ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

দেশ মহাদেশ

অন্যরকম এক রাজার জন্মদিন

মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

০২ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

দুনিয়া বড়ই বিচিত্র। এখানে নানা রঙের নানা চিন্তা-চেতনার মানুষের বসবাস। মানুষের ক্ষমতা আধিপত্য ও সম্পদের মোহ চিরন্তন। এমনকি জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মরণ হাতছানি দিয়ে ডাকলেও কিছু মানুষ ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করতে পারেন না। জিম্বাবুয়ের ৯৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
জিম্বাবুয়েতে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রবার্ট মুগাবের ৫১ বছর বয়সী দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রাসি মুগাবে বলেছেন, এমনকি মৃত্যুবরণ করলেও মুগাবে জিম্বাবুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। তিনি বলেন, মুগাবে এতই জনপ্রিয় যে, মরলেও তিনি লাশ হিসেবে আগামী বছরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন এবং এখনো তিনি ভোটে জয়লাভ করবেন। ক্ষমতাসীন জানু-পিএফ পার্টির এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। স্বামীর প্রতি অগাধ আনুগত্য প্রকাশ করে তার স্ত্রী বলেন, ‘একদিন আল্লাহর নির্দেশে মুগাবের যখন মৃত্যু হবে ব্যালট পেপারে তার লাশকে আমরা প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারব।’ ‘আপনারা দেখবেন জনগণ মুগাবের লাশকেই ভোট দেবে। আমি গুরুত্ব দিয়ে বলছি, জনগণ তাদের প্রেসিডেন্টকে যত ভালোবাসেনÑ তা আপনারা দেখতে পাবেন।’
জিম্বাবুয়ের ক্ষমতাসীন দল ইতোমধ্যে ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে রবার্ট মুগাবের প্রার্থিতা নিশ্চিত করেছে। পার্টির একটি সম্মেলনে জানু-পিএফের যুবশাখা এমনকি মুগাবেকে আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করতে হবে বলে প্রস্তাব দিয়েছে। এ দিকে সম্প্রতি ৯৩ কেজি ওজনের কেক কেটে নেচেগেয়ে এবং ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে দেশটির পতাকা উড়ানোর মাধ্যমে জাঁকজমকপূর্ণভাবে প্রেসিডেন্ট মুগাবের জন্মদিন পালন করা হয়েছে।
দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি কর্দমাক্ত খেলার মাঠে প্রেসিডেন্ট মুগাবের ৯৩তম জন্মদিন উপলক্ষে এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রবার্ট মুগাবে একটি সাদা শার্ট, কালো টাই, কালো কাউবয় হ্যাট ও জ্যাকেট পরিধান করে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। তিনি মঞ্চে পৌঁছে তার সমর্থকদের প্রতি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘এখনো আমার জীবনের অপর একটি অধ্যায় রয়ে গেছে।’
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বোলাওয়ে সিটিতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাবেক এই ব্রিটিশ কলোনিতে তার বক্তব্য শোনার জন্য বহু লোক ভিড় জমায়। সরকারসমর্থক হাজার হাজার মানুষ সেখানে সমবেত হয়। পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে, তার ক্রমবর্ধমান অক্ষমতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও মুগাবের কর্তৃত্ব এখনো অুণœ রয়েছে। জানু-পিএফ পার্টির যুববিষয়ক সেক্রেটারি কুদজি চিপাং জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রেসিডেন্টের জন্মদিনকে মূল্যায়ন করি। খ্রিষ্টানরা যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিনকে যেভাবে মূল্য দেয়Ñ আমরা প্রেসিডেন্টের জন্মদিনকেও সেখাবে মূল্য দিয়ে থাকি। লন্ডনের চাথাম হাউজ থিংকট্যাংকের জিম্বাবুয়ে-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. কেনোজ চিটিও বলেন, ‘মুগাবের ক্ষমতা কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টত নির্জীব ও বিবর্ণ হয়ে গেলেও তিনি এখনো অত্যন্ত কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিত্ব। পার্টি এবং সরকার উভয়ই এখনো তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে। সুস্পষ্টভাবে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা পরিলক্ষিত হলেও তিনিই হচ্ছেন এখনো দেশটির নেতাÑ ...
১৯৮০ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এ পর্যন্ত মুগাবে জিম্বাবুয়ের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন। ১৯৭০-এর দশকের গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে মুগাবের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় তাকে একজন বিপ্লবী ও বীর হিসেবে দেখা হতো। তিনি তার জনগণের স্বাধীনতার জন্য সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। তাই আফ্রিকার বেশির ভাগ নেতা তার সমালোচনা থেকে বিরত থেকেছেন। জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ব অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু মুগাবের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সমাজতান্ত্রিক শক্তি জানু-পিএফ এখনো পুঁজিবাদ ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়েছে। রবার্ট মুগাবের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ব্যাপারে এবং তার শারীরিক তথা স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে বহুবার ভবিষৎদ্বাণী করা হলেও সব সময় তিনি তার বহু সমালোচককে বিস্মিত করেছেন।
আফ্রিকায় অনেকেই মুগাবেকে একসময়ে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একজন জাতীয়তাবাদী যোদ্ধা হিসেবে প্রশংসা করলেও অন্যরা এখন তাকে একদা ‘ব্রেড বাস্কেট অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত দেশটির অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য দায়ী করছেন। ২০ বছর ধরে একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি বিশ্ব থেকে ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন। ফলে দেশে অসন্তোষ বিরাজমান। দেশটিতে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ২০১৬ সালে যত বিক্ষোভ হয়েছে অতীতে আর কখনো তা হয়নি। ২০১৬ সালে সাত শতাধিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। তাই পর্যবেক্ষক মহলের প্রশ্নÑ দেশটি কি ৯৩ বছরের বৃদ্ধ ও প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত রবার্ট মুগাবে থেকে মুক্তি পাবে? নাকি তার আজীবন প্রেসিডেন্সিকে মেনে নেবে?
মুগাবের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিদি মার্শ মোতাসা বলেছেন, জিম্বাবুয়ান সংস্কৃতিতে রাজার মৃত্যু হলেই কেবল অন্য কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং ‘মুগাবে হচ্ছেন আমাদের রাজা’।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫