ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

আলোচনা

মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি হেয়াত মামুদ

মো: জোবায়ের আলী

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:০১


প্রিন্ট

উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত কবি হেয়াত মামুদ রংপুর জেলার সুলুঙ্গার বাগদান পরগনার ঝাড় বিশিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এই ঝাড় বিশিলা গ্রাম রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার অন্তর্গত। তিনি ছিলেন আমাদের রংপুর জেলার গৌরব। আমরা কবি হেয়াত মামুদকে সবাই ভুলে যেতে বসেছি। তিনি ছিলেন মোগল আমলের সর্বশেষ বিখ্যাত কবি। বলা বাহুল্য মোগল আমলের কবিদের মধ্যে তিনি ছিলেন উত্তরবঙ্গের একমাত্র কৃতী সন্তান।
কবি হেয়াত মামুদ সম্ভবত ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন বলে অনুমান করা হয় এবং ১৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল শাহ মুহম্মদ কবির এবং তাঁর পিতা সে সময়ে ঘোড়াঘাট সরকারের দেওয়ান ছিলেন। হেয়াত মামুদের পিতাও সে সময়ে একজন কবি ছিলেন। কবির পূর্বপুরুষরা মোগল ও নবাবী আমল থেকে বংশ পরম্পরায় সরকারি কর্মকর্তা বা কাজী ছিলেন। তিনি নিজেও একজন কাজী বা বিচারক ছিলেন। এ পর্যন্ত কবি হেয়াত মামুদের চারখানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে।
জঙ্গনামা বা মহরম পর্ব- ১১৩০ বাংলা ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দ, চিত্ত উত্থান বা সর্বভেদ- ১১৩৯ বাংলা ১৭৩২ খ্রিষ্টাব্দ, হিতজ্ঞান বাণী- ১১৬০ বাংলা ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দ, আম্বিয়া বাণী- ১১৬৫ বাংলা ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দ, কবির জঙ্গনামা বা মহরম পর্ব কারবালার হাসান হোসেনের বিষাদময় কাহিনী নিয়ে রচিত কাব্য। এই করুণ কাহিনী অবলম্বনে কবি জীবরাঈল ফেরেশতার জবানীতে রাসূলুল্লাহ প্রিয় নাতির হাসান হোসেনের মৃত্যুর করুণ পরিণতি, বিষের পেয়ালা পানে হাসানের মৃত্যু। নববধূ সখীনার অকাল বৈধব্য, বিলাপ, কাফেরের তরবারি তলে (সিমারের) ইমাম হোসেনের নির্মম শিরশ্চেদ প্রভৃতি হৃদয়গ্রাহী করুণ বর্ণনা কাব্যে স্থান পেয়েছে। জঙ্গনামা কাব্যে একস্থানে তিনি তাঁর আত্মপরিচয় দিয়েছেন। যার মধ্য দিয়ে পীরগঞ্জ এলাকার ঝাড় বিশিলা গ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রতিফলিত হয়েছে। এ আত্মপরিচয়ে তিনি লিখেছেন:
‘আর শুন নিবেদন/কহি আমি বিবরণ/এই মতি রচিনু পয়ার/ঝাড় বিশিলা গ্রাম/চতুর্দিকে যার নাম/পরগণে সুলুঙ্গা বাগদ্বার/সরকার ঘোড়া ঘাট/কি কহিব তার ঠাট/নানা বাজার ছিল যারে/সেই গ্রামে আমার ঘর/আছে লোক বহুতর/ছাওয়াল পন্ডিত বলি তারে/বসতির নাহি সীমা/দিব কি তার উপমা/আমার জিনিয়া গ্রাম খানি/যথা তথা রস রঙ্গ/নাহি জানে প্রীত ভঙ্গ/একোজন গুনে মহাগুণী।’
কবির চিত্ত উত্থান বা সর্বভেদ কাব্য সংস্কৃতি ‘হিতোপদেশের’ ফারসি অনুবাদের রচিত কাব্য-
সর্বভেদ নামে পুঁথি, শ্রম করি দিবা রাতি
বিরচিনু ছাড়িয়া আলিস,
কহে সে’সালের কথা, যাতে বিরচিনু পোষা
সন এগারো' শো ঊনচল্লিশ।
কবির তৃতীয় কাব্য ‘হিতজ্ঞান বাণী’ নানা মুসলিম তত্ত্ব কথার এক চমৎকার সম্পদ। ‘হিতজ্ঞান বাণী’ কাব্যে তিনি বলেছেন-
বৃদ্ধ যোগে ভাবি অতি রচিণু এই পুঁথি
সন এগা’র শ ও ষাট সালে,
পড়িয়া শুনিয়া সবে, আশীর্বাদ করে যবে
মোর গতি হয় অন্তকালে।
‘আম্বিয়া বাণী’ কবির শেষ কাব্য। এর পরে তিনি আর কোনো কাব্য লিখতে পারেন নি। তখন তিনি একেবারে বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। কবিতায় সে রূপ প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘আম্বিয়া বাণী’ কাব্যে তিনি বলেছেন-
“সন এগারো শ ও পয়ষট্টি বৎসর।
রচিনু আম্বিয়া বাণী এত সানান্তকে ॥
কেহ কেহ কহে মোরে এসব রচিতে।
শেষকালে এত শ্রম করিনু সে মতে।
একে শেষ কাল আর বিষম জঞ্জাল।
তথাপি রচিনু যদি কেহ বলে ভাল ॥
এতে হজরত আদম, শীষ, নূহ, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ ইদরিস, সালিহ, ইসমাইল, ইসহাক ও হজরত মুহম্মদ মুস্তফা সা: এর কথা বর্ণিত আছে। এই কাব্যে বর্ণনা শুরু হয়েছে নুর-ই-মহম্মদীর সৃষ্টি হতে। এই নূর-ই-মহম্মদী একের পর এক হতে নবী পরস্পর এসে বিবি আমেনাকে আশ্রয় করেছে। তারপর হজরত মুহম্মদ সা: জন্ম হয়। এভাবে ধারাবাহিকতা রয়েছে তাঁর এই পুঁথিকাব্যে।
এই মোগল যুগকেই ভারতীয় মুসলিম সাংস্কৃতিক যুগের স্বর্ণশিখর বলা যেতে পারে। আর এই বাংলা কাব্যকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে ফুলে ফলে শোভিত করে গেছেন যারা তাঁদের মধ্যে মোগল আমলের সর্বশেষ বিখ্যাত কবি রংপুরের হেয়াত মামুদ অন্যতম। তিনি নিঃসন্দেহে পরম শক্তিমান কবি। মোগল আমলের মুসলিম কবিদের নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো সত্যিকার গবেষণা হয়নি। তৎকালীন যে সাংস্কৃতিক পটভূমিতে এই সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, এ যুগের মুসলিম বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব সুস্পষ্ট। কতিপয় মোগল আমলের ক’জন বিখ্যাত কবি ও তাঁদের কাব্যের সারসংক্ষেপ-
সৈয়দ সুলতান : (আনুমানিক জন্ম ১৫৫০ খ্রি.- মৃত্যু ১৬৪৮ খ্রি.)। চট্টগ্রামের চক্রশালা পরগণার অধিবাসী ছিলেন। এ যাবৎ তাঁর মোট ৯ খানা পুঁথি কাব্যের সন্ধান পাওয়া গেছে- নবীবংশ, শব-ই-মিরাজ, রসূল বিজয়, ওফাৎ-ই-রসুল, জয়কুম রাজার লড়াই, ইবলীস নামা, জ্ঞান চৌতিশা, মারফতী গান, পদাবলী।
শেখ পরান: (আনুমানিক জন্ম ১৫৫০ খ্রি. - মৃত্যু ১৬১৫ খ্রি.), চট্টগ্রাম জেলা সীতাকুণ্ড গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। এ যাবৎ তাঁর মোট ২ খানা পুস্তকের সন্ধান পাওয়া গেছে-নূরনামা, নসীহৎনামা।
হাজী মুহম্মদ : (আনুমানিক জন্ম ১৫৫২ খ্রি. - মৃত্যু ১৬২০ খ্রি.)। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় এ যাবত তার ২ খানা কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়- নুর জামাল, সুরুৎনামা।
নসরুল্লাহ খাঁ: (আনুমানিক জন্ম ১৫৬০ খ্রি. - মৃত্যু ১৬২৫ খ্রি.), চট্টগ্রামের রামু অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। এ যাবৎ কবির ৪ খানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে- জঙ্গনামা, মুসার সোওয়াল, শরীয়ত নামা, হিদাতুল ইসলাম।
মুহম্মদ খান : (আনুমানিক জন্ম ১৫৮০ খ্রি. - মৃত্যু ১৬৫০ খ্রি.), চট্টগ্রামের হাট হাজারী থানার জোবরা গ্রামে। এ যাবত তাঁর সাতখানা কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়- সত্যকলি বিবাদ, হানিফার লড়াই, আসহাব নামা, মকতুল হোসেন, কিয়ামৎনামা, দজ্জাল নামা, কাসেমের লড়াই।
সৈয়দ মরতুযা : (আনুমানিক জন্ম ১৫৯০ খ্রি. - মৃত্যু ১৬৬২ খ্রি.), উত্তর প্রদেশের বেরেলী জেলার জঙ্গীপুরের নিকটবর্তী বাসিয়াঘাটা নামক পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। এ যাবৎ তাঁর দুইখানা পুস্তক পাওয়া গেছে- যোগকালন্দরর, পদাবলী।
শেখ মুত্তালিব : (আনুমানিক জন্ম ১৫৯৪ খ্রি. - মৃত্যু ১৬৬০ খ্রি.), চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড গ্রামের অধিবাসী। এ যাবত দুইখানা পুস্তক তাঁর পাওয়া গেছে- কিফাডিতু-ল্-মূসল্লীন, কায়দানী কিতাব।
মীর মহম্মদ শফী : (আনুমানিক জন্ম ১৫৫৯ খ্রি. - মৃত্যু ১৬৩০ খ্রি.), চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এ যাবৎ তাঁর তিনখানা পুস্তকের সন্ধান পাওয়া গেছে- নূরনামা, নূরকন্দীল ও সায়াৎনামা।
আব্দুল হাকিম : (আনুমানিক জন্ম ১৬২০ খ্রি. - মৃত্যু ১৬৯০ খ্রি.), নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত সন্দ্বীপের সুধীরামে কবির জন্ম হয়। এ যাবৎ তাঁর আটখানা কাব্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। ইউসুফ জোলেখা, লালমতি সায়ফুল মূলক, শিহাবুদ্দীন নামা, নূরনামা, নসীহৎনামা, চারি মোকামভেদ, কারবালা, সফরনামা।
নওয়াজিশ খাঁ : (জন্ম: অজ্ঞাত, মৃত্যু ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দের পরে মৃত্যু), চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত সুখছড়ি গ্রামে জন্ম। এ যাবৎ তার পাঁচখানা পুস্তক পাওয়া গেছে- গুল-ই-বকাওয়ালী, পাঠান প্রশংসা, জোরওয়ার সিংহ, কীর্তি বয়ানত, গীতাবলী।
কমর আলী : জন্ম ও মৃত্যু অজ্ঞাত। চট্টগ্রাম জেলার বর্তমান পটিয়া থানার অন্তর্গত কবুল ডেঙ্গা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। এ যাবত তাঁর তিনখানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে- সরমালের নীতি, ঋতুর বারমাস, পদাবলী।
মঙ্গল চাঁদ : (জন্ম ১৬২৫ খ্রি. মৃত্যু ১৭০০ খ্রি.)। তিনি ত্রিপুরা (বর্তমানে কুমিল্লা) অঞ্চলের লোক ছিলেন বলে মনে হয়। এ যাবত তাঁর একখানা কাব্য পাওয়া গেছে- শাহজালাল মধুমালা।
আব্দুল নবী : (জন্ম ১৬৪০ খ্রি. মৃত্যু ১৭১০ খ্রি.), তিনি চট্টগ্রাম জেলা ছিলপুর নামক স্থানে জন্মগ্রহণ কেেরন। এ যাবত তাঁর একখানা পুস্তকের সন্ধান পাওয়া গেছে- দাসতান-ই-আমীর হামজা।
মুহম্মদ ফসীহ : (জন্ম ১৬১০ খ্রি. মৃত্যু ১৬৮০ খ্রি.), খুব সম্ভবত তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। এ যাবত তাঁর একখানা কাব্য পাওয়া গেছে ‘মুনাজাত’।
মুহম্মদ জান : (জন্ম ও মৃত্যু অজ্ঞাত বলে জানা যায়), তাঁর জন্মস্থান অজ্ঞাত বলে জানা যায়। এ যাবত তার একখানা কাব্য পাওয়া গেছে- নামাজ-মাহাত্ম্য।
ফকির গরীবুল্লাহ : তিনি সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জীবিত ছিলেন বলে অনুমান করা হয়)। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার বালিয়া পরগনার লোক ছিলেন। এ যাবত তাঁর তিনখানা কাব্যের সন্ধান পাওয়া গেছে- ইউসুফ জোলেখা, সত্যপীর এবং মক্তুল হোসেন বা জঙ্গনামা (অসম্পূর্ণ)।
শেখ মনসূর : তিনি সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগে জীবিত ছিলেন বলে অনুমান করা হয়), তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। এ যাবত তাঁর একখানা কাব্য পাওয়া গেছে- ‘সিরনামা’ এটি ‘আসরারুল মসা’ নামক ফার্সি পুস্তকের সার সঙ্কলন।
মুহম্মদ উজীর আলী : (জন্ম ১৬৮০ খ্রি. - মৃত্যু ১৭৬০ খ্রি.), চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার অন্তর্গত চারিয়া গ্রামে কবির জন্ম হয। এ যাবত তাঁর দুইখানা কাব্য পাওয়া গেছে- শাহনামা, সায়াৎকুমার।
শেখ সাদী : (জন্ম ১৬৮২ খ্রি. মৃত্যু ১৭৫৩ খ্রি.), ত্রিপুরা জেলার অধিবাসী বলে মনে করা হয়। এ যাবত তার একটি গ্রন্থের নাম পাওয়া গেছে- ‘গদা মল্লিক’ (ত্রিপুরা বর্তমানে কুমিল্লা জেলা)।
মোগল আমলের সর্বশেষ বিখ্যাত কবি ছিলেন কবি হেয়াত মামুদ। তিনি ছিলেন একমাত্র উত্তরবঙ্গের মোগল আমলের বিখ্যাত কবি। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই রংপুর জেলায়। কবি হেয়াত মামুদের বিখ্যাত দুটি কবিতার চরণ-
“যার বিদ্যা নাই সে- না জানে ভালমন্দ
শীরে দুই চক্ষু আছে তথাপি সে অন্ধ।”

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫