ঢাকা, বুধবার,২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প

ফোটেনি যে ফুল

ফজলে রাব্বী

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫৬


প্রিন্ট

যমুনার পাড়ে বসে আছে জাহাঙ্গীর। নদীর ঢেউয়ের মতো তার বুকের ভেতর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ বইছে। গোধূলির লাল আভা যখন জলের সাথে ঝিকিমিকি খেলায় মাতে ঠিক তখন মনে পড়ে অনেক দিন আগের কথা। মনে পড়ে ছিমছাম গঠনের টকটকে একটা মেয়ে জেসমিনের কথা। ভালো লাগাটা যেন হাস্নাহেনা ফুলের মতো। রাতের অতিথি হয়ে নিত্য সে হৃদকুঠুরে বসবাস করে, কিন্তু দিনের বেলায় হারিয়ে যায়। তখন হন্য হয়ে সেই সুঘ্রাণের পিছে ছুটে বেড়ায় জাহাঙ্গীর। এভাবেই কেটেছে দুইটা বছর। লাজুকতা বারবার চেতনার বাতিঘরে এসে নিভিয়ে দিয়ে গেছে প্রদীপ। ‘না, এভাবে আর বসে থাকা যায় না। একটা কিছু করা উচিত।’ ভাবতে থাকে জাহাঙ্গীর। মামার বিয়ে উপলক্ষে বরযাত্রী হয়ে যাওয়াটাও কিন্তু কম সুযোগের কথা নয়। প্লান মতো পরদিন বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হয়েই যে মেয়েটিকে সবার আগে চোখে পড়েছিল, যে হেসেছিল তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে সেই মেয়েটিই জেসমিন। ও কি জানত জাহাঙ্গীর আসবে? হাসির রহস্যটা হয়ত সেখানেই লুকিয়ে আছে। বুকের ধিপধিপটা দ্বিগুণ বেড়ে যেতে লাগল যখন খাবার টেবিলে বসতেই দেখে পাশেই সেই মেয়েটি। আনমনা মন আর ছলছলে দু’চোখের পাপড়িতে ক্ষুধার কোনো তৃষ্ণা নেই। তবে আছে শুধু অনেক কিছু বলার আকাক্সক্ষা। তারপরও বলা হয়ে উঠল না তার। এই ধাঁধার খুনসুটি বুঝতে পারে মেঘনা। মেঘনা হচ্ছে জাহাঙ্গীরের খালাত বোন। সাহায্যের হাত বাড়াতে এসে সবার পাতের ডিম ঠেসে খাওয়ায় জাহাঙ্গীরকে। আর এই বেচারা হাঁফাতে হাঁফাতে ত্যাগ করে বিয়েবাড়ি।
সামনেই কলেজে সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু। বুদ্ধি করে সবকিছু গুছিয়ে-টুছিয়ে গ্রাম থেকে শহরের খালারবাড়ি এসে জুটে জাহাঙ্গীর আর আষাঢ়ে গল্পজুড়ে দেয় মেঘনার সাথে। জেসমিনদের বাড়ি কাক্সিক্ষত সেই বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়। ভালো ছাত্র বলে রীতিমতো এলাকায় নামের কোনো অভাব নেই জাহাঙ্গীরের। একদিন সকালে পড়ার টেবিলের সামনে জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখে জেসমিন দাঁড়িয়ে আছে। উঠানে এসে দাঁড়ালে চোখে চোখ রাখাটা পুনরাবৃত্তি হয়। আবেগে আপ্লুত হওয়া জেসমিনের হাত দুটো আলতো করে ছুঁতে চায় জাহাঙ্গীর কিন্তু পারে না। মেঘনা এসে জেসমিনের হাত ধরে নিয়ে যায় তার ঘরে। এ দিকে গ্রামে থাকা জাহাঙ্গীরের মা তাকে দেখতে চেয়েছে বলে এক মুহূর্ত আর দেরি না করে গ্রামের উদ্দেশে ছুটে যায় জাহাঙ্গীর। আবার সন্ধ্যার আগেই শহরে এসে ভিড়ে সে। আবার যদি দেখা হয়ে যায় সেই আশায়। নিঝুম রাতের তারারা বড্ড কথা বলতে পারে। একলা ঘরে পড়ার টেবিলে বসে ঝকঝকে খাতার কয়েক পাতা উল্টাতেই স্পষ্ট মেয়েলি হাতের কয়েক লাইন লেখা দেখে চমকে উঠে জাহাঙ্গীর। বুঝতে আর বাকি থাকে না লেখাটা কে লিখেছে! তার মানে মেয়েটাও তাকে অনেক ভালোবাসে।

২.
‘হ্যালো..’
‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘জ্বি, জেসমিন।’ আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে জাহাঙ্গীর। মেয়েটা তাকে কল দিয়েছে! কলেজে যাওয়ার মুহূর্তে অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা বুঝতে বড় কষ্ট হচ্ছে তার। কী থেকে কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। সময়টা তাকে ভাবিয়ে তোলে। কয়েকটা মেসেজের আলাপনে দু’জনার কথোপকথন শেষ হলো। এটিই যে তাদের শেষ কথা তা আগে কে বুঝেছিল? উল্টো ঘটনা ঘটতে থাকে। কারণটা সেই ফোন । স্তব্ধ নীরব প্রকৃতির মেয়েটার পরিবর্তনের আচরণে তার নিজ পরিবারের ভেতর সমালোচনার ঝড় তোলে। ফোনে ফোনে ফোনকথন আর মেসেজের ছন্দায়িত লেখাগুলো বাবার চোখে আটকে পড়ে আর পরিবারের চোখে লাল রঙা সাংস্কৃতিক চিহ্নের মতো সিগন্যাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জেসমিন।
দিন চলে যায় শুধু কথা থাকে। প্রকৃতির আলো এসে দুয়ারে পড়ে। ফাগুনের আমন্ত্রণে কৃষ্ণচূড়ার ডালে কতকগুলো কোকিল এসে জড়ো হয়। জানালার বাইরে রূপের দর্পণ হয়ে তাকিয়ে থাকে পলাশের মুখ। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে না সেই মেয়েটি। থেকে থেকে ভদ্র ছেলের মন বড় অভদ্র হয়ে ওঠে। সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে তবুও সেই অভদ্রের মুখ বাইরে বের হতে দেয় না জাহাঙ্গীর। প্রথম প্রেমের গল্পটা রাবার দিয়ে হয়ত মুছে ফেলেছে জেসমিন। তাই আর খাতার পাতায় ভালো ছবি আঁকে না। লিখে রাখে না আগামী দিনের কিছু সম্ভাবনার ইতিহাস। অতিথি হয়ে খালার বাড়িতে থাকা জাহাঙ্গীরের দিনগুলো ফুরিয়ে যেতে থাকে একসময়। শুধু অম্লান স্মৃতির ছবিগুলো পাড়ভাঙা যমুনার মতো ভেঙে যেতে দেয় না সে। স্বপ্নের জেসমিনকে ফেলে একদিন আবার সেই যমুনার পাড়ে মায়ের কাছে ফিরে আসে জাহাঙ্গীর।
তখনো চারিদিকে ছড়িয়ে আচে বসন্তের ফুল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫