ঢাকা, রবিবার,২৩ এপ্রিল ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

মসজিদে নববীর সীমানা

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:২৭


প্রিন্ট

বিশ্বের বুকে মুসলমানের অতি পবিত্র নগরী হচ্ছে মদিনা মুনাওয়ারা। পবিত্র মক্কা নগরীর যেমনি হারাম বা সীমানা রয়েছে তেমনি পবিত্র মদিনার হারাম বা সীমানা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে হারাম বা হারামের কার্যকারিতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে ইমামদের মধ্যে। ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদের মতে পবিত্র মদিনার হারাম অর্থে পবিত্র মক্কার হুবহু অর্থ বুঝাবে। যেমন, যুদ্ধ করা, গাছ কাটা, শিকার করা নিষেধ, পবিত্র মক্কার হারামের মতো পবিত্র মদিনার হারামেও কার্যকর থাকবে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (র:)-এর মতে পবিত্র মক্কার মতো সম্মানের দিক দিয়ে পবিত্র মদিনা কোনো অংশে কম থাকবে না। তবে পবিত্র মদিনায় গাছ কাটা, শিকার করা নিষিদ্ধ নয়।
অপর দিকে উপমহাদেশের বিখ্যাত সর্বজনশ্রদ্ধেয় মনীষী হজরত আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (র:)-এর মতে উম্মতে মুহাম্মদির কাছে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনা নগরী অতি পবিত্রতম। অতঃপর জেরুসালেম নগরী। কিন্তু পবিত্র মক্কা নগরীর চেয়ে পবিত্র মদিনা নগরী মর্যাদাবান। পবিত্র মদিনা এর চেয়ে খানায়ে কাবা মর্যাদাবান। খানায়ে খাবার চেয়ে রওজা পাক মর্যাদাবান। তার মূলে দু’জাহানের সর্দার আল্লাহ পাকের প্রিয় হাবীবকে পবিত্র মদিনার মাটির বুকে ধারণ করে রেখেছে।
হজরত আলী (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : পবিত্র মদিনার হারাম (সম্মানিত) আইর হতে ছাওর পর্যন্ত। যে তাতে অসৎ প্রথা সৃষ্টি করবে বা অসৎ প্রথা সৃষ্টিকারীকে আশ্রয় দেবে তার ওপর আল্লাহর ফেরেশতারা ও মানুষ সবাই অভিশাপসহ তার ফরজ বা নফল কিছুই কবুল করা হবে না।
হজরত সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : আমি পবিত্র মদিনা দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে হারাম করছি। তার মধ্যে বৃক্ষ কাটা যাবে না এবং শিকার করা চলবে না। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, পবিত্র মদিনা তাদের জন্য কল্যাণকর যদি তারা বুঝত, যে ব্যক্তি অনাগ্রহে পবিত্র মদিনা ছেড়ে যাবে তার পরিবর্তে আল্লাহ তার অপেক্ষাও উত্তম ব্যক্তিকে তথায় স্থান দেবেন এবং যে এর অনটন ও দুঃখকষ্টে ধৈর্যের সাথে টিকে থাকবে কিয়ামতে আমি তার জন্য সুপারিশকারী হবো।
হজরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যখন লোক (সাহাবা) প্রথম ফল লাভ করতেন তখন তা নবী করীম সা:-এর কাছে নিয়ে আসতেন তখন তিনি তা গ্রহণ করে বলতেন, আল্লাহ আমাদের ফল-শস্যে বরকত দাও। আমাদের এ শহরে বরকত দাও, আমাদের পরিমাণে ও পরিমাপে বরকত দাও। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আ:) তোমার বান্দা, তোমার দোস্ত ও তোমার নবী এবং আমিও তোমার বান্দা ও নবী। তিনি তোমার কাছে পবিত্র মক্কার জন্য দোয়া করেছেন আর আমিও তোমার কাছে পবিত্র মদিনার জন্য দোয়া করছি- যেরূপ দোয়া তিনি তোমার কাছে মক্কার জন্য করেছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা: নিজ পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ ছেলেকে ডাকতেন এবং তাকে ওই ফল দান করতেন।
হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) রাসূলুল্লাহ সা: হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইব্রাহীম (আ:) পবিত্র মক্কাকে সম্মানিত করে তাকে হারাম করেছেন। আমি পবিত্র মদিনাকে এবং দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে সম্মানিত (হারাম) করলাম যথাযোগ্য সম্মানে। তাতে রক্তপাত চলবে না, যুদ্ধের জন্য অস্ত্র গ্রহণ করা যাবে না এবং পশুর খাদ্য ছাড়া তাতে কোনো গাছের পাতা কাটা যাবে না।
হজরত আয়েশা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: পবিত্র মদিনায় আগমন করলেন। আমার পিতা আবু বকর (রা:) ও মুয়াজ্জিন বেলাল (রা:) ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হলেন। আমি গিয়ে তাঁকে এ খবর দিলে তিনি বললেন, আল্লাহ তুমি আমাদের জন্য পবিত্র মদিনাকে প্রিয় করো যেভাবে পবিত্র মক্কা আমাদের কাছে প্রিয় অথবা তা অপেক্ষাও অধিক। আল্লাহ তাকে আমাদের পক্ষে স্বাস্থ্যকর করো, আমাদের পরিমাণ ও পরিমাপের বরকত দাও।
হজরত সুফয়ান বিন আবু জুহাইর (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে বলতে শুনেছি: ইয়েমেন বিজিত হবে এবং তথায় পবিত্র মদিনা থেকে কতক লোক চলে যাবে এবং সাথে তাদের পরিবার ও অনুগামীদেরকেও নিয়ে যাবে। অথচ পবিত্র মদিনা হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম যদি তারা বুঝত। এভাবে শাম বিজিত হবে এবং তথায় কিছু লোক চলে যাবে এবং তাদের পরিবার ও অনুগামীদেরকেও সাথে নিয়ে যাবে। অথচ পবিত্র মদিনা হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম যদি তারা বুঝত। অনুরূপ ইরাক বিজিত হবে এবং তথায় একদল চলে যাবে এবং সাথে আপন পরিবার ও অনুগামীদেরও নিয়ে যাবে অথচ পবিত্র মদিনা হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম যদি তারা বুঝত।
হজরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, কিয়ামত কায়িম হবে না যে যাবৎ পবিত্র মদিনা এর মন্দ লোকদেরকে দূর করে দেবে, যেভাবে দূর করে দেয় হাপর লোহার খাদকে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মদিনার দ্বারগুলোতে ফেরেশতারা পাহারায় আছেন সুতরাং যাতে প্রবেশ করতে পারবে না মহামারী ও দজ্জাল।
হজরত সাদ (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে কেউ না পবিত্র মদিনাবাসীর সাথে প্রতারণা করবে সে গলে যাবে, যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়।
হজরত আনাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, তিনি এই দোয়া করেছেন, আল্লাহ পবিত্র মক্কায় তুমি যা বরকত দান করেছ পবিত্র মদিনায় তার দ্বিগুণ বরকত দান করো।
তাবিঈ হজরত ইয়াহইয়া (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, আল্লাহর জমিনে এমন কোনো স্থান নেই যাতে আমার কবর হওয়া মদিনা অপেক্ষা আমার কাছে প্রিয়তর হতে পারে। এই কথা তিনি তিনবার বললেন।
বহু হাদিস শরিফ থেকে মাত্র কয়েকটি হাদিস শরিফ সম্মানিত পাঠক মহলে পেশ করলাম, এতে শুধু পবিত্র মদিনা সম্পর্কে হাদিস শরিফ। নবী করীম সা:-এর জিয়ারত সম্পর্কে হাদিস শরিফ এখানে পেশ করা হয়নি।
পবিত্র মদিনার সাবেক নাম ইয়ামসরিব। অর্থ তিরস্কার। নবী করীম সা: এর নামকরণ করেন (পবিত্র) মদিনা।
পবিত্র মক্কা নগরী নবী করীম সা:-এর জন্মস্থান। প্রায় প্রত্যেক নবী, রাসূল তথায় এসেছেন, হজ করেছেন, দোয়া করেছেন, তবে নবী করীম সা: পবিত্র মক্কার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল বলা যাবে না। কিন্তু নানান দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, নবী করীম সা: পবিত্র মক্কার চেয়ে পবিত্র মদিনাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন। কাজেই তিনি পবিত্র মক্কা বিজয়ের পর পবিত্র মদিনায় চলে যাওয়া এবং তথায় থেকে যাওয়াকে বেছে নিয়েছিলেন। জেরুসালেমের মসজিদে আকসা পবিত্র মক্কার খানায়ে কাবার কারণে বিশেষ মর্যাদাবান। কিন্তু পবিত্র মদিনা তার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান হওয়ার মূলে নবী করীম সা: স্বয়ং তথায় শায়িত। মসজিদে নববীর কারণে নয়, স্বয়ং নবী করীম সা: শায়িত হওয়ার কারণে। আল্লাহর অতি প্রিয় হাবীব যে মাটিতে শায়িত সে রওজাপাক পবিত্র মদিনা বিশ্বের বুকে বিশেষ সম্মানের অধিকারী।
অতএব, জিয়ারতের উদ্দেশে পবিত্র মদিনায় অবস্থান করলে তথাকার প্রধান দাবি হলো তাজিম রক্ষায় সচেষ্ট থাকা। বহু ইমাম-গাউস-কুতুব পবিত্র মদিনায় বেয়াদবির ভয়ে সেখানে প্রস্রাব-পায়খানা পর্যন্ত করেননি। বহু ইমাম-গাউস-কুতুব খালি পায়ে পবিত্র মদিনায় অবস্থান করেছেন। বহু ইমাম-গাউস-কুতুব হামাগুড়ি দিয়ে পবিত্র মদিনায় প্রবেশ করেছেন তাজিম রক্ষার্থে বা বেয়াদবির ভয়ে। একালে আমরা পবিত্র মদিনায় গমন করে কতটুকু তাজিম বা সম্মান রক্ষা করেছি ভাবতে হবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে পবিত্র মদিনার যথাযথ তাজিম রক্ষা করার তাওফিক এনায়েত করুন।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫