ঢাকা, সোমবার,১১ ডিসেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

ট্রাম্পের গণমাধ্যমবিদ্বেষ

আলমগীর কবির

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
মার্কিন গণমাধ্যম ট্রাম্পের কাছে মাথা নত করেনি

মার্কিন গণমাধ্যম ট্রাম্পের কাছে মাথা নত করেনি

নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ‘গণমাধ্যম’ প্রান্তবদল করেছেন। কোনো-না-কোনো বিষয় নিয়ে ট্রাম্পের সাথে গণমাধ্যমের বিরোধ চলবে এটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের করা এক টুইটে গণমাধ্যমের প্রতি তার আক্রোশ আরো বেশি করে স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেন ‘ভুয়া গণমাধ্যম (FAKE NEWS media) আমার শত্রু নয়, আমেরিকানদের শত্রু’। ওই দিন বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সরাসরি নামও নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসবের মধ্যে রয়েছে, নিউ ইয়র্ক টাইমস, এনবিসিএন নিউজ, এবিসি, সিবিসি, সিএনএন-এর মতো একাধিক সংবাদমাধ্যম। সর্বশেষ তিনি হোয়াইট হাউসে কর্মরত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের যে বার্ষিক ভোজের অনুষ্ঠান হয় তা বর্জন করেছেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর তার ক্ষোভ যেকোনো ভাবেই কমছে না তার প্রমাণ দিলেন।
এর আগেও ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ একাধিক মিডিয়ার বিরুদ্ধে তোপ দেখিয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে বলেছিলেন, দেশের বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম রোগে ভুগছে। একপেশে খবর প্রকাশ করা ছাড়া সংবাদমাধ্যমের আর কোনো কাজ নেই বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গত, এ দিনই সংবাদ সংস্থা এপি’র একটি খবরে দাবি করা হয়, আমেরিকার শরণার্থী মোকাবেলা করতে এক লাখ সেনা মোতায়ন করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই দাবি ভুয়া বলে তড়িঘড়ি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় হোয়াইট হাউস। এর পরেই এই টুইট মার্কিন প্রেসিডেন্টের। তবে আশ্চর্যভাবে সংবাদমাধ্যমের নামের যে তালিকা ওই দিন পেশ করেন ট্রাম্প, তাতে নাম নেই এপি’র। এ ঘটনার সপ্তাহখানেক পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসে বিশেষ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ১২ মিনিটের বক্তব্য রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প বলেন, ‘আমার টুইটের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমি বলিনি সব সংবাদমাধ্যমই খারাপ। কিছু ভুয়া সংবাদমাধ্যম আছে। তারাই দেশের শত্রুÑ আমি এ কথাই বলতে চেয়েছি।’
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা-ই বলুন না কেন, তার করা মন্তব্য নিয়ে তাকে ছাড়তে নারাজ সংবাদমাধ্যম। বিশেষ করে অমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক কেমন সেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বারবার তিনি একাধিক সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তোপ দেখে গিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমও ছেড়ে কথা বলেনি। ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পের যৌন কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস করে তাকে বেশ বিপাকে ফেলে দেয়। তা সত্ত্বেও নির্বাচনে হিলারি কিনটনকে হারিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সিংহাসনে বসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারপর থেকেই সংবাদমাধ্যমের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঠাণ্ডা লড়াই চলছেই।
এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প কেন গণমাধ্যমের প্রতি এত বিরক্ত আর গণমাধ্যমই কেন ট্রাম্পের বিরোধিতা করবে? বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথাগত সাংবাদিকতার তথাকথিত নিরপেতার নীতি উপো করে বেশির ভাগ বড় পত্রিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে।
যেমন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান ঘোষণা করেছিল। সম্পাদকীয় নিবন্ধসহ প্রচুর বিশ্লেষণী লেখায় পত্রিকাগুলো বলেছিল, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট করা উচিত হবে না। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের অযোগ্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা ডজন ডজন যুক্তি তুলে ধরেছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘হোয়াই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুড নট বি প্রেসিডেন্ট’। হাফিংটোন পোস্ট লিখেছিল : ‘টেন রিজনস ট্রাম্প শুড নেভার বি প্রেসিডেন্ট’। একই ধরনের শিরোনামে অজস্র পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চলেছে।
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের সর্বাধিক প্রচারসংখ্যার দৈনিক দ্য অ্যারিজোনা রিপাবলিক। ১২৬ বছরের পুরনো এই সংবাদপত্রটি রণশীল মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রচারক। প্রকাশনার শুরু থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই পত্রিকাটি রিপাবলিকান দলের প্রার্থীর পে প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতই অযোগ্য মনে করেছে যে ২৭ সেপ্টেম্বর এক সম্পাদকীয় লেখে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীর সমর্থনে : ‘হিলারি কিনটন ইজ দ্য অনলি চয়েস টু মুভ অ্যামেরিকা অ্যাহেড।’ পত্রিকাটি সোজাসাপটা লেখে : ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার উপযুক্ত নন। বরং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীর হিলারি কিনটনের যোগ্যতা অনেক।
আমেরিকার একমাত্র জাতীয়ভিত্তিক পত্রিকা দ্য ইউএসএ টুডে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো দলের পে বা বিপে অবস্থান নেয় না। ১৯৮২ সালে প্রকাশনার দিন থেকে পরবর্তী ৩৪ বছর পত্রিকাটি এই নীতি মেনে এসেছে। কিন্তু গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাটির সম্পাদনা পরিষদ একটি সম্পাদকীয় ছাপে এই শিরোনামে : ‘ট্রাম্প ইজ আনফিট ফর দ্য প্রেসিডেন্সি’। পত্রিকাটি লিখেছে, সম্পাদনা পরিষদের সব সদস্যই মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। কারণ, ট্রাম্প তার প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে গত ১৫ মাস যেসব কথাবার্তা বলেছেন এবং যে ধরনের আচরণ করেছেন, তাতে পত্রিকাটির মনে হয়েছে যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন, জ্ঞানবুদ্ধি, দৃঢ়তা, স্থৈর্য ও সততা প্রয়োজন, ট্রাম্পের মধ্যে তার অভাব রয়েছে।
ট্রাম্পের বর্তমান আচরণকে অনেকে বলছেন, তিনি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। তার প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন গণমাধ্যমকে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ে যেকোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে আখ্যা দেন, এমনকি জরিপের নেতিবাচক ফল প্রকাশ করা হলেও তিনি এমনটা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের সমালোচনা করেন, এরা ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানের জীব’। ট্রাম্পের মিছিলে ভক্তরা ‘দড়ি, গাছ, সাংবাদিক’ লেখা টি-শার্ট পরে অংশ নিতেন। এই মনোভাব ট্রাম্পের অনন্য বৈশিষ্ট্য নয়।
তবে অবস্থা যা-ই হোক, মার্কিন গণমাধ্যম ট্রাম্পের কাছে মাথা নত করেনি। বস্তুত অনেক প্রকাশনাই সেখানে প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধের অভিভাবক হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার কথা জোর দিয়ে বলে। তারা এই বিশ্বাস ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে যে গণতন্ত্রকে স্বাস্থ্যবান ও কর্মম করতে হলে নাগরিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে; যার মধ্যে জ্ঞান, সত্য, ভিন্নমত ও ব্যঞ্জনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। এর মানে এই নয়, সাংবাদিকদের ব্যানন-কথিত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। এর অর্থ হলো, সাংবাদিকদের কাজটা করে যেতে হবে। ‘বিকল্প সত্য’ প্রত্যাখ্যান করে তাদের সত্য খুঁজতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫