির গল্প/ সোহরাব পাশা)

কখন কিভাবে বসন্ত নেমেছিলো পৃথিবীতে
সে কথা বলেনি কোনকালে কেউ
কোন সে মানবী প্রথম খুলেছিলো বাসন্তী আঁচল
কী গান সেদিন গেয়েছিলো পৃথিবীর প্রাচীন পাখিরা
যে বসন্ত আঙ্গিনায় আমরা হাঁটছি আজ ভবিষ্যতের দিকে
ইচ্ছে হয় শুনি সেই প্রথম বসন্তের গান
(বসন্ত চিরকালের ঋতু/ জাকির আবু জাফর)

উদরে তাহার নাই তবু সেই বসন্ত প্রহরে
ভুলে গিয়ে ক্লেশ আর হাহাকার বেদনার ভার
অঙ্গে অঙ্গে মাখি তার রূপরস রঙ্গের বাহার
প্রসন্ন ফাগুন দিন এলো আজ বাঙলার ঘরে
বসন্ত বসন্ত আহা ঘোরলাগা বেখেয়ালী মন
কখন হারিয়ে যায় কখনো বা আবেগ প্রবণ।
(বসন্ত/নূরুল হক)

চেয়ে দেখো চারিদিকে জায়মান প্রাণের গুঞ্জন
তোমার স্বপ্নের মতো কথা হয় আমের মুকুল
জরার জোয়ার শেষে গাছে গাছে কুসুম যৌবন
মৌ মৌ গন্ধে মনের হাউসে ধরি সঙ্গীত তুমুল।
(বসন্ত/ ফজলুল হক তুহিন)

মাটিতে মানুষ ছিলো গ্রীষ্মের জোয়ানি নর নারী
বর্ষার বর্ষণ শেষে প্রশস্ত শরৎ দেহে নামে
পাতাঝরা গাছ হয়ে বসন্ত বিলাপ ডানে বামে
নুনের দরিয়া চোখে অশ্রুর নামতা পড়ে থামে।
(বসন্ত বিলাপ/ মনসুর আজিজ)

কবির কবিতায় বসন্ত আনন্দবন্যা বইয়ে দেয়, উপলব্ধি করেন উপভোগের ঋতু হিসেবে। প্রেমিকহৃদয় আবেগে হয়ে ওঠে বেখেয়ালি; হারিয়ে যায় মন। কবির মনে প্রশ্নের শেষ নেই। প্রথম কিভাবে কে বসন্তকে আবিষ্কার করেছিল? কোন সে মানবী বাসন্তি আঁচল উড়য়েছিল কবির জানতে ইচ্ছে করে। কবি কান পেতে শুনতে চান সেই সে প্রথম বসন্তের গান। বসন্ত যেন আনন্দ-বেদনার সেতু। ফাল্গুন আর চৈত্র মাসের সমন্বয়ে বসন্ত। ফাল্গুনের ফুলেল বিছানা মন-প্রাণ কেড়ে নিলেও চৈত্রের তাণ্ডব আর তাপদাহ যে অনাসৃষ্টি তৈরি করে তা কখনোই আনন্দঘন নয়।
কবির কবিতায় বসন্ত যেমন সরাসরি এসেছে, তেমনি আবার কারো কারো কবিতায় বসন্তের উপস্থিতি দেখি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে; অর্থাৎ বসন্তবন্দনা তথা বসন্তের স্তবগান গেয়েছেন কবি যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে। বসন্ত প্রসঙ্গে বসন্ত ঋতুকে যত বিশেষণেই বিশেষায়িত করা হোক না কেন, বসন্ত ঋতু প্রসঙ্গে ভিন্নমতও রয়েছে।
দেখা যাক ‘ফাল্গুন’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী কিভাবে দেখেছেন বসন্তকে। তার ভাষায়-
চোখের সমুখে যা দেখেছি তা বসন্তের চেহারা নয়, একটা মিশ্র ঋতুর শীত ও বর্ষার যুগলমূর্তি আর এদের পরস্পরের মধ্যে পালায় পালায় চলছে সন্ধি ও বিগ্রহ। আমাদের এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশের শীত ও বর্ষার দা¤পত্যবন্ধন এভাবে চিরস্থায়ী হওয়াটা আমার মতে মোটেই ইচ্ছনীয় নয়। কেননা এ হেন অসবর্ণ বিবাহের ফলে শুধু সংকীর্ণবর্ণ দিবানিশির জন্ম হবে।
(ফাল্গুন/প্রমথ চৌধুরী)

সঙ্কীর্ণবর্ণ দিবানিশির জন্ম হয় কি হয় না সে প্রসঙ্গে যাব না। কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে শুধু বলবো- জয় হোক ঋতুরাজ বসন্তের। ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত। ভূমণ্ডলে জলবায়ুর বৈশ্বিক পরিবর্তনের ফলে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু দৃশ্যমান হয়তো হবে না, কিন্তু বসন্তে প্রকৃতির রূপলাবণ্য চিরকালই থাকবে এ বিশ্বাস সুদৃঢ়।
মৃদুমন্দ ফাল্গুনি হাওয়ায় পাতা ঝরার পাশাপাশি, গাদা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, জিনিয়া আর গোলাপের পাপড়িতে ভ্রমরের চুমু খাওয়ার দৃশ্য কবিমনে জানান দেবে বসন্ত এসে গেছে। বসন্তের অনাবিল আনন্দে বারবার কবির কলম ছুঁয়ে যাবে নিত্যনতুন পঙ্ক্তিমালা। বাংলা কাব্যসাহিত্যে মণি-মুক্তার মতো দ্যুতি ছড়াবে বসন্তবন্দনা। সমৃদ্ধ হবে বাংলা কাব্যের বিশাল পটভূমি- এ প্রত্যাশা আপনার মতো আমারও।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫