ঢাকা, শুক্রবার,২২ মার্চ ২০১৯

শেষের পাতা

মহতী উদ্যোগ

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেঁচে গেলেন একজন দরিদ্র মা

হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চালু হলো সিজারিয়ান সেকশন

হামিম উল কবির হাতিয়া (নোয়াখালী) থেকে ফিরে

০৪ মে ২০১৫,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট
হাতিয়া উপজেলার গামছাখালী গ্রামের গর্ভবতী হাসিনা বেগম বেঁচে গেলেন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় : নয়া দিগন্ত

হাতিয়া উপজেলার গামছাখালী গ্রামের গর্ভবতী হাসিনা বেগম বেঁচে গেলেন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় : নয়া দিগন্ত

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেঁচে গেলেন একজন দরিদ্র গর্ভবতী মা। একই সাথে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে। সেখানে আট বছর পর চালু হয়েছে সিজারিয়ান সেকশন। নোয়াখালী জেলার মূল ভূখ থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়ায় এটা ঘটেছে। মূল ভূখ থেকে হাতিয়ায় পৌঁছতে কমপক্ষে ২ ঘণ্টা সময় লাগে। এটা সরকারঘোষিত একটি হার্ড টু রিচ (দুর্গম) অঞ্চল। হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজার করার জন্য সরকারের নিয়োগকৃত কোনো সার্জন ছিলেন না। এ কারণে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন থেকে প্রায় প্রতিদিনই গর্ভবতী মায়েদের উপকূলীয় নদী অতিক্রম করে নোয়াখালী সদর হাসপাতাল অথবা অন্য কোনো হাসপাতালে যেতে হয়। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশন করার মতো সব কিছু থাকলেও একজন সার্জনের অভাবে তা করা যায়নি। ইউএস এআইডির অর্থায়নে পরিচালিত মামণি হেলথ সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং প্রকল্পের বাস্তবায়ন সংস্থা রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টারের (রিক) তত্ত্বাবধানে হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন গাইনি সার্জন সেবা দিতে রাজি হওয়ায় এখন সেখানে নিয়মিত সিজার হচ্ছে। গত ৬ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আটটি সিজার হয়েছে এখানে।
আট বছর ধরে সার্জারির অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি দিয়ে রোগীকে অজ্ঞান করে গত ৬ এপ্রিল রাতে প্রথম সার্জারি হয়েছে। হাতিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মো: মাহবুব মোর্শেদ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা আব্দুল কাদের, অবসরপ্রাপ্ত সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা গাইনি সার্জন ডা: হোসেন আলী চৌধুরীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেদিন গভীর রাতে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে চরকিং ইউনিয়নের গামছাখালী গ্রামের হাসিনা বেগমের প্রাণ বেঁচে গেছে।
চরকিং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিনমজুর গিয়াসউদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা বেগম (২২) এসেছিলেন সন্তান প্রসবের জন্য। সকালে ব্যথা উঠলেও দুপুর গড়িয়ে গেছে; কিন্তু ‘লেবার প্রোগ্রেস’ হচ্ছিল না। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে আসা সেভ দ্য চিলড্রেনের সিনিয়র উপদেষ্টা ডা: সেলিনা আমিন প্যারামেডিক রোমানা বেগমকে পরামর্শ দিলেন হাসিনাকে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে রেফার করতে। কিন্তু প্যারামেডিক রেফার করতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি শেষ চেষ্টা করে যাবেন বলে জানালেন।
এমন জটিল কেসে কেন রেফার করতে চাচ্ছেন না তা প্যারামেডিককে জিজ্ঞাসা করে জানা গেলÑ হাসিনা বেগমের স্বামী অত্যন্ত দরিদ্র। তা ছাড়া সেদিন নদী ছিল উত্তাল। নৌকা অথবা ট্রলার পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া নোয়াখালী যাওয়ার মতো কোনো পথ খরচ এদের নেই। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ছেড়ে দিলে হাসিনার স্বামী স্ত্রীকে নোয়াখালী নিয়ে যাবেন না। মহিলাটি অদক্ষ ধাইয়ের হাতে গিয়ে পড়বে। এতে তার জীবনহানিও ঘটতে পারে। প্যারামেডিকের চেষ্টায় বিকেল গড়িয়ে গেলেও প্রসব পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
চিকিৎসক ডা: হোসেন আলী চৌধুরী পরীক্ষা করে দেখলেন শিশুর পজিশন ঠিক নেই। শিশু ও মাকে বাঁচাতে অপারেশন করতেই হবে। এ অবস্থায় হাসিনাকে পথ খরচ দিয়ে রেফার করে দেয়া হলো নোয়াখালী সদর হাসপাতালে। কিন্তু প্রকৃতি হঠাৎ আরো বিরূপ হয়ে উঠল। নদীতে বড় বড় ঢেউ। কোনো নৌযান নোয়াখালী যেতে চাইবে না কয়েকগুণ বেশি টাকায়ও। কিন্তু সিজারিয়ান অপারেশন করতে না পারলে হাসিনা মারা যাবেন। সবার চোখের সামনেই অসহায় একজন মা মারা যাবেন? এমন প্রশ্ন সামনে চলে এলে মামণির উপদেষ্টা ইমতিয়াজ মান্নান সবার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন হাসিনাকে বাঁচাতে সম্ভব সব ধরনের চেষ্টা করতে হবে। ডাক্তার হোসেন আলী চৌধুরীর সাথে পরামর্শ করলেন হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন করা সম্ভব কি না। এনাসথেশিওলজিস্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: আব্দুল কাদের রোগীকে অজ্ঞান করতে সম্মত হলে হোসেন আলী সিজার করতে পারবেন বলে জানালেন। পরে উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিয়ে ডা: আব্দুল কাদেরকে সম্মত করানো হলো। ডা: আব্দুল কাদের সম্মত হলে হাসিনা বেগমকে চরকিং থেকে আনা হলো। অবশেষে আট বছরের পুরনো যন্ত্র দিয়ে হাসিনাকে অজ্ঞান করানো হলো। বেঁচে গেলেন হাসিনা কিন্তু দীর্ঘ সময় প্রসবের পথে আটকে থাকায় মারা গেল শিশুটি। ব্যাপারটি সবাইকে মর্মাহত করলেও হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চালু হয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। হাসিনা বেগমের সিজারের পথ ধরে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আটটি সিজার করে আটজন মাকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে ডা: হোসেন আলী চৌধুরী ও ডা: আব্দুল কাদের আন্তরিকতায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫