ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

দেশ মহাদেশ

মিয়ানমারে সেনা-সু চি স্নায়ুযুদ্ধ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মিয়ানমারে বেসামরিক সরকারের সাথে সামরিক বাহিনীর স্নায়ুযুদ্ধ প্রকট আকার ধারণ করেছে প্রখ্যাত মুসলিম আইনজীবী কো নিকে হত্যার ঘটনায়। সাবেক এক সেনাসদস্যের এতে সম্পৃক্ততা থাকায় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা বলা যাচ্ছে না।
অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। কিন্তু ওই ঘটনায় বিষয়টি লাইমলাইটে চলে আসে। তা ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যু এবং সশস্ত্র জাতিগত যুদ্ধও দুই পক্ষের মধ্যে চাপা উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। উভয় ঘটনায় পরিস্থিতির অবনতিতে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
কো নিকে হত্যার ঘটনা ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা। এটি সু চির দলে বিভক্তিও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সাথে দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার সম্পর্কে বিশেষ করে স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি এবং সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হলাইংয়ের মধ্যকার টানাপড়েনও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি নিরাপত্তাবিষয়ক ইস্যু হওয়ায় তা সেনাবাহিনীর ভাবমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বেসামরিক সরকারকে কয়েক ধরনের সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। অনেকে তো আবার সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা পর্যন্ত করছেন।
এনএলডির আইন উপদেষ্টা এবং সেই সাথে সু চির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা, সুপরিচিত মুসলিম ব্যক্তিত্ব কো নিকে মাসখানেক আগে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাটি দেশজুড়ে মর্মপীড়াদায়ক একটি বার্তা বইয়ে দিয়েছে। রেঙ্গুন বিমানবন্দরের মতো একেবারে প্রকাশ্য স্থানে উচ্চপদস্থ লোককে হত্যার ঘটনা। অর্থাৎ কেবল হত্যা করাই হত্যাকারীদের লক্ষ্য ছিল না, সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হত্যার এ ব্যবস্থা।
হত্যার পেছনে কলকাঠি নাড়ার সন্দেহের আঙুল সামরিক বাহিনীর দিকেই ওঠে। কারণ নিহত আইনজীবীকে দেখা হতো অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার এবং একেবারে নতুন সংবিধান রচনার দাবি জানানো এনএলডি কট্টরপন্থী হিসেবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সংবিধানটি কার্যত লিখেছিলেন সাবেক সামরিক স্বৈরাচার সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ে, সেটা ২০০৮ সালে ভুয়া গণভোটে বিপুলভাবে পাস হয়েছিল। সংবিধান পরিবর্তনের দাবিটি বিশেষ ঘটনা। কারণ আগের সংবিধানকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন একটি সংবিধান গ্রহণ করা সামরিক বাহিনীর জন্য সুখকর বিষয় নয়। বিশেষ করে, তারা বর্তমান সংবিধানকে যখন পূতপবিত্র বিবেচনা করে।
তবে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কো নিকে অবিশ্বাস করলেও এবং তারা এমনকি তাকে ঘৃণা করলেও এই হত্যাকাণ্ড থেকে তারা কোনোভাবেই লাভবান হবে না, বরং বিপরীতটাই হবে। এটি তাদের সুনামের জন্য আরো হানিকর হবে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে ক্ষুব্ধ আঙুল তোলা হবে। কারণ বিষয় দু’টি মন্ত্রিসভার সামরিক বাহিনী থেকে আসা মন্ত্রীদের হাতে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে জেনারেল কেউ সু।
এ হত্যাকাণ্ড জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং সেই সাথে ভঙ্গুর পরিস্থিতি ও বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে মনে করে শীর্ষ সামরিক ক্রমপরম্পরাও উদ্বিগ্ন। আরাকানের ঘটনায় অন্তত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হলেও সেনাবাহিনীর ভাবমর্যাদা অনেকটাই মøান করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও হারানোর অনেক কিছু আছে, সেনাপ্রধান নির্বিকারভাবে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হতে চাচ্ছেন।
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি দফতর, সরকারি সভা এবং প্রধান বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী কূটনীতিকেরাও নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। অনেকে, বিশেষ করে জাপানি, এমনকি দেশটিতে সর্বোচ্চপর্যায়ে সফর বাতিল করে দিচ্ছেন, কূটনৈতিক দলের সদস্যদের পুরোপুরি ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।
প্রেসিডেন্টের অফিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘এটা স্পষ্টভাবেই ছিল সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি সঙ্কেত।’ একটি লাল রেখা টেনে দেয়া হলো, অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের দিকে হেঁটো না। রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগতভাবে এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
তবে কো নির হত্যাকাণ্ড এনএলডি সরকার এবং সামরিক বাহিনীÑ উভয়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে তাগিদ সৃষ্টি করবে। এনএলডির জন্য ইস্যু হলো সংবিধান সংস্কার। তাদের মৃত আইন উপদেষ্টা সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করতে দলের মধ্যে জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি এমনকি ফেডারেল সংবিধান প্রশ্নে চলমান শান্তিপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমঝোতার আগেই সেটা করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। তবে অন্য আরো অনেকে রয়েছেন। বিশেষ করে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দলের সবচেয়ে সিনিয়র পৃষ্ঠপোষক টিন ওও।
সেনাবাহিনী কি আবার ক্ষমতা দখল করবে? অনেকেই মনে করছেন, এমনটা এবার হয়তো হবে না। তবে যেটা হতে পারে সেটা হলো, সু চিকে দিয়ে তারা বর্তমান পার্লামেন্ট বাতিল করিয়ে দিয়ে নতুন নির্বাচন পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বাধ্য করা। এটা করা হলে প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন জারি না করেও মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর হাতে পুরো ক্ষমতা চলে আসতে পারে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জন্য একটি বিশেষ সুযোগ হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল সু চির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। এখন সু চিকে আরেকটু চাপে রাখতে পারলেই তাদের স্বার্থ হাসিল হতে পারে।
তবে সু চি যদি এখনই সংবিধান সংশোধন করে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হতে পারেন, তবেই রক্ষা পেতে পারেন। দেখা যাক কী হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫